বাংলাদেশ–ইইউ পিসিএ অনুস্বাক্ষর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) অনুস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস। সোমবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের সদর দপ্তরেছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অনুস্বাক্ষর হওয়া অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) দুই পক্ষের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই চুক্তি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হবে।

সোমবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের সদর দপ্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস চুক্তিটির বিষয়ে এ মন্তব্য করেন। এদিন তাঁদের উপস্থিতিতে চুক্তিটি অনুস্বাক্ষর করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, খলিলুর রহমান ও কায়া কালাস চুক্তির অনুস্বাক্ষরকে স্বাগত জানান এবং তাঁরা এ চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা হিসেবে উল্লেখ করেন। চুক্তিটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশ-ইইউ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন। এ চুক্তি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ-ইইউ পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করবে বলে তাঁরা মতপ্রকাশ করেন।

চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং ইইউর পক্ষে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পাম্পালনি অনুস্বাক্ষর করেন।

পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস। তাঁরা বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইইউর ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের চলমান সংস্কার, পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশে ইইউর একটি শক্তিশালী নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর জন্য কায়া কালাসকে ধন্যবাদ জানান। কায়া কালাস একটি সফল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অভিবাসন, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাজার প্রবেশাধিকারসহ বাংলাদেশের অন্য অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন এবং ইইউর সঙ্গে আরও শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেন। তিনি দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগ্রহও ব্যক্ত করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে ইইউর সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং এ দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য ইইউর অব্যাহত সম্পৃক্ততা কামনা করেন।

এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র, ইউরোপীয় বিষয়ক এবং উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ সময় উভয় মন্ত্রী বাংলাদেশ-বেলজিয়ামের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, উদ্ভাবন এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও সুসংহত করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন। উভয় পক্ষ এ বছরের শেষে ব্রাসেলসে তৃতীয় বাংলাদেশ-বেলজিয়াম দ্বিপক্ষীয় কনসালটেশনস আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ওষুধশিল্প, প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনাসহ যেসব ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের দক্ষতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে বেলজিয়ামের আরও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। উভয় পক্ষ অভিবাসন, ভিসা ও কনস্যুলার বিষয় এবং রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় করেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বহুপক্ষীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করবে বলে আশা ব্যক্ত করে।

এ ছাড়া একই দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় কমিশনের স্টার্টআপ, গবেষণা ও উদ্ভাবনবিষয়ক কমিশনার একাতেরিনা জাহারিয়েভার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ইইউ সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় হরাইজন ইউরোপ কর্মসূচির আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নসহ সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরোধ জানান।

এক দিনের এ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহান এবং বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইইউ মিশনের প্রধান খন্দকার মাসুদুল আলম উপস্থিত ছিলেন।