বগুড়ায় সাংসদকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার কথা বলে চাঁদাবাজির অভিযোগ

>

• সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহর গণসংবর্ধনা দুপুরে
• সংবর্ধনার কথা বলে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
• ২০ জন ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন
• জবাবে তাঁদের হুমকি

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নবনির্বাচিত সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে গতকাল রোববার দুপুরে মহাস্থান বাজার বন্ধ করে প্রতিবাদ করেছেন ব্যবসায়ীরা। আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিফুল ইসলাম লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করে ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৪২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি এ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন। এবার তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৭১৩ ভোট।

নির্বাচনে বিপুল ভোটে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ায় শরিফুলকে আজ সোমবার বেলা তিনটায় মহাস্থানগড় শাহ সুলতান বলখী (রহ.) আলিম মাদ্রাসা মাঠে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। শিবগঞ্জের রায়নগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) পক্ষ থেকে এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ সাংসদ শরিফুলের শ্যালক। তাঁর তত্ত্বাবধানে মহাস্থানগড়ে প্রায় ২০ জন ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে চাঁদাবাজি করছেন ইউনিয়নের দুই সদস্য সানাউল হক ও তোফাজ্জল হোসেন এবং জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম রাব্বানী।

রায়নগর ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মহাস্থান বাজার) তোফাজ্জল হোসেন স্বীকার করেছেন, অনুষ্ঠানের জন্য ২১ জন ব্যবসায়ীকে ‘দাওয়াত কার্ড’ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা হচ্ছিল। তবে ব্যবসায়ীরা খুব কম টাকা দিতে চান। এ কারণে গত রাতেই (রোববার রাত) সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।’

এখন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিজেরাই করছেন বলে দাবি করছেন তোফাজ্জল। তিনি নিজেকে সাংবাদিক দাবি করে বলেন, ‘এটা মিথ্যা সংবাদ। কারও কাছে টাকা চাইনি। শুধু ২০ জনকে দাওয়াত কার্ড দিয়েছি।’

ব্যবসায়ীদের চিঠি দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘টাকা চাওয়ার কথা বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘দোকান বন্ধ করে কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁদের আমরা চিহ্নিত করব।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মহাস্থান বন্দরের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা উল্লেখ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দোকানভেদে টাকার পরিমাণ আলাদা। সাংসদের ছবিসংবলিত চিঠিতে লেখা রয়েছে, রায়নগর ইউনিয়ন পরিষদ ও ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে সাংসদকে বিশাল গণসংবর্ধনা। চিঠির নিচের অংশে টাকার বিষয়টি উল্লেখ করা।

গতকাল দুপুরে মহাস্থান বাজারে কথা হয় এক দোকানির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাজারে সবার মধ্যে এখন আতঙ্ক। ভোটের পর থেকেই এমন চলছে। টাকার কথা কোনোভাবে ওরা জানতে পারলে আমার রুটি-রুজির ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে।’ সাংসদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে ১০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা যা শুনেছেন, তা ঠিক। এখানে প্রতিবাদ করে লাভ নেই। প্রশাসনও তাদের ভয়ে কিছু বলে না।’

বাজারের অন্তত পাঁচজন দোকানির সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। সবাই চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, দেশের সার্বিক অবস্থা এখন এমনই। সাংবাদিকদের বলেও লাভ নেই।

সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য দোকান বন্ধ করে প্রায় ৫০ জন ব্যবসায়ী প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের অন্যতম শফিউল ইসলাম বলেন, তাঁর কাছে ২০ হাজার টাকা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। পরে ২০ জন ব্যবসায়ী মিলে দোকান বন্ধ করে এর প্রতিবাদ করেন।

জানতে চাইলে মহাস্থান বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদত হোসেন বলেন, ‘ওই বিষয়ে আর টাকা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা ব্যবসায়ীদের বলে দিয়েছি, অনুষ্ঠানের জন্য কোনো টাকা দেওয়া হবে না। চেয়ারম্যানকেও এই কথা বলেছি।’

চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘টাকা তোলার অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি। এটা সমাধান হয়ে গেছে। নিজ ইচ্ছায় কেউ দিতে পারেন। না দিলে আপত্তি নেই। তবে চিঠি দিয়ে টাকা চাওয়ার বিষয় ঘটেনি। এটা ভুল–বোঝাবুঝি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেউ টাকা তোলেনি। সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাংসদের ভোট সবাই মিলে করেছেন, কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার দরকার নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঢাকায়। মহাস্থানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। প্রাথমিকভাবে খোঁজ নিয়ে জানলাম, মহাস্থানে আমার লোকজন কোনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়। অন্য কেউ করতে পারে।’