প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক
বিচ্ছেদের পর মা–বাবা সন্তানকে ফেলে গেলেন এতিমখানায়, এই ভিডিওটি সাজানো
‘ডিভোর্সের পর কেউ নিলেন না দায়িত্ব, ফুটফুটে সন্তানকে এতিমখানায় ফেলে গেলেন জন্মদাতা বাবা–মা’—সম্প্রতি ফেসবুকে এমন ক্যাপশনে একটি শিশুর ভিডিও ছড়িয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বুম হাতে একজন ব্যক্তি শুয়ে থাকা একটি শিশুকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘আইচ্ছা বাবু, তোমার আব্বু–আম্মু কি তোমাকে রাইখা গেছে নাকি তুমি থেকে গেছ?’
জবাবে শিশুটি বলছে, ‘আমার আব্বু–আম্মু রেখে গেছে।’
তখন ব্যক্তিটি বলছেন, ‘তুমি সাথে যাও নাই, যখন রাইখা যায়?’
শিশুটি বলছে, ‘না।’
ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন করুণ সুর বেজে ওঠে।
‘নয়া বাংলা-Naya Bangla’ নামে একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি পোস্ট করে ৭ জুন। পেজটির বিষয়ে লেখা রয়েছে, ‘সত্য প্রকাশে আমরাই সর্বদা একনিষ্ঠ’। পেজটির বায়োতে লেখা রয়েছে ‘নিউজ মিডিয়া ওয়েবসাইট’। এর অনুসারী ২৫ হাজার।
এই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে জাবেদ হোসেন রাজিব নামের একজন লিখেছেন, ‘মেয়েটাকে আমি নিতে চাই। দয়া করে যোগাযোগ করুন, তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। আমি তাকে সন্তানের মতো মানুষের মতো মানুষ করে বড় করতে চাই। আমি নিতে চাই সব ডকুমেন্ট দিয়া।’
মনোয়ার মুন্না নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘ডিভোর্স দেওয়ার আগে অথবা ডিভোর্স হওয়ার আগে সন্তানের কথা একবার ভাবুন যে পিতা-মাতা না থাকলে সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।’
লিংক: এখানে
ভিডিওটি ইতোমধ্যে ৪৪ লাখ বার দেখা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া পড়েছে এক লাখ ৪৩ হাজারের বেশি। মন্তব্য পড়েছে সাড়ে সাত হাজারের বেশি এবং এটি শেয়ার হয়েছে ১৩ হাজার বার।
এই ভিডিওর বিষয়ে কথা বলতে পেজটিতে দেওয়া যোগাযোগের নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও কেউ তা ধরেননি।
ভিডিওটি আরও কয়েকটি পেজেও পাওয়া যাচ্ছে।
আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘প্রবাসী মেয়ে রুনা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ১০ এপ্রিলে মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। ‘ডিভোর্সের কারণে ফুটফুটে অবুঝ সুন্দর মেয়েটাকে অনাথ আশ্রমে রেখে পালিয়ে গেলো পাষাণ বাবা–মা’ শিরোনামে। একই ভিডিও গত ৩১ মে ওই পেজে আবার পোস্ট করা হয়।
লিংক: এখানে
পেজটিতে একই শিশুকে নিয়ে একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিটি ভিডিওতে শিশুটিকে ঘিরে আলাদা আলাদা গল্প বলা হয়েছে। যেমন ‘শিশুর চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে না পেরে ফাঁস নিয়ে মরার চেষ্টা করতে গিয়ে রশি পায়ে আটকে গেল অভাগা বাবা! অতঃপর কী হলো সরাসরি দেখুন।’
একই শিশুকে নিয়ে আরেকটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘অভাবের তাড়নায় ফুটফুটে শিশুকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে চাওয়ায় এলাকাবাসীর উত্তম–মধ্যম।’
অর্থাৎ একই শিশু ও একই ধরনের চরিত্রকে ব্যবহার করে পেজটিতে ভিন্ন ভিন্ন গল্পের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
‘প্রবাসী মেয়ে রুনা’ পেজটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিশুকেন্দ্রিক ছাড়াও বিনোদনমূলক ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করা হয় সেখানে।
পেজটিকে দেখা যায়, ‘Live Stream – Bangla’ নামের ফেসবুক নামের একটি পেজকে ট্যাগ করা হয়েছে একাধিক পোস্টে। এই পেজটির বায়োতে লেখা রয়েছে, ‘আমাদের গল্পগুলো কাল্পনিক এবং শিক্ষামূলক। ঘটনা একজনের শিক্ষা সবার।’
লিংক: এখানে
এসব বিশ্লেষণ থেকে বলা যায়, সন্তানকে এতিমখানায় মা–বাবার ফেলে যাওয়ার ঘটনার ভিডিওটিও সাজানো। এটি বাস্তব কোনো ঘটনার নয়।