১৯৯৭ সাল। আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। তখন হঠাৎই আমার থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। ডাক্তার জানান, আমার শরীরে হিমোগ্লোবিনের আয়ু মাত্র ২১ দিন। অর্থাৎ প্রতি ২১ দিন পরপর আমাকে ২–৩ ব্যাগ রক্ত নিতে হবে। সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। প্রায় সারা বছরই বিছানায় পড়ে থাকতে হতো। ফলে পড়াশোনাও আর চালিয়ে যেতে পারিনি।
কিন্তু সব সময়ই ভাবতাম আমাকে কিছু একটা করতে হবে। ১৯৯৮ সালে আব্বুকে অনুরোধ করি যেন আমাকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একটি কোর্স করতে দেন। এরপর আমি ন্যাচারাল ডাই, ব্লক ও বাটিকের কোর্স করি। সেখান থেকেই শুরু। তখন ছোটখাটো ব্লকের কাজ করতাম এবং পরিচিত ব্যক্তিদের উপহার দিতাম।
২০০০ সালে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম ঈদে আমি নিজ হাতে ঘরের সোফার জন্য কুশন কভার আর ম্যাট বানাই। সেখানে টাই-ডাইয়ের সঙ্গে ব্লকের কাজ করেছিলাম। সবাই খুব প্রশংসা করে। এরপর নিয়মিতভাবে অল্প অল্প করে ব্লক আর টাই-ডাইয়ের কাজ করতে থাকি। আমার ননদ, শাশুড়ি ও আত্মীয়স্বজনেরা সেগুলো কিনে নিতেন।
২০০১ সালে আমার ছেলের জন্ম হয়। তখন কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। এরপর কাজে অনিয়মিত হয়ে পড়ি। একবার শুরু করি, আবার কিছুদিন বন্ধ। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। এর মধ্যে ২০০৭ সালে আমি দ্বিতীয় সন্তানের মা হই।
২০১৫ সালে জীবনে আরও বড় একটা ধাক্কা আসে। ‘এমডিএস’ নামের একধরনের বোনম্যারো ক্যানসার ধরা পড়ে। থ্যালাসেমিয়া তো ছিলই, এর সঙ্গে বোনম্যারো ক্যানসার—সব মিলিয়ে খুব মানসিক অশান্তির মধ্যে ছিলাম। তখন বিদেশে গিয়ে প্রতি মাসে একটি করে কেমোথেরাপির ইনজেকশন নিতে হয়। কিন্তু একদিন মনে হয়, দেশে ফিরে আমাকে আবার কাজ শুরু করতেই হবে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরি। আমার মেয়ে যারীনের নামে যারীন’স ক্রিয়েশন নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলি। আমার স্বামী আমাকে ৫০ হাজার টাকা দেন। সেটার সঙ্গে আমার জমানো কিছু টাকা দিয়ে নতুন করে পুরোদমে কাজ শুরু করি। ২০১৬ সাল থেকে আমি ছোট ছোট মেলায় অংশ নিতে শুরু করি। তখন অনেকেই বলতেন, আমি কেন দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছি? কেন ভারতীয় বা পাকিস্তানি পণ্য আনছি না? কিন্তু দেশীয় পণ্যের প্রতি আমার আলাদা একটা টান সব সময় ছিল। ২০১৭ সাল থেকে আমি পুরোপুরি ন্যাচারাল ডাই নিয়ে কাজ শুরু করি, একেবারে খাঁটি প্রাকৃতিক রং নিয়ে। এখন চারপাশে এত কেমিক্যালের ভিড়, সেখানে ন্যাচারাল ডাই নিয়ে কাজ করা সত্যিই একটা যুদ্ধের মতো।
কিন্তু আমি সেই যুদ্ধটা করে যাচ্ছি। নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশন, প্রতি মাসে কেমোথেরাপি—এসবের মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। করোনার শুরুর দিকে আমার ছোটখাটো একটা হার্ট অ্যাটাকও হয়। এরপর যতবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছি, ততবারই শরীর একটা ধাক্কা খেয়েছে। তারপরও কাজ থামাইনি।
এই অদম্য কাজের জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছি। ২০২৪ সালে ‘ট্যালি সলিউশন এমএসএমই ওয়ান্ডার ওম্যান অ্যাওয়ার্ড’ পাই। ২০২৫ সালে ‘নবম সাউথ এশিয়া চায়না কুনমিং ফেয়ারে’ও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাই আর উত্থান-পতনের পর ঢাকার গুলশানে যারীন’স ক্রিয়েশনের একটি অফলাইন স্টোর চালু করেছি। আমি আমার কাজে সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আজ পর্যন্ত আমার কোনো পণ্য নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। কোনো পণ্য কখনো ফেরত আসেনি। সব সময় চেষ্টা করেছি, আমি যা দেখাই, ঠিক সেটাই বিক্রি করতে।
অনেকে মনে করেন, অসুস্থ হলে আর কাজ করা যায় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল। আমি অসুস্থতা নিয়েই কাজ করছি, নিজের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছি। এই পথচলাটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।