নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, দরকার যোগ্যতা ও পেশাদারত্ব

হোসেন জিল্লুর রহমানফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকার। সেই ব্যবস্থার মূল দর্শন ছিল নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের সরকারি পদে বসানো বা স্পয়েলস সিস্টেমের একটি ধারা রয়েছে, যেখানে নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে নিজেদের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে স্পয়েলস সিস্টেমের (দলীয় অনুগতদের সরকারি পদে বসানো) প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোও সেই প্রবণতারই একটি অংশ।

তবে এখানে মূল প্রশ্ন—কোনো পদে আমলা বসানো হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানো হচ্ছে, সেটি নয়; বরং দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও গতিশীল করতে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে।

আরও পড়ুন

বাস্তবতা হলো যেসব প্রতিষ্ঠানে এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই এত দিন আমলাদের নেতৃত্বে প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর বা গতিশীল হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে শুধু আমলাদের ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

সমস্যার মূল জায়গা হলো আমরা দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাদারত্বের পরিবর্তে অনেক সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভিত্তিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কোনো পদে নিজের ঘনিষ্ঠ কাউকে বসানোর মানসিকতাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি আমলা হোন বা রাজনৈতিক ব্যক্তি—দুই ক্ষেত্রেই একই প্রশ্ন প্রযোজ্য; তিনি কি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি?

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদি এসব নিয়োগ কেবল রাজনৈতিক পুরস্কার বা স্পয়েলস সিস্টেমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আসবে না; বরং সরকারের উচিত ছিল আগে ঘোষণা দেওয়া যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরপর একটি স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা। এতে বোঝা যেত যে উদ্দেশ্য রাজনৈতিক পদায়ন নয়; বরং প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।

তবে এখানে মূল প্রশ্ন—কোনো পদে আমলা বসানো হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানো হচ্ছে, সেটি নয়; বরং দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও গতিশীল করতে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আমলাতন্ত্রের মধ্যেও অনেক সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনেও দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি আছেন। তাই বিতর্কটি আমলা বনাম রাজনীতিবিদ নয়; বরং যোগ্য বনাম অযোগ্য—এটাই হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড হবে দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যেমন একটি দক্ষ, মানবিক ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও সেই আকাঙ্ক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ; কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনো অনেক পথ বাকি।

রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তি নয়, যোগ্যতা ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।

অনেকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনে সরকারকে যে কাউকে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেই আইন পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তবে আমার মতে, মূল সমস্যা আইনে নয়; সমস্যা এর প্রয়োগে। আইন সরকারকে সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগ ব্যবহার করা হবে কি না, সেটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে।

আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমরা কি সত্যিই দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাদারত্বকে মূল্য দিচ্ছি? যদি সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলা না যায়, তাহলে কেবল আমলা বদলে রাজনীতিবিদ বা রাজনীতিবিদের বদলে আমলা বসালেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়বে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তি নয়, যোগ্যতা ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।

হোসেন জিল্লুর রহমান: নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)