তালিকার শীর্ষে বদি

.
.

৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তালিকার এক নম্বরে আছে সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম। এর মন্তব্য কলামে বলা হয়েছে, ‘তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় কিছু ব্যক্তিবর্গ ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত।’
গত ২৩ জানুয়ারি তালিকাটি তৈরি করেছে অধিদপ্তরের অপারেশন ও গোয়েন্দা বিভাগ। তালিকায় আরও আছে কক্সবাজারের সরকারদলীয় সাংসদের মামা মং মং সেন, ভাই মৌলভি মুজিবুর রহমান, মো. সফিক, মো. ফয়সালসহ তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ২৫ জনের নাম।
কক্সবাজারের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় ইয়াবা বড়ি ধরা পড়লেও গডফাদাররা থেকে যায় আড়ালে। এ কারণে ইয়াবা ব্যবসা আর বন্ধ হয় না।
তবে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে নিজে ও পরিবারের লোকজনের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন সাংসদ বদি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে ভুয়া তালিকা তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি নতুন তালিকা করার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকলে আমাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হোক।’
মন্ত্রণালয়ের তালিকা দেওয়ার পরও কেন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরতে অভিযান হয় না, জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই তালিকা ধরে পুলিশ, বিজিবি, র্যা ব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত মার্চ-এপ্রিলে টেকনাফে ইয়াবাবিরোধী যৌথ অভিযান শুরু করে। সে সময় বন্দুকযুদ্ধে সাত ইয়াবা ব্যবসায়ী মারা যান। এরপর তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ গা ঢাকা দেন, কেউ বিদেশ পাড়ি জমান।
পুলিশের নথিপত্রে দেখা গেছে, গত ২০ মার্চ টেকনাফের নাফ নদীর জলিলেরদিয়া এলাকায় র্যা বের সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবার গডফাদার নূর মোহাম্মদ মারা যান। ২৭ এপ্রিল টেকনাফে বিজিবি ও র্যা বের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও টেকনাফ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জাহেদ হোসেন ও নাইট্যংপাড়ার ফরিদুল আলম। এর আগে ২৫ এপ্রিল টেকনাফ সমুদ্র উপকূলে কোস্টগার্ডের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চার ইয়াবা ব্যবসায়ী টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মো. আমিন ওরফে আমিন মাঝি, কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ গ্রামের জহিরুল আলম, মহেশখালীর মো. কালু ও মো. হোসেন নিহত হন।
তবে পুলিশের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এত কিছুর পরও ইয়াবা চোরাচালান বন্ধ করা যাচ্ছে না; বরং কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা মজুত করে তারপর সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। আর এখন স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্র উপকূল দিয়েও ইয়াবা আসছে।
এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বিজিবি বলেছে, মিয়ানমারের পার্লামেন্ট ও দেশটির শাস প্রদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মংডু ও বুচিডং এলাকার সীমান্তরক্ষী, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, কাস্টম পুলিশ ও গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করছেন। এ জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১৫টি স্থানে ৩৭টি কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রতিবেদনেও সাংসদ বদির নাম রয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কক্সবাজার সেক্টরের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রায় প্রতিদিন নাফ নদী অতিক্রম করে ইয়াবার চালান টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়িতে আনার সময় বিজিবির হাতে ইয়াবাসহ পাচারকারীরা ধরা পড়ছে। ইয়াবা চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে বিজিবির টহল বৃদ্ধি, বিজিবির অতিরিক্ত ফাঁড়ি স্থাপন এবং সড়কে প্রশিক্ষিত কুকুর মোতায়েন করা হয়েছে। তার পরও মাছ ধরার ট্রলার বা জাহাজে লুকিয়ে সমুদ্রপথে ইয়াবা আসছে।
বিজিবি কক্সবাজার ১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ১৬ থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের মহাপরিচালক পর্যায়ে সম্মেলন হবে। ওই সম্মেলনে ইয়াবাসহ মাদক চোরাচালান বন্ধ, মিয়ানমারে স্থাপিত ইয়াবা কারখানা উচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত নভেম্বরে বিজিবি, র্যা ব ও পুলিশ আলাদা অভিযান চালিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৫ কোটি টাকার পাঁচ লাখ ইয়াবা জব্দ করেছে। এ বছরের ১১ মাসে শুধু বিজিবি উদ্ধার করে ৫০ কেজি ওজনের ২১ লাখ ২২ হাজার ইয়াবা, যার মূল্য ৬৪ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে বিজিবি ইয়াবা উদ্ধার করেছিল ১০ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৪টি, যার মূল্য ৩১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বিজিবির হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ইয়াবা ধরা পড়েছে দ্বিগুণের বেশি।