সরকার তথ্য গোপন করলে সংকট হয়

‘ফলস ন্যারেটিভ, প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড ডিজইউনিটি: থ্রেটস টু স্ট্যাবিলিটি, ন্যশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইউনিটি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলেছবি: প্রথম আলো

সরকারের সব তথ্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। তাঁর মতে, সরকার তথ্য গোপন করলে সংকট হয়, সমস্যা হয়। তিনি বলেন, ‘সব কথা, সব ইনফরমেশন দিতে হবে।’

আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ফলস ন্যারেটিভ, প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড ডিজইউনিটি: থ্রেটস টু স্ট্যাবিলিটি, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইউনিটি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী এ কথা বলেন। সিটিজেনস ফোরাম বাংলাদেশ (সিএফবি) আয়োজিত এ আলোচনায় শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে দেশে চলমান জ্বালানিসংকট নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, তেলের সংকট বিশ্বব্যাপী। এর জন্য দায়ী যারা যুদ্ধে জড়িয়েছে তারা। পাম্পে তেল নিতে মানুষের যে ভোগান্তি হয়েছে, সেটির জন্য তো সরকারকে দায়ী করা যাবে না।

অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের উচিত জনগণকে সত্য কথা বলে দেওয়া। তেল আনতে দেরি হচ্ছে। সব পাম্পে তেল দিতে পারছে না। আরও তেল আনতে চেষ্টা চলছে। এ কথাগুলো কেন খোলাখুলি বলা যাবে না?’

জাতীয় ঐক্য

সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের প্রবণতা নিয়ে আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। এই সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন তিনি। আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘যেমন করে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, তেমনি আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকলে অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য কোনো সমস্যা তৈরি করতে পারবে না।’ মিথ্যা তথ্য আইন দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, আইন করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। আইন করে এগুলো বন্ধ করতে গেলে তা ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মিথ্যা বয়ানকে সত্য বয়ান দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

গুরুতর হুমকি

গোলটেবিল আলোচনায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা।

অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, এই মিথ্যা তথ্যগুলো এমনভাবে ভাইরাল করা হয় যে অল্প সময়ের মধ্যে তা মানুষের মনোজগৎ ও সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরিতে এটি একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে, যা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের জন্যও গুরুতর হুমকি।

গুজবকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে বর্ণনা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী। এর সঙ্গে মানসিক অসুস্থতা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচার–প্রচারণা বাড়াতে হবে।

সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করেন বিএনপির থিঙ্কট্যাংক জি৯–এর সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিলে ভিন্নমত দমন বা বাক্‌স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন কৌশলগত পদক্ষেপ।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংসদীয় এবং বাইরের গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সব দলের প্রতিনিধি কমিটিতে থাকলে একতরফা বা ভিন্নমত দমনের চেষ্টা বলার সুযোগ থাকবে না।

কার্যকর সমন্বয়

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির বলেন, এখন অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এবং অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক তথ্য দিয়ে তার কার্যকর প্রত্যুত্তর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি মাজহারুল ইসলাম, সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ, ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম প্রমুখ। আলোচনায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন ফাউন্ডেশন ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) সেক্রেটারি জেনারেল ইসারাফ হোসেন।