চিকিৎসকদের সুরক্ষা জরুরি

হাসপাতালে অন্য রোগে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সময় চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা সুরক্ষা পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে।  ছবি: মঈনুল ইসলাম
হাসপাতালে অন্য রোগে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সময় চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা সুরক্ষা পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে। ছবি: মঈনুল ইসলাম

করোনা মোকাবিলায় সম্মুখসারিতে আছেন চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। এসব পেশাজীবীর মধ্যে বেশ কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁদের সুরক্ষার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এ পর্যন্ত ২২ জন চিকিৎসক, ৫ জন নার্স ও ৪ জন টেকনিশিয়ান করোনায় আক্রান্ত বলে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলো জানিয়েছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে গতকাল রোববার সকালে রাজধানীতে একজন দন্ত চিকিৎসক মারা গেছেন। এ ছাড়া চিকিৎসক, নার্সসহ প্রায় ৫০ জন কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) আছেন।

চীন, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে সেবা দিতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানরা। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির বিষয়টি সারা বিশ্বে এখন আলোচিত হচ্ছে। হাসপাতাল দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হলেও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত রাখার জন্য বিভিন্ন দেশ নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

মহামারির শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গত শুক্রবার সংস্থাটির প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ‘এই মহামারির ইতি ঘটাতে প্রত্যেক ব্যক্তিরই ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা বিশেষত স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিছু দেশে ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন ঝুঁকিতে থাকেন, আমরা সবাই তখন ঝুঁকিতে।’ তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের যদি যথাযথ ও পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক সামগ্রী সরবরাহ করা যায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কোভিড–১৯ আক্রান্ত একজন চিকিৎসক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকদের মনোবল চাঙা রাখা, সাহস ধরে রাখার সব ধরনের উদ্যোগ রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে নিতে হবে। মহামারি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু পদক্ষেপ চিকিৎসকদের বিব্রত করেছে, অনেক চিকিৎসক ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সব ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান দিতে হবে।

চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর্মীদের ১৬টি অধিকারের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

>

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকিতে থাকলে সবাই ঝুঁকিতে থাকে। তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব।

১৯ মার্চ প্রকাশিত বিশ্ব সংস্থার নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্য জানাতে হবে, নির্দেশনা দিতে হবে, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সন্দেহভাজন বা শনাক্ত হওয়া কোভিড–১৯ রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও  ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, গাউন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, পানি ও পরিষ্কার করার সামগ্রী) সরবরাহ করতে হবে।

নির্দেশিকায় আরও বলা আছে, দোষারোপহীন পরিবেশে তাঁদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দৈনিক কাজের মধ্যে ছুটিসহ যথাযথ কর্মঘণ্টা বজায় রাখতে হবে। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু এসব নির্দেশনার অনেক কিছুর ঘাটতি আছে বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকদের দাতব্য সংগঠন বর্ন টু লিভ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আতিকুর রহমান। নবীন এই দন্ত চিকিৎসক বলেন, মানসম্পন্ন পিপিই ও প্রশিক্ষণ সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাননি। এ নিয়ে এখনো অসন্তোষ আছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া চিকিৎসায় যুক্ত হওয়ার অর্থ নিজে থেকে সংক্রমণ ডেকে আনা।

কিছু সমালোচনার পর চিকিৎসকদের কাছে পিপিই পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে সরকার। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. সেলিম মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক ও নার্সদের পিপিই দেওয়া হলেও টেকনোলজিস্টরা এখনো দৃষ্টির বাইরে রয়ে গেছেন। তাঁরা ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন, নমুনা সংগ্রহ করেন এবং আক্রান্ত অনেক রোগীর এক্স–রে করেন। এ পর্যন্ত ৪ জন টেকনোলজিস্ট কোভিড–১৯–এ আক্রান্ত হয়েছেন।

সুরক্ষা পরিস্থিতি

করোনা মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও ছিল না। বাংলাদেশ মূলত চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালিসহ বেশ কিছু দেশের অভিজ্ঞতা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মিত নির্দেশনা থেকে জানার চেষ্টা করছে।

সরকারি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে আনার জন্য গত ২৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুটি নির্দেশনা জারি করে। চিকিৎসকদের জোর করে কর্মস্থলে হাজির করার একটি প্রচেষ্টা তাতে ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে দুটি নির্দেশনাই সরকার প্রত্যাহার করে। স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, ওই প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না।

এরই মধ্যে গত শনিবার ছয়জন চিকিৎসককে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ছয়জন চিকিৎসককে কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে কোভিড–১৯ রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভিযোগ, তাঁরা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। তবে এমন পদক্ষেপ যথাযথ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান।

সরকার কী করছে

৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবিমার ঘোষণা দিয়েছেন। কর্তব্য পালনকারী চিকিৎসক ও নার্সদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও কথা বলেছেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা গতকাল পর্যন্ত ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৪টি পিপিই বিতরণ করেছে। আর রোগী ব্যবস্থাপনা ও সংক্রমণ প্রতিরোধ বিষয়ে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৫ জন চিকিৎসক ও ১ হাজার ৫৪ জন নার্সকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মনোবল বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রাখার জন্য কাউন্সেলিংয়েরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক বা নার্সরা কোনো দিন সরকারের কাছে প্রণোদনা চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন মানসম্পন্ন পিপিই। কিন্তু তাঁরা দেখেছেন, তাঁদের পিপিইর নামে নিম্নমানের পোশাক দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল, আছে। চিকিৎসক ও নার্সদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। 

অবশ্য সরকার এখন যা করছে, তাকে যথেষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন পেশাজীবী চিকিৎসকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে সেবায় নিয়োজিত হবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা।’

বর্তমানে কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে সেবাদানকারী চিকিৎসকদের রাজধানীর উত্তরার একটি হোটেলে থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। চিকিৎসকদের পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এ ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল শাখা) আমিনুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন তাদের সব হোটেল ও মোটেল করোনা মোকাবিলার কাজে ব্যবহারের জন্য বলেছে। ইতিমধ্যে পর্যটনের রাজধানীর মহাখালীর অবকাশ হোটেল চিকিৎসকেরা ব্যবহার শুরু করেছেন। এ কাজে ব্যবহারের জন্য আরও হোটেল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোঁজা হচ্ছে। এ ছাড়া উত্তরার দিয়াবাড়িতে চারটি ভবন নির্দিষ্ট করা আছে। প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করা হবে। 

চীন, ইতালি, সিঙ্গাপুর, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্তের বরাত দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীরা হাসপাতালের বাইরে তাঁদের বাড়িতে কিংবা সমাজের অন্য কোথাও থেকে সংক্রমিত হচ্ছেন। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন বিশ্রামহীন টানা অধিকসংখ্যক রোগীকে সেবা দিয়ে যাওয়ায়।

সার্বিক বিষয়ে কোভিড–১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের কিছু দেশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বীরের মর্যাদা দিয়ে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে। এ দেশেও জেনেশুনে মারাত্মক ভাইরাসের সবচেয়ে কাছে যাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। ঝুঁকি নিচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের সম্মান ও সুযোগ–সুবিধা দিতে হবে।