প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষের কমপক্ষে এক ধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ২ দশমিক শূন্য ৩ এবং নারীর ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৫২। সর্বনিম্ন প্রতিবন্ধিতার হার ঢাকা বিভাগে, এই হার ১ দশমিক শূন্য ৮। পুরুষের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ১৯ এবং নারীর ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৯৫।

শুমারিতে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আছে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক ও অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বাক্‌প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ ভাগ শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। এরপরই আছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা।

খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে আছে মাগুরা, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও নড়াইল। জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৪ লাখের বেশি। আর প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৮ হাজার ১৮৫।

দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা কত

দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা কত এ নিয়ে তথ্যগত বিভ্রান্তি আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেভাবে প্রতিবন্ধিতার মানদণ্ড ঠিক করে, বাংলাদেশে তা করা হয় না। আবার প্রতিবন্ধিতার পরিসংখ্যান নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়াশিংটন গ্রুপের হিসাব, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ মানুষের অন্তত একধরনের প্রতিবন্ধিতা আছে, যাদের সহায়তা প্রয়োজন হয়।

এত গেল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবের কথা। সরকারের নিজস্ব তথ্যের মধ্যেও ফারাক রয়েছে বিস্তর। যেমন ন্যাশনাল সার্ভে অন পারসনস উইদ ডিজঅ্যাবিলিটিস ২০২১ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষের অন্তত একধরনের প্রতিবন্ধিতা আছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। আর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২–এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ মানুষের কমপক্ষে একধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। তাদের সংখ্যা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪।

খুলনায় প্রতিবন্ধিতা বেশি কেন

খুলনায় প্রতিবন্ধিতার হার কেন বেশি, তা নিয়ে গবেষক ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার কারণে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মা ও শিশুর পুষ্টি বা খাদ্য গ্রহণের কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। কিন্তু অন্য প্রতিবন্ধিতাগুলো সৃষ্টির ক্ষেত্রে মা ও শিশুর পুষ্টি, বেড়ে ওঠা, সুষম খাদ্য গ্রহণের অপ্রতুলতা ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে জনমিতি স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, পুষ্টি ও খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে খুলনা অন্য বিভাগগুলো থেকে এগিয়ে।

২০১৭ সালের সেই জরিপ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ চিকিৎসক এস কে রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘খাদ্য ও পুষ্টির নানা ক্ষেত্রে খুলনা দেশের অন্য অঞ্চলগুলো থেকে এগিয়ে। তারপরও এ অঞ্চলে প্রতিবন্ধিতার হার এত বেশি কেন, এ বিষয়ে আমার প্রশ্ন আছে।’

জনমিতি স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৭) অনুযায়ী, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের অণুপুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রংপুর, প্রায় ৮৫ শতাংশ। আর এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খুলনা, প্রায় ৮১ শতাংশ। আবার শিশুদের খর্বাকৃতির হার দেশে সবচেয়ে বেশি সিলেটে, ৪৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম খুলনা ও ঢাকায়, ২৬ শতাংশ।

তাই দুর্ঘটনাজনিত প্রতিবন্ধিতা বাদ দিয়ে অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার হার খুলনায় বেশি হওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

জানতে চাইলে জনশুমারি ২০২২–এর টেকনিক্যাল সাপোর্ট টিমের সদস্য এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপসচিব দীপংকর রায় বলেন, প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। এর মূল কারণ দুর্ঘটনাজনিত। প্রতিবন্ধিতার হার খুলনায় বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে এর একটি কারণ থাকতে পারে। তবে উপাত্তগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ করার পর এ বিষয়ে বলা যাবে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের কেউ কেউ বলছেন, লবণাক্ততার কারণে সৃষ্ট সমস্যা পরবর্তী সময় শিশুর প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এর জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা দরকার।

খুলনা দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। সামাজিক নানা সূচকে এ অঞ্চল নানাভাবে পিছিয়ে আছে। এ অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ অনেক বেশি। লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। সুপেয় পানির বড্ড অভাব। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বাস্থ্যে। আবার ঘন ঘন দুর্যোগের শিকার হচ্ছে এ অঞ্চল। প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনে। দুর্যোগ, পানিতে লবণাক্ততা, স্বল্প খাদ্য উৎপাদন—এসবের কি কোনো প্রভাব আছে এ অঞ্চলে প্রতিবন্ধিতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে?

দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্তস্বল্পতা ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ খাবার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি। এতে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বাড়ছে। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় এটা দেখা গেছে।

দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা ২০২ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর করা গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক হেলথের সহকারী গবেষক আনিরে এহমার খান।

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের রক্তস্বল্পতা এবং গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ শিশুর ওপর কী প্রভাব ফেলে? জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রসূতি মায়ের রক্তস্বল্পতা শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এর ফলে পর্যাপ্ত রক্ত শিশু-শরীরে যায় না, অক্সিজেনও কম পায় শিশু। শিশুর প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে এটা প্রভাব ফেলতে পারে। আর গর্ভকালে উচ্চ রক্তচাপের ফলে দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। গর্ভবতী মা অ্যাকলেমশিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। অথবা শিশুর ওজন কম হতে পারে। ওজন কম শিশু প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকে।

আবু জামিল ফয়সাল বলেন, খুলনায় প্রতিবন্ধিতার হার বৃদ্ধির সঙ্গে রক্তস্বল্পতা ও উচ্চ রক্তচাপের কারণ আছে কি না, তার কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। তবে এই শুমারির তথ্য আমাদের আরও বিশদে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উৎসাহিত করছে।

প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিহাবিলিটেশন ফর দ্য ফিজিক্যালি ভালনারেবল (এসএআরপিভি) দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় আরেক জেলা কক্সবাজারের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদুল হক বলেন, ‘১৯৯৮ সালে কক্সবাজারের ৯ শতাংশ শিশুর মধ্যে রিকেটসের সন্ধান পাই আমরা। ক্যালসিয়ামের অভাবে ভিটামিন ডি কাজ করে না, তাই রিকেটস দেখা দেয়। এখন এ হার ৪–এ নেমে এসেছে।’

শহিদুল হক আরও বলেন, খুলনাসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানির উপস্থিতি বেড়ে যাওয়াসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাব দেখা যাচ্ছে। খুলনায় প্রতিবন্ধিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব কারণ আছে কি না, তা নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করা উচিত।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন