জনপ্রশাসন: কারও হাতে তিন দায়িত্ব, কারও কাজ নেই
পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি। যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে কর্মকর্তা প্রায় ১,৫০০ জন।
৬৫০ জনের মতো কর্মকর্তা ওএসডি, বসে বসে বেতন নেন।
যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি—ইশতেহারে বলেছে বিএনপি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবিরের হাতে তিনটি দায়িত্ব। প্রথমত, অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তাঁকে নিজ দপ্তরের কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের প্রধান। তৃতীয়ত, তিনি একই বিভাগের কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগেরও প্রধান।
সরকারের যেকোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে পাঠানো হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে। জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগও নিষ্পত্তি করে থাকে। কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগ নানা কাজ করে। যেমন ৫০ কোটি টাকার বেশি সরকারি কেনাকাটার নথিপত্র তৈরি।
তিনটি অনুবিভাগের কাজই গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ুন কবির নিজে চেয়ে তিনটি দায়িত্ব নিয়েছেন, তা নয়; বরং সরকার তাঁর ওপর এই তিন দায়িত্ব চাপিয়েছে।
জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি সরকার আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না। যাঁদের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে, তাঁদের একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাঁদের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে না, তাঁদের অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে অনেক কর্মকর্তা আছেন, যাঁদের কোনো কাজ নেই, বসে বসে বেতন নেন। অর্থাৎ তাঁরা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)। তাঁদের সংখ্যা সাড়ে ছয় শর মতো। আরও কিছু কর্মকর্তা আছেন, যাঁদের অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাঁরা মূলত বিভিন্ন কক্ষে ঘুরে, আড্ডা মেরে সময় কাটান।
জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি সরকার আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না। যাঁদের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে, তাঁদের একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাঁদের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে না, তাঁদের অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাঁরা সেই সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাঁদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে অথবা ওএসডি করা হয়েছে।
সরকার গত ২৮ জুলাই ৩২ যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে তাঁদের প্রায় সবাই জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনটি অনুবিভাগের কাজই গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ুন কবির নিজে চেয়ে তিনটি দায়িত্ব নিয়েছেন, তা নয়; বরং সরকার তাঁর ওপর এই তিন দায়িত্ব চাপিয়েছে।
একাধিক দায়িত্বে যাঁরা
মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিলেই একাধিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কথা জানা যাচ্ছে। যেমন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আরেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একসঙ্গে তিনটি অনুবিভাগ (ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার) দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাদের উন্নয়ন অনুবিভাগ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মান্নান অতিরিক্ত হিসেবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুন নাহার অতিরিক্ত হিসেবে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা এক ব্যক্তির হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকার ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যার কথা বলছেন। তাঁদের মতে, একাধিক দায়িত্ব থাকা মানে কোনো কাজই ঠিকভাবে না হওয়া।
১২ আগস্ট এক অফিস আদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (উন্নয়ন অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধানকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহানকে দুটি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম আহসানুল আজিজ ও নজরুল ইসলামকে দুটি করে অনুবিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তাহমিনা ইয়াসমিন একসঙ্গে তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আমিনুল ইসলাম ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ দুটি করে অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা এক ব্যক্তির হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকার ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যার কথা বলছেন। তাঁদের মতে, একাধিক দায়িত্ব থাকা মানে কোনো কাজই ঠিকভাবে না হওয়া।
কোনো সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে কাউকে দায়িত্ব দেয় না। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল
পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি
জনপ্রশাসনে এখন পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি। যেমন অতিরিক্ত সচিব পদে প্রেষণসহ পদসংখ্যা ৩৩৭। এখন এ পদে কর্মরত প্রায় ৩৫০ জন। যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে কর্মকর্তা আছেন প্রায় দেড় হাজার। আওয়ামী লীগ আমলে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এবং বর্তমান সরকারের আমলেও পদ ছাড়া পদোন্নতি হয়েছে।
এত জনবল থাকার পরও একজনকে একাধিক দায়িত্ব কেন দিতে হয়—এ প্রশ্নের জবাব জনপ্রশাসন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশাসনে মূল সমস্যা দলীয়করণ। বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের ব্যবহার করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময়ব্যাপী ঢালাওভাবে রাজনীতিকীকরণের কারণে দেশের জনপ্রশাসন তার গণমুখিতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে অদক্ষতা, অযোগ্যতা ও অকার্যকারিতা গোটা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণে এ প্রশাসনব্যবস্থা উপযুক্ত নয়।
এত জনবল থাকার পরও একজনকে একাধিক দায়িত্ব কেন দিতে হয়—এ প্রশ্নের জবাব জনপ্রশাসন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশাসনে মূল সমস্যা দলীয়করণ। বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের ব্যবহার করা হয়।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন নানা সুপারিশ করেছিল। তবে তা কাগজে রয়ে গেছে। বিএনপি নির্বাচনের আগে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে কাউকে দায়িত্ব দেয় না। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।
