ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতি তিন হাজার মানুষের বিপরীতে একটি এবং কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার মতো এলাকায় প্রতি এক হাজার জনের বিপরীতে একটি এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোর মতো এলাকাগুলোয় প্রতি দুই হাজার মানুষের জন্য একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আয়তন হতে হবে দেড় একর। বিদ্যালয়ে আবশ্যিকভাবে মাঠও রাখতে হবে।

ড্যাপের জরিপে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় (ঢাকা মহানগর এলাকা) এখন ৮৬২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। ২০২৫ সাল নাগাদ মোট স্কুলের চাহিদা গিয়ে ঠেকবে ১ হাজার ৩৮৯টিতে। এতে ২০২৫ সাল নাগাদ ৬২৭টি বাড়তি স্কুল প্রয়োজন হবে।

ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ আবু মুছা মো. আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকা মহানগর এলাকার প্রত্যাশিত জনসংখ্যা বিবেচনায় চাহিদা নির্ধারিত হয়েছে। সেই হিসেবে এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘাটতি ৪৫০টির মতো হবে।

বিদ্যালয়ের ঘাটতির প্রভাব

পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রে মৌলিক একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। কারণ, কোনো এলাকায় মানুষ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই (জাপানের মতো কিছু এলাকায় ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাহিদা তৈরি হবে। আর মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া শিশুদের মৌলিক অধিকার। প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম হলে শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশসহ পুরো শহরেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কোনো এলাকার পরিকল্পনা করলে আমরা সবার আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিন্তা করি। কারণ, এর সংখ্যায় ঘাটতি হলে বেসরকারি উদ্যোগে ছোট ছোট ঘরে অথবা শুধু একটি ভবনে প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে ওঠে যা কোনোভাবেই মানসম্মত নয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ, শিশুরা খেলাধুলা করার সুযোগ পায় না। আবার বাসস্থানের আশপাশে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকলে অভিভাবকেরা তাঁদের শিশুদের দূরের বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। এতে শিশুদের যাতায়াতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকতে হয়। শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

বর্তমান অবস্থা

ঢাকা মহানগর এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা গড়ে ওঠার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। কোনো কোনো এলাকার একটি সড়কে ৮-১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার কোনো এলাকায় এক কিলোমিটারের মধ্যে মানসম্মত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে বেশির ভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয় বিক্ষিপ্ত অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পিত নগরায়ণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, আসাদ অ্যাভিনিউতে (আসাদগেট থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড) অন্তত ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এক সড়কে এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে প্রতিনিয়ত ওই সড়কে যানজট হয়। আবার রায়েরবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো এলাকায় মাত্র ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরাকেন্দ্রিক। ফলে যারা মিরপুরে থাকেন তারাও সন্তানের পড়ালেখার জন্য ধানমন্ডি বা উত্তরায় যান, আবার যিনি জিঞ্জিরায় থাকেন তাঁকেও সন্তান নিয়ে ধানমন্ডিতে আসতে হয়। এমন অবস্থার কারণে রাস্তায় যানজট তৈরি হয়। এতে করে শহরের বাসযোগ্যতা কমে।  

ঘাটতি পূরণের সুফল

ঢাকা শহরের ৮০ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সবার পক্ষে বেসরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানের পড়ালেখার খরচ জোগানো সম্ভব নয়।

ফলে অনেকে শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা নিয়ে প্রতিযোগিতা কমার পাশাপাশি পড়ালেখার খরচও কমবে। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। এ ছাড়া প্রতিটি এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটা দূরত্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারলে শহরের বাসযোগ্যতাও বাড়বে। কারণ, এতে করে সড়কে যানজট কমবে, যানবাহনের সংখ্যা কমে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং ড্যাপের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বিদ্যালয়ের সঙ্গে মাঠ থাকলে শহরে উন্মুক্ত স্থানের আয়তন বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত শহরের বাসযোগ্যতা বাড়াবে।

ড্যাপের প্রস্তাব

২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকায় যত বিদ্যালয়ের চাহিদা তৈরি হবে, তার ৮০ শতাংশ সরকারি উদ্যোগে নির্মাণের জন্য ড্যাপে প্রস্তাব করা হয়েছে। এর লক্ষ্য শিক্ষা সর্বস্তরের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী করা। এ জন্য ড্যাপে বিদ্যালয়ভিত্তিক অঞ্চলের ধারণা যুক্ত করা হয়েছে।

এতে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটা দূরত্বে ৬২৭টি অতিরিক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুনভাবে নির্মিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় ‘মানসম্মত’ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্য এলাকায় শাখা খোলারও সুপারিশ করা হয়েছে ড্যাপের প্রস্তাবে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি সব স্কুল ধরা হয়েছে। স্কুলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই শুধু একটি ভবনকেন্দ্রিক। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন অবস্থায় মূলত সরকারি উদ্যোগে বাড়তি স্কুল (৬২৭) নির্মাণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। এটি হয়তো একবারে বিনিয়োগ করা কঠিন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ সব স্কুলের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। এতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শহরের বাসযোগ্যতা বাড়বে।