সভার শুরুতে সাধারণ নাট্যকর্মীদের পক্ষে ধারণাপত্র পাঠ করেন অলক বসু। নাট্যচর্চার বেশকিছু সমস্যা সনাক্ত করেছেন তাঁরা। এগুলো হলো, শিক্ষার সঙ্গে নাট্যচর্চার সম্পর্ক না থাকা, দল পরিচালনায় যুগোপযুগী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, পেশাদারত্ব ও শিল্পমান বিবেচনায় না নিয়ে থিয়েটার চর্চা, ব্যক্তি ও সাংগঠনিক পর্যায়ে বিভেদ।

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনকেন্দ্রিক বেশ কিছু সমস্যাও তুলে ধরেছেন নাট্যকর্মীরা। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ভূমিকা ও কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তা, জবাবদিহিতা না থাকার বিষয়গুলো উঠে এসেছে নাট্যকর্মীদের বক্তব্যবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও ফেডারেশনের চেয়ারম্যান একই ব্যক্তি হওয়ায় সামাজিক ও জাতীয় সংকটগুলোতে প্রতিবাদী কর্মসূচী দেওয়া হয় না বলে মত দিয়েছেন তাঁরা।

মফিদুল হক বলেন, ‘যাত্রা শুরুর পর গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। আজ এটি একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।’

নাসিরউদ্দিন ইউসুফ মনে করেন, এটি সৃষ্টিশীলতা বনাম কাঠামোর দ্বন্দ্ব। ফেডারেশানে যারা নেতৃত্ব দেন, তাদের সঙ্গে অন্যদেরও একই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।

মামুনুর রশিদ বলেন, ‘আমি ফেডারেশানকে অভিন্ন এবং শক্তিশালী দেখতে চাই। সংকট সব সময় আলোচনার মধ্যে দিয়ে সমাধান করতে হবে।’

রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘ফেডারেশন না থাকলে কী হবে? আমরা ফেডারেশনের মুখাপেক্ষী হয় নাট্যচর্চা করি না। সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্থ করে। তবে দুটোর মেলবন্ধন করা গেলে ভালো হয়।’

মুক্ত আলোচনায় আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এক সময় সক্রিয় ছিল এবং তাদের একটি রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। সেই পরিচয় আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে থাকে, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিবাদ না হলে সম্মিলিত হওয়া যায় না। আমাদের কোনো প্রতিবাদ আছে? আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন কারও বাবার সম্পত্তি নয়। স্টাবলিস্টমেন্ট দরকার হয়, আবার একপর্যায়ে এটি মানুষকে ভোঁতা করে দেয়, শত বছর ক্ষমতা ধরে রাখার প্রেরণা জোগায়, এটি অনেকটা নেশার মতো। চলুন নেশাটা ভেঙে দিই।’

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে কামাল বায়েজিদ বলেন, ‘লিয়াকত আলী ১৯৯৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ফেডারেশনের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত আছেন। গত ১৩ বছর ধরে তিনি এর চেয়ারম্যান, ১২ বছর ধরে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। কোনো সামাজিক আন্দোলনে তাঁকে নেওয়া যায়নি। শিল্প সংস্কৃতিকে একটি দুর্বোদ্ধ জায়গায় নিয়ে গেছেন তিনি।’

মোফিজুর রহমান বলেন, ‘এক সময়ের প্রয়োজনীয় সংগঠন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এখন নাট্য আন্দোলনের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ফেডারেশন। এখন কতগুলো আইন হয়েছে, লেখা যায় না, কথা বলা যায়, এখন কোথায় ফেডারেশন। চরম অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফেডারেশন দাঁড়াচ্ছে না। আমাদের নাটকে সমাজের চিত্র ফুটে উঠছে না তাই আমাদের দর্শক নেই। দর্শক আমাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে। সমাজ ও মানুষের প্রতি থিয়েটারের দায়বদ্ধকতা আছে। নাটক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে, আমরা এখন সেটা বলতে পারছি না।’

এ ছাড়া নাটকের হল বরাদ্দে অব্যবস্থাপনা, মহড়াকক্ষের অভাব এবং সার্বিক নাট্যচর্চার নানা ত্রুটির কথা উঠে আসে সামগ্রিক আলোচনায়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন