গত ১৪ জুন তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা জানায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। এক মাসের মাথায় আজ ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধার মাধ্যমে সেই প্রাঙ্গণ থেকেই তাঁকে জানানো হলো শেষবিদায়। আগামীকাল শুক্রবার বগুড়ার এনামুল হক ডিগ্রি কলেজ মাঠে বাদ জুমা সর্বশেষ জানাজার পর সোনাতলা থানার ভেলুরপাড়া গ্রামে স্ত্রী জুলেখা হকের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে। এনামুল হকের স্ত্রী ভাষাসৈনিক জুলেখা হক ২০১৮ সালে গবেষণার জন্য মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।

এনামুল হকের শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নক্ষত্র বিদায় নিলেন। বাংলাদেশকে যাঁরা আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন, এনামুল হক তাঁদের একজন। দেশকে না জানলে দেশপ্রেম আসে না। দেশকে ভালোবাসতে হবে, কেবল জয় বাংলা বললেই দেশকে ভালোবাসা হবে না। অন্তরে দেশকে ধারণ করতে হবে। সে কাজেই অবদান রেখেছিলেন এনামুল হক। তিনি আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরে সেটা গেঁথে দিয়েছিলেন।’

এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণের দিনে আক্ষেপ করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরও বলেন, ‘সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য বাজেটে বরাদ্দ এত কম, মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। আর ৪২ শতাংশ খেয়েছে রাঘববোয়াল আর আমলারা। আজ এই দুঃখের দিনে এসব বলছি, এখনো সময় আছে, সংস্কৃতির বিকাশ না হলে, অন্তরে দেশপ্রেম না থাকলে যেকোনো মুহূর্তে দেশে একটা অন্য পরিবর্তন হবে, সেটা আমরা চাই না। আমরা এই দেশটাকে ভালোবাসি।’

এনামুল হকের শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘তিনি শুধু দেশে অনেক অবদান রেখেছেন তা নয়, তিনি বিদেশেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এমন একজন বরেণ্য মানুষকে আমরা হারালাম, সেটা জাতির জন্য সত্যিই কষ্টের।’

শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতির সবকিছু নিয়ে তাঁর যে বিপুল উৎসাহ ছিল আর তাতে বয়স যে কোনো বাধা নয়, সেটা তিনি দেখিয়েছেন। আমি নিশ্চিত, মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এসব নিয়েই ভেবেছেন, এসব নিয়েই ক্রমাগত কাজ করেছেন।’

এনামুল হকের মেয়ে তৃণা হক বলেন, ‘আব্বা নিজ ও পরিবারের সদস্যদের সুশিক্ষিত করেই থেমে থাকেননি। এলাকাবাসীর মধ্যেও শিক্ষার প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করেছেন সারা জীবন। তারই ফলে ১৯৬৭ সালে বগুড়ায় নিজের সব জমি দান করে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছেন বহুমুখী হাইস্কুল, ডিগ্রি কলেজ ও গ্রন্থাগার। ৩১ বছর জাদুঘরে দায়িত্ব পালনের পর নতুন করে দেশের প্রত্নতত্ত্ব ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগের রাতেও সংস্কৃতিবিষয়ক জার্নালের প্রুফ দেখছিলেন তিনি।’

শেষ শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মো. কামরুজ্জামান; জাতীয় জাদুঘর পর্ষদের সভাপতি, বাসস সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক; নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি মিনু হক, বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের পরিচালক মাহবুব আলম প্রমুখ।

এনামুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর যুক্ত হন প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার কাজে। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা জাদুঘরে যোগ দেন, ১৯৮৩-৯১ মেয়াদে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক ছিলেন।

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গবেষণায় অবদানের জন্য এনামুল হক ২০১৪ সালে একুশে পদক, ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৮ সালে তিনি ভারতের মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতে ভূষিত হন। এ ছাড়া ২০১২ সালে ভারতের চেন্নাইয়ের রিচ ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ-বিদেশে অনেক সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন