অফুরন্ত সূর্যালোক, বুকভরা হাওয়া

গত ১৮ মার্চ থেকে নিজেকে ঘরে বন্দী করে রেখেছি। দুই সন্তান আর উপসচিব স্ত্রীও ২৬ মার্চ থেকে পুরোপুরি বাসায়। এর মধ্যে ৩০ মার্চ একবারই বেরিয়েছিলাম কাঁচাবাজার করতে। এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যালের কাছেই থাকি। বাজার করি এখানকার একটি সুপারশপ থেকে। সেদিন দেখতে পেলাম, রাস্তায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লোক। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বাইরে গেলে মাস্ক, গ্লাভস আর স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি সব সময়। ঘরের ভেতর নিয়ম করে হাত ধোয়া আর লেবুপানি খাওয়া তো চলছেই। কিন্তু মনের ভেতর সারাক্ষণের অস্থিরতা কাটাতে পারছি কই! মা আছেন গাজীপুরে, দুই ভাই ঢাকায়, বোন টরন্টোতে। সারাক্ষণ তাদের আর তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য দুশ্চিন্তা হয়। দুশ্চিন্তা হয় সহকর্মী আর ছাত্রছাত্রীদের জন্য।

একাধারে চারদেয়ালের মধ্যে থাকতে থাকতে আমার রুটিনও উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। কারণে–অকারণে রাত জাগা হচ্ছে। সেদিন রাত জেগে কন্ট্যাজিয়ন ছবিটি আবার দেখলাম। ভাইরাস–আক্রান্ত পৃথিবীর গল্প। মাঝেমধ্যে আম্মা, ভাইবোন আর বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপকলে কথা হয়। তখন একটু হালকা লাগে।

বাসার গৃহকর্মী আর গাড়ির চালককে অনেক আগেই ছুটি দিয়ে রেখেছি। সারাক্ষণ অনলাইন আর ফেসবুকে আপডেট দেখি। আর দুশ্চিন্তার পারদ ওপরে উঠতে থাকে। ভাবি, আর কত দিন এভাবে থাকতে হবে কে জানে! একের পর এক জায়গা লকডাউন হচ্ছে। অনেকে আমাকে ফোন করে আশার কথা শুনতে চায়। সবাইকে আশাবাদী হতে বলি, মন ইতিবাচক রাখতে বলি। কিন্তু নিজের মনটা বিষণ্ণ। একবারে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মন কাতর হয়ে থাকে। আমি আমার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষের চাহিদা তো তীব্র। সেই চাহিদা আর করোনার দুশ্চিন্তার চাপ মাঝেমধ্যে মন ভারাক্রান্ত করে দেয়। তখন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। ভাবি, এখনো এই অফুরন্ত সূর্যালোক, বুকভরা বাতাস তো নিতে পারছি।

বইমেলা থেকে নতুন কেনা অনেকগুলো বই এখনো পড়া হয়নি। বেশ কয়েকটা বিছানার কোণে সাইড টেবিলে এনে রেখেছি। প্রথমা থেকে এবার বেরিয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের জীবন নিয়ে হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস হেমিংওয়ের সঙ্গে। সেটাই পড়ছি।

প্রায়ই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাতে স্ত্রীকে বেশি সাহায্য করতে পারছি না বলে বাচ্চাদের কথা শুনতে হচ্ছে। বড় মেয়ে এসএসসি
পরীক্ষা দিয়েছে। সারাক্ষণ ইন্টারনেট আর গ্রুপচ্যাট নিয়ে পড়ে আছে। এভাবেই আমাদের দিনগুলো কেটে যাচ্ছে।

অবাক হয়ে শুধু ভাবছি, যে ভাইরাসের মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই, তার সঙ্গেই কিনা প্রাণিজগতের সবচেয়ে শক্তিশালী মস্তিষ্কের প্রাণীটা কিছুতেই
পেরে উঠছে না। এত অসহায় মানুষ কি আগে কখনো হয়েছে?

অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়