শেষ শিশুপ্রহরে শিশুদের আনন্দে মুখর বইমেলা
অমর একুশে বইমেলায় আজ শনিবার ছিল ষষ্ঠ ও শেষ শিশুপ্রহর। শিশুদের হুল্লোড়ে মেলার চত্বর যেন রূপ নেয় রীতিমতো উৎসবে। শিশুদের কেউ আসে মা–বাবার হাত ধরে, কেউবা পরিবারের বড়দের সঙ্গে। মেলা থেকে বই কিনেছে শিশুরাও। কেউ ভূতের বই, কেউ সায়েন্স ফিকশন, কেউ কিনেছে পশুপাখির গল্পের বই। নতুন বই কেনার আগ্রহ আর মেলা উপভোগে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে মা–বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছিল ইরহা ইসায়া রহমান। সে কিনেছে ‘দাদুর হাতে জাদুর কাঠি’, ‘একদিন সাগর পাড়ে’, ‘বোমার দেশে ঘাসের দেশে’, ‘সবুজ মেঘমালা’ ও ‘ভূত ও ভূমিকম্প’সহ বেশ কয়েকটি গল্পের বই।
ইরহার মা নুসরাত নওশিন একজন গবেষক। তিনি বললেন, ‘মেয়ে বই পড়তে খুব পছন্দ করে। পড়া শেষ হলে বইগুলো সে তার স্কুলে দিয়ে দেয়, যাতে অন্য শিক্ষার্থীরাও পড়তে পারে।’
আজ বেলা ১১টায় মেলার দ্বার খোলে। শিশুপ্রহর চলে বেলা একটা পর্যন্ত। এর পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বইমেলা উন্মুক্ত থাকবে সবার জন্য।
কথা হলো মেলায় ঘুরতে আসা শিশু প্রিয়তার সঙ্গে। মা–বাবার সঙ্গে কচুক্ষেত থেকে এসেছে সে। কিনেছে তিনটি বই। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া প্রিয়তা জানায়, গল্পের বই পড়তে খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে ভূত ও রূপকথার গল্প।
খিলক্ষেত এলাকা থেকে বাবা আলিম খন্দকারের হাত ধরে মেলায় এসেছে আরাফাত খন্দকার। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে সে। আরাফাত কিনেছে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ‘রুহান রুহান’ আর জনপ্রিয় শিশুতোষ কমিকস ‘মহাকাশের প্রাণী’। আরাফাত বলল, সায়েন্স ফিকশন পড়তে ভালো লাগে। বাসায় এ ধরনের অনেক বই আছে, তবে নতুন বই খুঁজতে এবারের বইমেলায় আসা।
মোহাম্মদপুর থেকে মা–বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছিল ওয়াজিহা আক্তার, শ্রাবণী আক্তার ও রুহিনা আক্তার। কিনেছে ‘শেয়াল ও সিংহ’, ‘পিঁপড়ে ও ফড়িং’ এবং ‘ঘুঘু পাখি ও ভোমরার গল্প’ নামে তিনটি বই। ওদের বাবা আবদুর রহমান বললেন, মেয়েরা পশুপাখির গল্প পড়তে পছন্দ করে। তাই ওদের পছন্দের বইগুলোই কিনে দিয়েছেন।
আজ শিশুপ্রহরে শিশুদের বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের মঞ্চ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাপেট শো শুরু হতে কিছুটা দেরি হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শো শুরু হলে শিশুদের ভিড় জমে মঞ্চের সামনে।
মঞ্চে পাপেট চরিত্র ‘আলো’ গান গেয়ে শিশুদের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করলে শিশুরাও সাড়া দেয়। পরে ‘আলো’ বন্ধু ‘ব্লু’কে নিয়ে গল্প ও অভিনয়ের মাধ্যমে শিশুদের সামনে উপস্থাপন করে নানা বিষয়।
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক বলেন, এ আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়। গল্পের মধ্য দিয়ে শিশুদের সততা, বন্ধুত্ব ও পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয় শেখানোর চেষ্টা করা হয়।
আজকের পাপেট শোর অংশ হিসেবে মঞ্চস্থ হয় ‘বনভ্রমণ’, ‘অপু দীপুর গল্প’ ও ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’। পাপেট চরিত্র আলো ও ব্লুর পাশাপাশি ঐশ্বর্য, ঐতিহ্য ইতু, বাঘ মামা, মায়া হরিণ, কচ্ছপ, ছাগল, কাক ও খরগোশ শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মিরপুর থেকে মায়ের সঙ্গে মেলায় আসা রুশদা রহমান সোহা বলে, পাপেট শোর ‘হালুম’কে ভালো লেগেছে। শোতে মোবাইলে গেম না খেলা আর বেশি বেশি বই পড়ার কথাও বলা হয়েছে।
রুশদার মা কাজী নাফিয়া রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর সন্তানকে নিয়ে বইমেলায় আসার চেষ্টা করি। এ বছর মেয়েকে মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাসভিত্তিক একটি বই কিনে দিয়েছি। কারণ, নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো প্রয়োজন।’
পাপেট থিয়েটারের মঞ্চের পাশে বসানো ছিল দুটি বায়োস্কোপ। হঠাৎ শোনা যায় পরিচিত হাঁক—‘এই বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপ!’ ডাক দিচ্ছিলেন কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের এক সদস্য।
কৌতূহলী শিশুরা এগিয়ে এসে গোল কাচে চোখ রাখে। ভেতরে ভেসে ওঠে ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’।