'মাসুদ রানা' নিয়ে শেখ আবদুল হাকিম ও কাজী আনোয়ার হোসেন যা বলছেন

কাজী আনোয়ার হোসেন। ফাইল ছবি
কাজী আনোয়ার হোসেন। ফাইল ছবি

লিখিত চুক্তিপত্র না থাকায় সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেন ও লেখক শেখ আবদুল হাকিমের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বইয়ের লেখক হিসেবে শেখ আবদুল হাকিমকে স্বীকৃতি দেওয়া রায় বলছে, ‘বই প্রকাশের আগে লেখক-প্রকাশকের মধ্যে প্রকাশিতব্য বইয়ের সংখ্যা, পারিশ্রমিক, কমিশনপ্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট চুক্তি থাকা উচিত।’

আবদুল হাকিম সেবা প্রকাশনীতে টানা ৪৫ বছর লিখেছেন। কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল, সেই প্রসঙ্গটি রায়ে একাধিকবার উঠে এসেছে। আদালতে কয়েকজন সাক্ষীর বক্তব্যে তা প্রমাণিত হয়েছে।

রায় বলছে, বইয়ের রয়ালিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে মূলত কাজী আনোয়ার হোসেন ও শেখ আবদুল হাকিমের মধ্যে বিরোধের জন্ম। সেবা প্রকাশনীর অন্যান্য লেখকের মতো আবদুল হাকিম পাণ্ডুলিপি দিয়ে টাকা নিতেন। বই বিক্রির পর আরও টাকা পেতেন। কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্টি ‘মাসুদ রানা’ পাঠকসমাজে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখককে দিয়ে লিখিয়ে লেখার কিছু পরিবর্তন বা সম্পাদনা করে কাজী আনোয়ার হোসেন নিজের নামে এসব বই প্রকাশ করেছেন।

তবে রায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন জানিয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সত্য বলতে, আমি একটা সিরিজ তৈরি করলাম—“ধ্বংস পাহাড়”। “মাসুদ রানা”। তাতে রাহাত খান আছেন, সোহেল আছে, সোহানা আছে, ইত্যাদি চরিত্র আমি তৈরি করলাম। একটা বিশেষ ঢঙে আমি এগুলো তৈরি করেছি। পাঠক পছন্দ করলেন। এভাবে চলতে শুরু করল। একটা সময়ে আমি দেখলাম, আমি আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। ব্যবসা–বাণিজ্য। তখন আমি শেখ আবদুল হাকিমকে বললাম, “আপনি লিখতে চান এটা? আমি বলে দেব, ঠিক কীভাবে লিখতে হবে। কীভাবে চরিত্র হবে। সে অনুযায়ী যদি লিখে দেন, তাহলে আপনাকে এককালীন টাকা দেব এবং এটার ওপর আপনার কোনো রাইট থাকবে না। যেহেতু আমার সিরিজ। আমার সিরিজে তো আপনি লিখতে পারেন না। আমার সিরিজ “মাসুদ রানা” লিখে অন্য কোনো জায়গায় ছাপতে পারেন না। এটাতে উনি (শেখ আবদুল হাকিম) রাজি হলেন। টানা ৪৫ বছর ধরে লিখলেন। এরপর নানান ধরনের বইও তিনি লিখেছেন। সেগুলোয় তাঁর নাম গেছে। শুধু “মাসুদ রানা” ও “কুয়াশা” সিরিজে আমার নামে গেছে। কারণ, সিরিজ দুটি আমার।’

কাজী আনোয়ার হোসেনই যে ‘মাসুদ রানা’র জনক, তা স্বীকার করেন লেখক শেখ আবদুল হাকিম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কাজীদা “মাসুদ রানা”র জনক। কাজী আনোয়ার হোসেন। তিনি সত্যিকারের একজন ভদ্রলোক। গোপন করে তো উনি কিছু করেননি। ওনার নামে বই ছাপা হোক, তাতে আমার সম্মতি ছিল। আমি তো তখন আইন জানতাম না। উনি যেটা বলেছেন, সেটা মেনে নিয়েছি। বলেছেন, ওনার নামে ছাপলে বেশি বিক্রি হবে, আমরা মেনে নিয়েছি। আমি তো একা না। অনেকেই তো এভাবে লিখেছেন। একটা মানুষ, যিনি পরের নামে লেখেন, তাঁর তো নিডি অবস্থা। আমাকে লিখতে হয়েছে। আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, আপনি জেনেশুনে কেন অন্যের নামে লিখেছেন। এর উত্তর দেওয়া যাবে না। আমি করতে বাধ্য হয়েছি। আমি লিখলাম, উনি কিনে নিলেন। দয়া করে আমাকে বছরের পর বছর টাকা দিয়েছেন। একবার তো দিচ্ছেন, আবার তিন মাস পরপর টাকা দিচ্ছেন। চাইলে টাকা দেন, না চাইলেও টাকা দেন। যখন আইন জানলাম, তখন আমার চোখ খুলে গেছে।’

বই বেশি ছাপলেও কম দেখানো হয় বলে দাবি করে শেখ আবদুল হাকিম বলেন, ‘একটা বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দিলে ১০ হাজার টাকা আমাকে দিতেন কাজী সাহেব (কাজী আনোয়ার হোসেন)। এক মাস পর যখন বইটা বের হতো, তখন আরও কিছু টাকা পেতাম। পরে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রয়ালিটি দিতেন। কিন্তু গোলমাল লাগছে, আমার বই তাঁরা ছাপছেন, সেটা কিন্তু খাতায় তুলছেন না। এটা তো সিরিয়াস একটা সমস্যা। একটা বই তাঁরা ছাপলেন ৬০ হাজার কপি। কিন্তু আমাকে দেখাচ্ছেন সাত হাজার। আমি তো ৫৩ হাজার বইয়ের পয়সা পাচ্ছি না।’ বইয়ের এই রয়ালিটি চাওয়া নিয়ে সেবা প্রকাশনীর কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বের মূল সূত্রপাত হয়েছিল বলে দাবি করেন লেখক শেখ আবদুল হাকিম।

‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের কিছু বই শেখ আবদুল হাকিম হাকিম লিখেছেন, সেটি কপিরাইট বোর্ডের কাছেও লিখিতভাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। রায় বলছে, কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়, আবদুল হাকিম সেবা প্রকাশনীতে চাকরি করতেন। চাকরি থেকে আনোয়ার হোসেনের নির্দেশে বইগুলো লিখেছেন। মালিকের কথায় বই লেখায় আবদুল হাকিম বইয়ের স্বত্ব পেতে পারেন না। যেসব বইয়ের ভেতর আবদুল হাকিমের নাম রয়েছে, সেগুলো ছাড়া কোনোভাবে তিনি অন্য বইয়ের স্বত্ব দাবি করতে পারেন না।

তবে কপিরাইট বোর্ড রায় বলেছে, আবদুল হাকিম যে সেবা প্রকাশনীতে চাকরি করতেন, এর সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেননি প্রতিপক্ষ কাজী আনোয়ার হোসেন। আবদুল হাকিম চাকরিজীবী হলেও পাণ্ডুলিপিপ্রণেতা হিসেবে রচনার মূল মালিক তিনি। প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা চাকরি দিয়ে কারও রচনা নিজের বলে দাবি করা যায় না। যদি যেত, তাহলে ‘আকবরনামার’ লেখক হতেন সম্রাট আকবর, পণ্ডিত আবুল ফজল নন।

‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘জাল’ নামের বইটি যে শেখ আবদুল হাকিমের লেখা, সেটি কপিরাইট বোর্ড নিশ্চিত বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায়ে বলা হয়, ‘জাল’ বইটি প্রথম মুদ্রণে লেখক হিসেবে শেখ আবদুল হাকিমের নাম ছিল। তবে তৃতীয় মুদ্রণে তাঁর নাম নেই। নিশ্চিত হয়ে গত বছর ‘জাল’ বইটি হাকিমের নামে কপিরাইট সনদ দেওয়া হয়। কপিরাইট বোর্ডের ওই রায়ের বিপক্ষে কাজী আনোয়ার হোসেন কোনো আপিল করেননি। লেখক না হওয়া সত্ত্বেও কাজী আনোয়ার হোসেন বইয়ে নিজের নাম ছেপে কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছেন। কপিরাইট আইন অনুযায়ী, প্রণেতার স্বত্বের মালিকানা কোনোভাবে হস্তান্তরযোগ্য নয়। প্রণেতার সম্মতি থাকলেও তাঁর পরিবর্তে লেখক হিসেবে নিজের নাম প্রকাশ করাও নৈতিকতার পরিপন্থী।

লেখক শেখ আবদুল হাকিম। ছবি: সংগৃহীত
লেখক শেখ আবদুল হাকিম। ছবি: সংগৃহীত

‘মাসদু রানা’ লেখার পক্ষে হাকিমের ৬ যুক্তি
‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বই এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের ৫০টি বই লেখার সপক্ষে শেখ আবদুল হাকিম ছয়টি যুক্তি কপিরাইট বোর্ডের কাছে তুলে ধরেছেন।

প্রথম যুক্তি: কাজী আনোয়ার হোসেন নিজে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, তিনি আর ‘মাসুদ রানা’ লেখেন না। হাকিমসহ কয়েকজন তা লেখেন। একই সঙ্গে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘অটল সিংহাসন’ ও ‘প্রমাণ কই’ বইয়ের আলোচনা বিভাগে কাজী আনোয়ার হোসেন স্বীকার করেছেন, তিনি ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ লেখেন না।

দ্বিতীয় যুক্তি: ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের বইগুলো কোন বইয়ের ছায়া অবলম্বনে লেখা হয়েছে, তা সবই তিনি বলতে পারবেন।

তৃতীয় যুক্তি: হাকিম যে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ লিখতেন, এর প্রমাণস্বরূপ রয়েছে কাজী আনোয়ার হোসেনের স্বহস্তে লেখা চিঠি।

চতুর্থ যুক্তি: ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘খুনে মাফিয়া’ বইটির পাণ্ডুলিপি তাঁর কাছে রয়েছে।

পঞ্চম যুক্তি: দুটি বিদেশি বই অবলম্বনে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই ‘মিশন তেল আবিব’ বইটি লেখা হয়।

ষষ্ঠ যুক্তি: ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই হাকিম যে লিখেছেন, এ বিষয়ে কয়েকজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

কপিরাইট বোর্ডের রায়ে বিচারক বলেন, ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ‘জাল’, ‘খুনে মাফিয়া’ ও ‘মিশন তেল আবিব’ এবং ‘কুয়াশা’ সিরিজের বইয়ে শেখ আবদুল হাকিমের পরিবর্তে কাজী আনোয়ার হোসেন নিজের নাম লিখেছেন। একই পদ্ধতি অবলম্বন করে অন্যান্য বইয়ে নিজের নাম লেখার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো পক্ষ ওই বইগুলো রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেনি। আর শেখ আবদুল হাকিম যে ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের বইগুলো লিখেছেন, তা সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা, লেখক, চিত্রশিল্পী—সবাই জানতেন।

কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে করা মামলায় নিজের পক্ষে রায় পেয়ে শেখ আবদুল হাকিম বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেবকে আমি শ্রদ্ধা করি। মানুষের চিন্তার গভীরতা, মানুষের পাণ্ডিত্য, পর্যবেক্ষণের ম্যাজিক, এগুলো দেখে যে মুগ্ধতা হয়, সেগুলো আমার মধ্যে আছে। এই যা কিছু হয়েছে, এগুলো দেখে কিন্তু আমার ভালো লাগছে না। মানবিক দুর্বলতা বলে একটা জিনিস তো আছে।’

এমন হবে কল্পনাও করেননি কাজীদা
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকার ফলে টানা ৪৫ বছর একসঙ্গে কাজ করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন ও শেখ আবদুল হাকিম। কথা বলার সময় দুজনই বারবার সেই বিষয়টি বলেছেন।

‘মাসুদ রানা’র জনক কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করার প্রয়োজন কখনো আমি মনে করিনি। শেখ আবদুল হাকিম অনেক ছোট বয়সে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাঁকে অনেক স্নেহ করতাম। পরে লক্ষ করলাম, উনি আস্তে আস্তে অন্য রকম হয়ে গেলেন। হাতে ধরে ধরে অনেক কিছু শিখিয়েছি। সেই লোক এই কাজ করবেন, এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। কেউ যদি ডিফেম করে, তাহলে আমি তো ঠেকাতে পারব না। ইফতেখার আমিন ও শেখ আবদুল হাকিম আমাকে বলেছিলেন, তাঁদের কথামতো আমি যদি এই কাজগুলো না করি, তাঁদের ২ কোটি ৯ লাখ টাকা যদি আমি না দিই, তাহলে তাঁরা আমার ঘুম হারাম করে দেবেন। এই হুমকি দিয়েছিলেন তাঁরা। ২০১০ সালের আগে হুমকি দেওয়া হয়।’

আক্ষেপের সুরে কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০১০ সালে সাতটা বইয়ের কপিরাইট দেওয়া হয়। একটা বইয়ের মধ্যে শেখ আবদুল হাকিমের নাম ছিল। তিনি আমাকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, তাঁর নাম হলে অন্য বইগুলো ভালো চলবে। আমি সেভাবে দিয়েছিলাম। সব জায়গায় আমার নাম ছিল। প্রকাশক সেবা প্রকাশনী। একটা সময় শেখ আবদুল হাকিম বেরিয়ে যান। পরে তিনি আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি এবং সালাউদ্দিন বইঘরের সালাউদ্দিন সাহেবকে ধরেন। তাঁরা দুজনে আমার কাছে এসেছিলেন। আজ পর্যন্ত কেউই বলতে পারবেন না, আমি টাকা দিইনি। কিন্তু শেখ আবদুল হাকিমের ভয়, আমি টাকা দেব না। আমি তাঁদের বললাম, উনি যখন নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তখন ওনার লেখার দরকার নেই। ওনাকে আমি নেব না। সালাউদ্দিন সাহেব আমাকে বললেন, ওনাকে একটুখানি ছাড় দিন, যাতে তিনি সম্মানের সঙ্গে ঢুকতে পারেন। যখনই আমাকে পাণ্ডুলিপি এনে দেবেন, আমি যখন এডিট করে বুঝব সব ঠিক আছে, আমি যেভাবে বলেছিলাম, সেভাবে হয়েছে তখনই আমি সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দেব এবং সেভাবে চলছিল। এখন তিনি (শেখ আবদুল হাকিম) আবার রয়ালিটি চান। আমি তাঁকে ইংরেজি বইটা দিলাম। তিনি লিখে আনলেন। আমি এডিট করলাম। আমি টাকা ব্যয় করে ছাপলাম। আমি এটার ডিস্ট্রিবিউট করার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করলাম। কাগজ-ছাপা ইত্যাদি সবকিছু করলাম। সবকিছু করার পর আমি এর কোনো কিছু না। তিনি এটার মালিক?’

‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের বইগুলোর লেখক শেখ আবদুল হাকিম—কপিরাইট বোর্ডের এমন রায়ে হতবাক কাজী আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘শেখ আবদুল হাকিম “মাসুদ রানা”র ২৬০টি এবং “কুয়াশা”র কপিরাইট নিচ্ছেন। তিনি তো “মাসুদ রানা” হিসেবে বইগুলো বের করতে পারবেন না। কুয়াশাও অন্য প্রকাশকের কাছ থেকে বের করতে পারবেন না। যদি করেন, তাহলে আমি অবশ্যই মামলা করব। “মাসুদ রানা”র ট্রেডমার্ক আমার, সেবা প্রকাশনীর ট্রেডমার্ক আমার। কপিরাইট আমার। আমার সিরিজে উনি (শেখ আবদুল হাকিম) লিখে অন্য কাউকে দিয়ে ছাপাবেন, এটা তো আমি বরদাশত করতে পারব না। “মাসুদ রানা”, “কুয়াশা”তো আমার সিরিজ। আমার পাত্র-পাত্রী। এসব নিয়ে তো উনি লিখতে পারেন না, এটাই তো কেউ তাঁকে বোঝাচ্ছেন না। আমার অনুমতি ছাড়া তো উনি লিখতেই পারেন না। আমি আমার কথামতো তাঁকে টাকা দিয়েছি। তাঁর স্বাক্ষর আমার কাছে। উনি যে এত কিছু করছেন, ওনার লাভটা কী হবে। আমি তো মেনে নেব না, আমার প্রতিষ্ঠিত, আমার তৈরি করা সিরিজ আরেকজন নিয়ে যাবেন। এটা তো আমি কোনোভাবে অ্যালাউ করব না। এমনটা হতে পারে, তা আমি ভাবিনি।’

উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই। ফাইল ছবি
‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই। ফাইল ছবি


কোন যুক্তি শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে গেল
‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ২৬০টি বইয়ের লেখক হিসেবে শেখ আবদুল হাকিমকে স্বীকৃত দিয়ে রায় প্রকাশ করেন কপিরাইটস বোর্ডের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী। কী প্রমাণের ভিত্তিতে এই রায়, সে সম্পর্কে রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষে তিনটি যুক্তি দিয়ে বলা হয়, “মাসুদ রানা” এবং “কুয়াশা” সিরিজের বইগুলোর স্বত্ব কোনোভাবে শেখ আবদুল হাকিম পাবেন না। প্রথম যুক্তি ছিল, শেখ আবদুল হাকিম ৩৯ থেকে ৪০ বছর সেবা প্রকাশনীতে লিখেছেন। উনি মালিকের (কাজী আনোয়ার হোসেন) নির্দেশে লিখেছেন। স্বত্ব এবং প্লটটা কাজী আনোয়ার হোসেনের। সে জন্য এটা ওনার। দ্বিতীয় যুক্তি, বইটি প্রকাশিত হয়েছে কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে। উনি এই সিরিজের লেখক, এটা সবাই জানেন। যাঁর নামে বই মুদ্রিত হয়, সেটিই তো বড় প্রমাণ। অন্যদিকে, শেখ আবদুল হাকিমের যুক্তি, আমি পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম। কিন্তু আমার নাম বাদ দিয়ে যদি প্রকাশক নিজের নামে প্রকাশ করেন, তাহলে কি তিনি লেখক হয়ে গেলেন? “মাসুদ রানা” সিরিজের বইগুলো বিদেশি বই অবলম্বনে হয়েছে। যেহেতু আমি লেখক, আমি জানি, কোন বই অবলম্বনে এগুলো লেখা হয়েছে। প্রকাশক অধিকাংশ বইয়ের কথা জানেন না। একুশে পদকপ্রাপ্ত বিখ্যাত লেখক বুলবুল চৌধুরী, বিখ্যাত অনুবাদক শওকত হোসেন, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হাশেম খান এবং সেবা প্রকাশনীর ইসরাইল হোসেন জানেন, আমিই বইগুলো লিখেছি। “মাসুদ রানা”র অধিকাংশ বই শেখ আবদুল হাকিম লিখেছেন, সেটি তাঁরা জানেন। শেখ আবদুল হাকিমের কাছে অনেক চিঠি আছে। কাজী আনোয়ার হোসেন চিঠি দিয়ে চরিত্রের নাম পরিবর্তন করতে বলেছেন। কাজী আনোয়ার হোসেন পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, উনি আর “মাসুদ রানা” লেখেন না। “মাসুদ রানা’ সিরিজ লেখেন হাকিমসহ কয়েকজন। এই চারটা গ্রাউন্ডের ওপর ভিত্তি করে কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শেখ আবদুল হাকিম প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন বলে আমি মনে করেছি।’

কপিরাইট বোর্ডের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘মালিকের নির্দেশে কেউ যদি লেখেন, এই স্বত্বটা কর্মচারী দাবি করতে পারেন না। এই যুক্তি দিয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেনের আইনজীবী। কপিরাইট আইন বলে, মালিকের নির্দেশে লেখেন আর আর যার নির্দেশে লেখেন, এতে কিছু আসে-যায় না। কারণ, মরাল রাইট প্রণেতারই থাকে, লেখকেরই থাকে। মালিক কখনো লেখক হতে পারেন না। এটাই হলো মূল বিষয়।’