প্রতিবছর সরকার ঘোষিত বাজেটে নাগরিকদের আয়কর দেয়া নিয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। তাই আয়কর নিয়ে কমবেশি সবাই ভাবনায় থাকেন। আয়ের বাইরেও নিজের অর্জিত সম্পদ দান করা হলে তা থেকেও আয়কর দিতে হয় (দানকারীকে), যা অনেকেই জানেন না। দানের প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হলে তা করযোগ্যতা হারাবে, সে বিষয়ে বলা আছে ১৯৯০ সালের দানকর আইনে। দানকরের বিষয়ে আইনটির ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের ১ জুলাই থেকে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো আর্থিক বছরে সম্পাদিত সব দানের ওপর তফসিলে বর্ণিত হারে কর ধার্য হবে। অর্থাৎ, আর্থিক বছরগুলোতে যে সম্পদ দানের যে কার্যক্রম সম্পাদিত হয়, তার কর দায় তফসিল (সরকার প্রদত্ত) মোতাবেক দানকারী ব্যক্তিকে পরিশোধ করতে হবে। আবার একই আইনে কাকে, কীভাবে দান করা হলে তা থেকে দানকারী ব্যক্তি কর মওকুফের আওতায় আসতে পারে, সে বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে দানকরের অব্যাহতি পাবেন
আমাদের দেশে সম্পদের মালিকের মৃত্যুশয্যায় কিংবা উইলমূলে দানের প্রচলন সবচেয়ে বেশি। আর এ বিষয়টিও কর রেয়াত পেতে আইনে সুস্পষ্ট করা হয়েছে। দানকর আইন, ১৯৯০–এর ৪ ধারা অনুসারে দানকর থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি প্রযোজ্য হবে। যদি ৪(১) ধারামতে (ক) দানকৃত সম্পত্তি বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত হয়; (খ) সরকার বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দান করা হয়; (গ) দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো তহবিল বা প্রতিষ্ঠানকে করা হয়; (ঘ) ভরণপোষণের জন্য দানকারীর ওপর নির্ভরশীল কোনো আত্মীয়ের বিয়ের সময় সর্বোচ্চ বিশ হাজার টাকার মূল্য পর্যন্ত দান করা হয়; (ঙ) স্ত্রী ব্যতীত, ভরণপোষণের জন্য তার ওপর নির্ভরশীল কোনো আত্মীয়কে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা মূল্য পর্যন্ত বিমা বা বার্ষিক বৃত্তির পলিসি করে দিলে; (চ) উইল করে দান করলে; (ছ) মৃত্যুচিন্তায় থাকায় মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তি দান করলে; (জ) পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতা, স্বামী/স্ত্রী, আপন ভাই-বোনকে দান করলে দানকারী ব্যক্তিকে দান করা সম্পদের ওপর কোনো কর দিতে হবে না।
একই সঙ্গে ৪(২) ধারামতে, উপ-ধারা (১)–এ উল্লিখিত অব্যাহতি ছাড়াও কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো আর্থিক বছরে করা ২০ হাজার টাকা মূল্যের দানের ওপর এই আইনের অধীন কোনো দানকর ধার্য হবে না৷ অর্থাৎ তিনি কর রেয়াত পাবেন; (৩) সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোনো শ্রেণির দান অথবা যেকোনো শ্রেণির ব্যক্তিকে এই আইনের অধীন প্রদেয় কর থেকে অব্যাহতি দিতে পারবে। তবে এখানে একটি শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে, এই উপধারার অধীন প্রজ্ঞাপিত অব্যাহতি উক্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষে করা যাবে।
দানকর রেয়াতের আরও সুযোগ রয়েছে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা বন্যা বা দুর্যোগ মোকাবিলায় দান করা সম্পদের ক্ষেত্রে দানকর রেয়াতের কথা আইনে বলা হয়েছে। দানকর আইন ১৯৯০–এর ৪(১) (গ) ধারায় বলা হয়েছে, দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো তহবিল বা প্রতিষ্ঠানকে যেমন: (অ) বাংলাদেশে প্রচলিত কোনো আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অথবা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বা পরিচালিত কোনো পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; (আ) সরকার বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত বা পরিচালিত অথবা সরকার বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত কোনো হাসপাতাল; (ই) সরকার কর্তৃক গঠিত বা অনুমোদিত কোনো বন্যা বা দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে দান করলে সে দানের ওপর কোনো কর দিতে হবে না।
পাশাপাশি ৪(১) (গ) (ঈ) ধারা মোতাবেক, সাধারণ জনগণের কল্যাণার্থে পরিচালিত নয়, এমন কোনো ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যতীত, ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ও সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বা ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত আইনে নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে করদাতা কর্তৃক সংশ্লিষ্ট কর বছরের নিরূপিত মোট আয়ের ২০ শতাংশ বা ১ লাখ টাকা, এই উভয়ের মধ্যে যা কম হয়, সে পর্যন্ত দান করের আওতাভুক্ত হবে না।
দানকর থেকে মুক্তি পেতে যা করণীয়
দানকর নিয়ে জটিলতা থাকলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। যদিও এ বিষয়ে আইনেই কিছু প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা রয়েছে। দানকর থেকে মুক্তি পেতে হলে আইনটির ৭(১) ধারা অনুসারে, কোনো আর্থিক বছরে করযোগ্য দান করেছেন, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের পূর্বে নির্ধারিত ফরমে এবং পদ্ধতিতে উক্ত দান সম্পর্কিত একটি রিটার্ন উপকর কমিশনারের নিকট দাখিল করতে হবে। ধারা ১০ অনুসারে উপকর কমিশনার রিটার্নে সন্তুষ্ট হলে তিনি উক্ত রিটার্নের ভিত্তিতে করদাতা কর্তৃক প্রদেয় দানকর নির্ধারণ করবেন। তবে রিটার্ন দাখিলের পর ৭(২) ধারা মোতাবেক, উপকর কমিশনার যদি অভিমত পোষণ করেন যে কোনো ব্যক্তির কোনো আর্থিক বছরে কৃত দানসমূহ এই আইনের অধীন দানকরযোগ্য তাহলে তিনি উপধারা (১)–এ যা কিছুই থাকুক না কেন, তত্কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে এবং পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের জন্য নোটিশ দিয়ে রিটার্ন দাখিলকারীকে নির্দেশ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে উপকর কমিশনারের নোটিশের মেয়াদ সর্বনিম্ন ৩০ দিন হতে হবে বলেও আইনে বলা আছে; আবার উপধারা (৩) অনুসারে, উপকর কমিশনার যথাযথ বিবেচনা করলে এই ধারার অধীন রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়িয়ে দিতে পারবেন।
ভুল তথ্য দিলে দিতে হবে জরিমানা
কর ফাঁকির প্রচেষ্টায় রিটার্ন দাখিলের সময় অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়ে থাকেন। দানকর রিটার্নের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে তাঁকেও জরিমানার নোটিশ দিয়ে থাকেন উপকর কমিশনার। তাই যদি কোনো ব্যক্তি তত্কর্তৃক উপকর কমিশনারের নিকট দাখিলকৃত কোনো রিটার্নে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল তথ্য পরিবেশন করেন বা উপকর কমিশনারের নিকট থেকে নোটিশপ্রাপ্তির পরও কোনো রিটার্ন দাখিল করিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হন, তাহলে উপকর কমিশনার তত্কর্তৃক নির্ধারিত দানকরের অনধিক শতকরা ৫০ ভাগ পরিমাণ অর্থ জরিমানা হিসেবে আরোপ করতে পারবেন এবং এই জরিমানা দানকরের সঙ্গে আদায়যোগ্য হবে।
দানকর আইনের প্রয়োগ নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা তৈরি হয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি মামলাকে কেন্দ্র করে। ১৯৯০ সালের দানকর আইন অনুযায়ী মোট তিন করবর্ষের কর দাবি করে তাঁকে নোটিশ দেয় এনবিআর। দানের বিপরীতে কর দাবি করে এনবিআরের ওই তিনটি নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন ড. ইউনূস। ট্যাক্স আপিল ট্রাইব্যুনালে এসব মামলা করা হয়। মামলায় ড. ইউনূসের দাবি, আইন অনুযায়ী দানের বিপরীতে এনবিআর এই কর দাবি করতে পারে না। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর ড. ইউনূসের আবেদন খারিজ করেন আদালত। এরপর ২০১৫ সালে তিনি হাইকোর্টে তিনটি রিট মামলা করেন। ওই মামলাগুলোর শেষে গত ৩১ মে রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। দানকর আইনের ৪ ধারা অনুসারে ড. ইউনূসের দানকর রেয়াতের আওতাভুক্ত ছিল না বলে হাইকোর্টের কাছে প্রমাণিত হয়। তাই ড. ইউনূস কর্তৃক এনবিআরকে ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালের দানকর বাবদ বকেয়া ১২ কোটি টাকারও বেশি পরিশোধ করতে বলা হয়।
বাহাউদ্দিন আল ইমরান আইনজীবী