পলিথিনের বিকল্প সোনালি ব্যাগের ফর্মুলা উন্মুক্ত করার দাবি

সোনালি ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

ছয় বছর আগে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে সোনালি ব্যাগ আবিষ্কার করে দেশজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা মোবারক আহমেদ খান। কিন্তু উদ্ভাবনের এত বছর পরও সোনালি ব্যাগ এখনো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনা যায়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্ভাবনার সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক ব্যবহার করতে চাইলে আবিষ্কারের ফর্মুলা উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের খরচও কমাতে হবে।

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে আয়োজিত এক সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। ছয় বছরেও কেন সোনালি ব্যাগের বাণিজ্যিক ব্যবহার করা গেল না এবং এই ব্যাগের সমস্যা ও সম্ভাবনা কী তা জানতে ওই সভা ডাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে সরকারের বেশ কয়েকজন সচিব এবং তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিটিএমইএ ও বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিজেএমসির বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা মোবারক আহমেদ খান সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

বিজেএমসি বলছে, সোনালি ব্যাগটি বাজারজাত করতে ২০১৮ সালে ১০ কোটি টাকা খরচ করে একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর ডেমরায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে সোনালি ব্যাগ তৈরির কারখানা বানানো হয়েছিল। সেখানে প্রতিদিন ১৫ হাজার সোনালি ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। মতিঝিলে বিজেএমসির কার্যালয় থেকে প্রতিটি ব্যাগ ১০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবক মোবারক আহমেদ খানের ফর্মুলা তাঁদের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। এই ফর্মুলা একমাত্র তিনিই জানেন। কিন্তু তিনি অন্য কাউকে তা জানাচ্ছেন না। প্রয়োজনে তিনি এর পেটেন্ট বা স্বত্ব নিজের নামে করে নিতে পারেন, যাতে অন্য কেউ তাঁর এই আবিষ্কার নিজের নামে চালাতে না পারে। এই পণ্য তৈরি করতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কোথায় পাওয়া যাবে তা-ও জানাতে হবে। একই সঙ্গে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সরকারকে কম সুদে ঋণ দিতে হবে।

সোনালি ব্যাগের উৎপাদন খরচ কমানোর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, এখন প্রতিটি ব্যাগে উৎপাদন করতে খরচ পড়ে ১০ টাকার মতো। অন্যদিকে বাজারে কিংবা বিপণিবিতানে পলিথিন দেওয়া হয় বিনা পয়সায়। ব্যাগের খরচ তিন টাকার মধ্যে আনতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পলিথিনের ব্যবহার এত বেড়েছে যে, নদী-খাল ভরে যাচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে চাইলে পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ বাজারজাত করতে হবে। এটি করতে হলে খরচ কমাতে হবে। তা ছাড়া এই উদ্ভাবন ব্যবসায়ীদের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলেই এর বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রসার হবে।

পাট থেকে সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবন ব্যবসায়ীদের জানানোর বিষয়ে মোবারক আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে গবেষণার আরও কিছু কাজ বাকি আছে। ব্যাগ উৎপাদনে খরচ কীভাবে কমানো যায় সে জন্য আরও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে। এ জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বৈঠকে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য আলাদা একটি প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। সে প্রকল্পটির অর্থায়ন জলবায়ু তহবিল থেকে কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি থেকে করতে সরকার সম্মত হয়েছে।’

ডেমরায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসে এখন দুটি মেশিনে সোনালি ব্যাগের উৎপাদন চলছে। বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন ১৫ হাজার ব্যাগ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ব্যাগটির চাহিদা উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় তিনগুণ বেশি। সোমবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে সোনালি ব্যাগ কীভাবে তৈরি করা হয় শিগগিরই তা দেখতে যাবেন ব্যবসায়ীরা।

বিজেএমসি কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিবেশবান্ধব ব্যাগটি বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করতে যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন তা বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠানই বানায় না। মেশিনের নমুনা চাহিদাপত্র দিলে তা তৈরি করতে পারবে বলে জানিয়েছে চীন, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট সচিব আব্দুর রউফ প্রথম আলোকে বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হবে। তখন জানা যাবে আসলে প্রতিটি সোনালি ব্যাগে কত টাকা খরচ হবে। তা ছাড়া বড় আকারে উৎপাদন শুরু করলে তখন খরচও কমে যাবে।

আরও পড়ুন