বজ্রপাতের শব্দ শুনলেই কী করতে হবে, জানালেন বিশেষজ্ঞরা
বজ্রপাতের শব্দ শোনা মানেই আপনি বিপৎসীমার মধ্যে আছেন। তাই বজ্রধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে হেঁটে নয়, দৌড়ে ঘরে যেতে হবে। বাইরে থাকলে খোলা আকাশের নিচে না থেকে ছাউনি আছে এমন কোনো কিছুর নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
আজ সোমবার রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ বজ্রপাত প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাস’ শীর্ষক এক জাতীয় কর্মশালায় এমন পরামর্শ উঠে আসে। যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক।
‘বজ্রঝড়, বজ্রপাত ও বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক প্রবন্ধে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, দেশে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুর্যোগের অতি ঝুঁকিপূর্ণ সময়। হিমালয়ের পাদদেশ ও বঙ্গোপসাগরের বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে তৈরি হওয়া আর্দ্রতা বজ্রমেঘ তৈরির মূল উৎস। আর ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বজ্রপাত ও আকস্মিক বন্যার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বক্তা সতর্ক করে বলেন, ‘বিশেষ করে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে আমাদের অতি সাবধান থাকতে হবে।’ তিনি জানান, মানুষকে সচেতন করতে আবহাওয়া অধিদপ্তর একটি স্লোগান নির্ধারণ করেছে। এটি হলো, ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’। তাঁর মতে, প্রকৃতপক্ষে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
আবহাওয়া বার্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উদাসীনতাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘চলতি মৌসুমে বজ্রপাতে ইতিমধ্যে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা জানি। বজ্রপাত মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সম্মিলিত সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে এ ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হবে।’
বজ্রপাতকে একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে কর্মশালায় ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক মো. লিয়াকত আলী বলেন, ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে অনুযায়ী গুরুত্ব দিয়েই এর মোকাবিলা করতে হবে। তিনি জানান, চার ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব, তবে এ বার্তা প্রান্তিক মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সাইক্লোনের মতো বজ্রপাতেও মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, কুসংস্কার দূর করে সঠিক সময়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সম্ভব হলে সাইক্লোনের মতো বজ্রপাতেও মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি জানান, বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশই কৃষক। কাজেই প্রাণহানি কমাতে দ্রুত আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানো জরুরি।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আবহাওয়াসংক্রান্ত ৯৫ শতাংশ নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। তিনি মনে করেন, শুধু পূর্বাভাস দিলেই হবে না, জীবন বাঁচাতে মাঠপর্যায়ের কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষকে বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে জানাতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
কর্মশালায় বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওর ও বজ্রপাতপ্রবণ বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন ব্র্যাক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টিহ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (আরআইএমইএস) প্রতিনিধিরা।
কর্মশালায় একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পৌঁছাতে করণীয় সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক এস এম কামরুল হাসান।
ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌক্তিক কর্মপন্থা নির্ধারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, এ সম্পর্কে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ফাতেমা আক্তার।
আলোচনায় অংশ নেন বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও বুয়েট-জিআইডিপাসের পরিচালক তানভীর মনজুর। তিনি বলেন, মাঠের কৃষকের কাছে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট না থাকায় তথ্য পৌঁছাতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তাঁর মতে, কৃষক ও শ্রমিকেরা যখন তাঁদের পরিচিত কারও কাছ থেকে তথ্য পান, তখন তাঁরা সেটাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এ কৌশলে মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা জানান, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরগুলো বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। আর ভুক্তভোগী হলেন কৃষক, জেলে ও শিক্ষার্থীরা। তিনি মনে করেন, কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি হতাহতের শিকার হন। কারণ, ফসল বাঁচাতে তাঁদের মাঠে যেতে হয়। ফসল বাঁচাতে না পারলে বছরজুড়ে তাঁদের অভাব–অনটনে ভুগতে হয়। এমন বাস্তবতায় সরকারকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির ডেপুটি ম্যানেজার সানজিদা আফরিন এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন কর্মশালার সঞ্চালনা করেন। প্যানেল আলোচনার সঞ্চালনা করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএম) নিতাই চন্দ্র দে সরকার।