বাবা শহীদ হওয়ার পর আমাদের পরিবারের খোঁজ কেউ নেয়নি: জুলাই শহীদ মনিরুলের মেয়ে
‘২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আমার বাবা প্রথম আন্দোলনে গিয়েছিলেন। ১৯ জুলাইও তিনি সারা দিন আন্দোলনে ছিলেন। সেদিন মাগরিবের নামাজ শেষে বের হওয়ার পরই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমার বাবা মিরপুরে শহীদ হলেও আমাদের পরিবারের খোঁজ কেউ নেয়নি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী—কেউ না।’ এভাবে নিজের কষ্ট ও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মনিরুল ইসলামের মেয়ে রুফাইদা ইসলাম।
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন রুফাইদা ইসলাম। গণ–অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম এসডিএফ ‘জুলাইয়ের কান্না, জাতির দায়’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
শহীদ মনিরুল ইসলামের মেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধু আবু সাঈদ বা মুগ্ধরাই কি শহীদ? অন্য শহীদদের কি খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই? হয়তো প্রত্যেক জেলায় গিয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আমার বাবা তো মিরপুরে শহীদ হয়েছেন। মিরপুর তো দূরের কোনো জায়গা নয়। তবু কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।’
সরকারের প্রতি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে রুফাইদা বলেন, ‘জুলাই সনদ ছাড়া আমাদের আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো পরিচয় নেই। এ ছাড়া আমি জুলাইয়ের ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার চাই এবং শেখ হাসিনার বিচার চাই।’
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরেন মোছা. শাহিনা বেগম। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, আপনি ছাত্রদের এবং শহীদ পরিবারগুলোর সামনে জুলাইয়ের ইতিহাস যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করে যাবেন। সেই প্রত্যাশা নিয়েই আমরা আপনাকে সমর্থন করেছিলাম এবং বিশ্বাস করেছিলাম, তিনিই আমাদের জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব। কিন্তু তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেছেন এবং বিএনপির হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেছেন। অথচ আজও কবরগুলো শনাক্ত হয়নি, আহতদের গেজেট হয়নি। তিনি আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রেখে গেছেন। আমরা কি শহীদ পরিবার হিসেবে এতটুকুও পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না?’
মতবিনিময় সভায় সন্তান হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেন শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের (সজল) মা মোছা. শাহিনা বেগম। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে মৃত্যুর আগে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে আমাকে শেষবার বলেছিল, “আম্মু, আমি যদি শহীদ হই তাহলে আমার আইডি কার্ড দেখে আমাকে শনাক্ত করবে।”’ এই মা বলেন, ‘স্বৈরাচার সরকার আমার সন্তানকে পুড়িয়ে দিলেও সেই আইডি কার্ডটি পুরোপুরি পুড়িয়ে দিতে পারেনি। আইডি কার্ডের একটি অংশ অক্ষত ছিল এবং সেখান থেকে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।’
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে হতাশার কথা তুলে ধরেন মোছা. শাহিনা বেগম। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, আপনি ছাত্রদের এবং শহীদ পরিবারগুলোর সামনে জুলাইয়ের ইতিহাস যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করে যাবেন। সেই প্রত্যাশা নিয়েই আমরা তাঁকে সমর্থন করেছিলাম এবং বিশ্বাস করেছিলাম, তিনিই আমাদের জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব। কিন্তু তিনি দায়িত্ব ছেড়ে চলে গেছেন এবং বিএনপির হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেছেন। অথচ আজও কবরগুলো শনাক্ত হয়নি, আহতদের গেজেট হয়নি। তিনি আমাদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রেখে গেছেন। আমরা কি শহীদ পরিবার হিসেবে এতটুকুও পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না?’
বর্তমান সরকারের উদ্দেশে মোছা. শাহিনা বেগম বলেন, ‘আজ সরকার বাড়ি, গাড়ি ও বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। কিন্তু আমরা বাড়ি-গাড়ি চাই না। আমরা বিচার চাই। তারেক রহমান স্যার, আপনি যদি পারেন, শেখ হাসিনাকে দেশে এনে তার ফাঁসির ব্যবস্থা করুন। আর যদি বিচার করতে না পারেন, তাহলে জুলাই আন্দোলনে আমরা যে সন্তানদের হারিয়েছি, সেই দুই হাজার মায়ের হাতে শেখ হাসিনাসহ সব আসামিকে ছেড়ে দিন। আমরা তাদের বিচার করব।’
২০২৪ সালে জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল, সেই প্রশ্ন রাখেন শহীদ রমিজ উদ্দীনের বাবা রকিবুল ইসলাম। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করুন এবং বৈষম্য দূর করুন। প্রত্যেক শহীদ হত্যার বিচার বাস্তবায়ন করে দেখান। জুলাই সনদকে স্বীকৃতি দিন। গণভোটকে মেনে নিন।’
‘শুধু আবু সাঈদ বা মুগ্ধরাই কি শহীদ? অন্য শহীদদের কি খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই? হয়তো প্রত্যেক জেলায় গিয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আমার বাবা তো মিরপুরে শহীদ হয়েছেন। মিরপুর তো দূরের কোনো জায়গা নয়। তবু কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।’রুফাইদা ইসলাম, জুলাই শহীদ মনিরুল ইসলামের মেয়ে
মতবিনিময় সভায় আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে যারা জুলাই আন্দোলন, জুলাইয়ের শহীদদের ছোট করবে, হেয় করবে কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করবে—এসব কর্মকাণ্ডকে আইনগতভাবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর জন্য একটি সম্মানজনক পুনর্বাসন স্কিম চালু করতে হবে। যেসব পরিবার তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের জন্য আজীবন সম্মানজনক পেনশন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা উচিত।’