১৭ বছর পর ব্যালটে ছাপ, উৎসবে পুরান ঢাকার গলিঘুপচি

ভোট দেওয়া শেষে সেলফি তুলছেন কয়েকজনছবি: মাসুম অপু

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। পুরান ঢাকার সরু গলি, পুরোনো দালান, মসলার গন্ধমাখা মৌলভীবাজার, চকবাজার আর বুড়িগঙ্গার হাওয়া—সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার যেন অন্য রকম একটা দিন। সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ঘুরেছি ওয়ারী, ধোলাইখাল, বংশাল-টিকাটুলী, নয়াবাজার-বেগমবাজার, সিদ্দিকবাজার, নাজিরাবাজার, আলুবাজার, নবাবপুর, চকবাজার-লালবাগ পেরিয়ে কামরাঙ্গীরচরে বুড়িগঙ্গার পাড়। যেদিকেই গেছি, চোখে পড়েছে একধরনের উৎসবের আবহ।

তরুণ এসেছেন তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে। ভোট দিয়ে ছবি তুলছে, কেন্দ্রের বাইরে আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে। প্রবীণ দম্পতি এসেছেন আগ্রহ নিয়ে; ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন দীর্ঘ সময়। অপেক্ষার পরও মুখে ছিল স্থির হাসি। অনেকের কণ্ঠে একই প্রত্যাশা—‘একটা নির্বাচিত সরকার আসুক, গণতন্ত্র ফিরে পাক।’

সকালের ছোট্ট বিপত্তি

সকাল সাড়ে আটটা। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমানকে পাওয়া গেল বংশালের আগাসাদেক রোডের আইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। সরু গলির ভেতরে ছোট্ট স্কুল; রিকশাও ঠিকমতো ঢুকতে পারে না। ফুরফুরে মেজাজে এলেও শুরুতেই খানিকটা বিড়ম্বনা। অনলাইনে দেখা ভোটার নম্বর অনুযায়ী কেন্দ্রে এসে দেখেন, তালিকায় তাঁর নাম নেই। কিছুটা উৎকণ্ঠা, খানিকটা অস্বস্তি—তবু বিরক্তির প্রকাশ নেই। নিচে নেমে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। পরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় সমস্যার সমাধান হয়। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ভোট দিয়ে বের হয়ে সাংবাদিকদের সামনে ‘ভি’ চিহ্ন দেখান তিনি।

এই ব্যক্তি রিকশায় করে এসে ভোট দিয়ে গেছেন
ছবি: মাসুম অপু

ভোট শেষে হামিদুর রহমান বলেন, ‘১৭ বছর পর স্বাধীন চিত্তে ভোট দিলাম। ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না—এত সুন্দর পরিবেশ। সবাই ভোট দিতে আসেন।’

বেলা একটা নাগাদ আরমানিটোলা হাইস্কুলে আবার দেখা। ততক্ষণে কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছেন। মুখে সন্তুষ্টির হাসি। বললেন, ‘এখন পর্যন্ত ভালো ভোট হয়েছে।’

আক্ষেপের অবসান

আরমানিটোলার মোহাম্মদ মুসা এলেন রিকশায়। হাঁটার মতো অবস্থা নেই। রিকশা থেকে নেমে দুই তরুণের কাঁধে ভর করে ভেতরে ঢুকলেন। আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘১৭ বছর ভোট দিবার পারি নাইক্কা। স্কুলের গেটে আইলে কয়, দেওয়া অইয়া গেছে, যান গা। আজ আইসি ভোট দিবার—খুব খুশি লাগতাছে।’ তাঁর চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ।

একই কেন্দ্রে রেহানা বেগম (৬০)। ছেলেমেয়েরা বিদেশে, একাই এসেছেন ভোট দিতে। বললেন, ‘ভোট না দিলে নাগরিকের দায় পূরণ হয় না। আগেরবার কষ্ট পেয়েছিলাম। আজ অন্তত নিজের ভোটটা নিজে দিলাম।’

জুবায়ের রহমান তাওহীদ এসেছেন সপরিবার। কোলে শিশু, বাইরে সেলফির ভিড়। হাসতে হাসতে বললেন, ‘ভোটটা আমাদের কাছে উৎসব মনে হচ্ছে। বাচ্চাকে দেখাচ্ছি—এটাই আমাদের অধিকার।’

৬৫ বছরের মোহাম্মদ শাহজাহান ক্রাচে ভর করে কেন্দ্রে এসেছেন
ছবি: মাসুম অপু

৬৫ বছরের মোহাম্মদ শাহজাহান ক্রাচে ভর করে কেন্দ্রে এলেন। বললেন, ‘পরিবেশটাই ভালো লাগছে। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকলেই হয়।’

আরমানিটোলা স্কুলের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল ফজল জানান, ‘সকালটা ভোটারের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বেড়েছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আশা করছি, বিকেলে আরও বাড়বে।’

লালবাগে হাত ধরা পথচলা

লালবাগ কেল্লার পাশের রহমতুল্লা মডেল হাইস্কুলে দেখা গেল প্রবীণ এক দম্পতিকে। রিকশা থেকে নামার সময় হাত ধরাধরি। স্ত্রীকে নারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে স্বামী নিজেও লাইনে দাঁড়ালেন। স্বামী বললেন, ‘ভোট দেওয়া আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। এখন ভালোভাবে সব সম্পন্ন হলেই হয়।’

কেন্দ্রের সামনে চায়ের দোকানে কয়েকজন মধ্য বয়সী ভোটার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা করছিলেন। একজনের মন্তব্য, ‘এবার প্রতিযোগিতা আছে। মানুষ ভোট দিতে পারলে ফলও ঠিকঠাক হবে।’

লালবাগ কেল্লার পাশের রহমতুল্লা মডেল হাইস্কুল কেন্দ্রে দেখা গেল প্রবীণ এই দম্পতিকে
ছবি: মাসুম অপু

ধীরগতি, তবু স্বতঃস্ফূর্ততা

কামরাঙ্গীরচরে নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। তবে কেউ কেউ জানিয়েছেন, ভোট গ্রহণের গতি কিছুটা ধীর। কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বাইরে রাস্তায় সেনাবাহিনীর গাড়ির টহলও দেখা গেছে।

আরমানিটোলা স্কুলে দেখা মেলে ৬৬ বছরের মনোয়ার হোসেনের, বললেন, ‘এত সুন্দর ভোট আগে দেখি নাই। যে জিতবে—হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হইবো। লড়াই থাকলে ভোটের দাম থাকে।’

এক তরুণী ভোটার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বললেন, ‘লাইনে সময় লেগেছে। কিন্তু নিরাপদ লাগছে। সেটাই বড় কথা।’

বেগমবাজারের হলিহার্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে এনায়েত করিম ও বরকাতুল আলিফ
প্রথম আলো

প্রথম ভোটের উত্তেজনা

বেগমবাজারের হলিহার্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে দেখা গেল বরকাতুল আলিফকে। নতুন জামা পরে এসেছেন মা–বাবা ও বোনকে নিয়ে। তাঁর মা নাসরিন আক্তারও ভোট উপলক্ষে নতুন পোশাক পরেছেন। প্রথম ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত আলিফ বললেন, ‘আঙ্কেল, একটা ভাব আছে না—প্রথমবার ভোট দিচ্ছি! নতুন জামা কিনছি। সারা রাত ঘুম হয় নাই।’

তাঁর বাবা এনায়েত করিম যোগ করেন, ‘আমরা চাই নিয়মিত ভোট হোক। তাহলে রাজনীতি নিয়ে হতাশা কমবে। গণতান্ত্রিক সরকার আসুক, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হোক—এই প্রত্যাশা।’

সকালে বয়স্ক নারীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর গড়াতেই তরুণদের ভিড় বাড়ে। সেলফি, আড্ডা, চায়ের দোকানে আলোচনা—সব মিলিয়ে একধরনের মিলনমেলার আবহ।

ফলাফলের অপেক্ষায় শহর

দিনভর পুরান ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি ও প্রত্যাশা কাজ করছে। কেউ বলছেন, ‘এবার যেন নিয়মিত নির্বাচন হয়।’ কেউ বলছেন, ‘ফল যা–ই হোক, ভোটের অধিকারটা যেন থাকে।’

১৭ বছর পর ভোট দিতে পেরে কারও চোখে জল, কারও মুখে হাসি। কেউ বন্ধু নিয়ে, কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে, কেউ ক্রাচে ভর দিয়ে—সবাই যেন এক স্রোতে।

বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ শেষ হলে সবার চোখ থাকবে ফলাফলের দিকে। পুরান ঢাকার সরু গলি যেন দিনের শেষে একটাই কথাই বলছে—ভোট শুধু ব্যালটে ছাপ নয়, তা অধিকার ও প্রত্যাশারও প্রকাশ।