অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের জন্য কী করে গেল, জানতে চান গুমের ভুক্তভোগীরা
এক সপ্তাহ পর (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া এই সরকার আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য কী করে গেল, তা সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে জানতে চাইলেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা। জবাবে সরকারের এক উপদেষ্টা তাঁদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচার শুরু করেছে। গুমসংক্রান্ত শক্ত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন বিধান প্রণয়নের মাধ্যমে গুমের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ ভিত্তিভূমি স্থাপন করেছে। সেই বিধানে বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং গুম হয়ে ফেরত আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টার একটি ‘লবি মিটিং’ হয়। তাঁদের মধ্যে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মুঠোফোনে যুক্ত হন। আর সশরীর উপস্থিত ছিলেন শিল্প এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিলিয়া (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত এ বৈঠকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বা পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চায়।
মুঠোফোনে যুক্ত হয়ে দেওয়া বক্তব্যে আইন উপদেষ্টা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে কথা বলেন বাগেরহাটে ২০১১ সালে গুমের শিকার হাবিবের মেয়ে জেসমিন। একপর্যায়ে উপদেষ্টা তাঁকে বলেন, ‘আপনাকে কথা দিলাম, আদিল ভাই, আমি, এলান, রিজওয়ানা—আমাদের আপনারা সরকার থেকে চলে যাওয়ার পর আরও ১০ গুণ বেশি পাবেন এবং আমরা সব সময় আপনাদের সঙ্গে থাকব।’
জেসমিনের পর আসিফ নজরুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ২০১৯ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি। তিনি আইন উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করেন, ভিসা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অপরাধীরা কীভাবে দেশের বাইরে চলে গেলেন, গুমে জড়িত কর্মকর্তারা এখনো কীভাবে পদোন্নতিসহ চাকরিতে বহাল আছেন? জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘অন্য মন্ত্রণালয়ের জবাব আমি দিতে পারব না। গুমের বিচারের জন্য আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছি। আপনার অভিযোগ অনেক বেশি সত্য। কিন্তু এটার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম যখন হবে, আমরা সিভিলিয়ান হিসেবে আপনাদের পাশে থাকব। তখন আমরা আরও অনেক কথা বলতে পারব।’
বিগত শাসনামলের অপরাধীরা এখনো কীভাবে কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন পান, সেই প্রশ্নও করেন নাসরীন জাহান। জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন পেয়েছে কি না, জানি না। তবে এই অভিযোগ পরশু দিনও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে করা হয়েছে যে আমরা জামিন দিই না, আমাদের সরকার জামিন দেওয়ার ব্যাপারে খুব কঠোর। এখন অনেক ক্ষেত্রে হাইকোর্টে জামিন হয়। হাইকোর্টের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ নেই, হাইকোর্ট প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে। সেখানকার কোনো কিছুর জবাব আমরা আমি দিতে পারব না।’
পরিবারগুলোর আক্ষেপ–দাবি, সরকারের ভাষ্য
আওয়ামী লীগের আমলে ২০১২ সালে গুমের শিকার হয়েছিলেন বরিশালে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ফিরোজ খান ও তাঁর ভাই। স্বামীকে হারিয়ে বিপর্যস্ত ফিরোজের স্ত্রী আমেনা আক্তার (বৃষ্টি)। বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, গুমের ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কেমন আছে, সে খবর নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের গুম পরিবারগুলোর জন্য কী করে গেল? যদি কিছু না করে যেতে পারে, তাহলে আগামী সরকার যেন এই পরিবারগুলোর পাশে থাকে, সে রকম কিছু করে যান।’
বৈঠকে অংশ নিয়ে নিজেদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা এম মারুফ জামান (রাষ্ট্রদূত ও বিলিয়ার পরিচালক), শিক্ষক ইকবাল চৌধুরী ও রহমত উল্লাহ। বক্তব্য দেন গুম থেকে ফিরে আসা কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান। তাঁদের বক্তব্যে গুমের কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ার বিষয়টিও উঠে আসে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।
পরে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের স্টেট পার্টি হয়েছি। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটা কমিশন করা হয়েছিল। ওই কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচার শুরু হয়েছে।’
সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ প্রণয়নের পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছে। এর আলোকে মানবাধিকার অধ্যাদেশে একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে।
এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা আইন করেছি, প্রতিষ্ঠান গড়ার কার্যক্রম করেছি। আমি আশা করি, আগামী তিন–চার দিনের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন গঠিত হবে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন হবে। আমরা যেসব বিধান ও ব্যবস্থা করেছি, সেগুলো কাজে লাগবে। গুম একটি জঘন্যতম অপরাধ। গুমের ক্ষেত্রে আমাদের জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণুতা) ছিল। আমরা জিরো টলারেন্সের যে ভিত্তিভূমি স্থাপন করেছি, আগামী সরকারগুলো সেগুলো অবশ্যই অব্যাহত রাখবে। বাংলাদেশ থেকে গুম নামক অপরাধকে আমরা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ব। আমরা সিভিল সোসাইটিতে ফিরে গিয়ে গুমের বিরুদ্ধে আমাদের ভূমিকা শক্তিশালীভাবে অব্যাহত রাখব।’
‘সংগ্রাম চলবে’
বৈঠকে সমাপনী বক্তব্য দেন উপদেষ্টা ও অধিকারের প্রতিষ্ঠাতা আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা আমার আপনজন। তাঁরা একটা ট্রাস্ট ফান্ডের কথা বলেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যাঁরা গঠন করবেন, নিশ্চয়ই তাঁরা এই দিকটা দেখবেন।’
আদিলুর রহমান বলেন, ‘গুমের বিচারের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল, অনেক বাধা ছিল, অনেক প্রতিকূলতা ছিল। তার মধ্যেও আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) এ কাজ এগিয়ে নিয়েছে এবং অবশ্যই গুম কমিশন তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সে ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে। আমি বিশ্বাস করি, এই সংগ্রাম আজকে শেষ হওয়ার নয়, এই সংগ্রাম চলমান থাকবে।’
আইসিটির প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গুমবিষয়ক তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিটিতে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের পর্যায়ে এসেছে।
অধিকারের পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন। সংগঠনের পরিচালক তাসলিম ফাহমিনা গুম নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়ে শোনান। আরও বক্তব্য দেন গুম কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন।