গভীর রাতে ৫ পাম্পে ঘোরাঘুরি, ৭ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেলেন গাড়ির তেল

গাড়িচালক আকরামুল ইসলাম। সাত ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল নিয়েছেন বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্প থেকে। আজ সোমবার বেলা ১১টায় কথা হয় তাঁর সঙ্গেছবি: আহমেদ উল্যা ইউসুফ

রাত তিনটায় ঘুম থেকে উঠেছেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আকরামুল ইসলাম। রাজধানীর বনশ্রী থেকে তিনি আশপাশের পাঁচটি পাম্প ঘুরেছেন। কোথাও তেল পাননি। রাত চারটায় রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট বিএএফ শাহীন কলেজের সামনে লাইনে দাঁড়ান। রাতেই লাইনে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগকর্তার ছেলেকে যাতে সকালে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারেন।

কিন্তু বেলা ১১টায় তাঁর সঙ্গে কথা হয় বিজয় সরণি এলাকার ট্রাস্ট পাম্পের সামনে। ৭ ঘণ্টা পর তেল নিতে পেরেছেন তিনি।বললেন , ‘গতকালও গাড়ি চালাতে পারিনি। আজ মালিকের সন্তানকে স্কুলে দেওয়ার জন্য এত রাতে উঠেছি। কিন্তু এখনো তেল নিতে পারিনি।’

ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আকরামুল গাড়িতে নিয়োগকর্তার পরিবারকে নিয়ে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে যান। তবে সেখানেও গাড়ি বন্ধ ছিল। গত এক মাস তেল–সংকটে প্রায়ই এমন গাড়ি চালাতে পারেননি আকরামুল। তাঁর আয়েই নেত্রকোনায় থাকা পরিবার চলে। গ্রামে তাঁর দুই সন্তান, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মা আছেন।

আকরামুল চিন্তিত হয়ে বললেন, ‘এভাবে গাড়ি বন্ধ থাকলে কদিন পর মালিক আমাকে রাখে কি না সেই শঙ্কায় আছি। কারণ, শুধু শুধু বসিয়ে রেখে তো কেউ বেতন দেবে না।’

আকরামুল নোয়াখালী থেকে গাড়ি নিয়ে এসেছেন গত পরশু। পথেও বিভিন্ন পাম্পে তেলের খোঁজ করেছেন; কিন্তু কোথাও তিনি তেল নিতে পারেননি।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান মো. সাব্বির। তাঁর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। আগে একটি বেসরকারি কোম্পানির চাকুরে ছিলেন। সংসারের ভরণপোষণ মেটাতে বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্যে সেই চাকরি ছেড়ে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন।

গত তিন বছর মোটরসাইকেল চালিয়ে মাসে সাব্বিরের ২৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় ছিল। কিন্তু গত এক মাসে আয় হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। ঈদে পরিবারের জন্য সামান্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্য তেমন কিছু কিনতে পারেননি।

জ্বালানি তেল নিতে দীর্ঘ লাইন। পরীবাগ এলাকায় মেঘনা পেট্রলপাম্পের সামনে। আজ সোমবার দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

সাব্বির বললেন, এমন সংকটে পড়তে হয়নি কখনো। কোনো দিন তিন ঘণ্টা, কোনো দিন পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে। পাম্পের সিরিয়ালেই সময় চলে যায়। তার ওপর বেশির ভাগ পাম্পে ফুল ট্যাংক দিতে চায় না।

মো. সাব্বিরের সঙ্গে কথা হয় আসাদগেট সোনার বাংলা পাম্পের সামনে। এই পাম্পে একটি হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় মোটরসাইকেলে ৫০০, প্রাইভেট কারে দুই হাজার এবং মাইক্রোবাস এবং হাইয়েসে তিন হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।

সাব্বির তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সোনার বাংলা পাম্প থেকে ৫০০ টাকার তেল নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এতক্ষণ দাঁড়িয়ে পেলাম ৫০০ টাকার তেল। বিকেল নাগাদ আবার তেল লাগবে। সকাল থেকে এখনো ভাড়া পাইনি। এভাবে পরিবার চালানো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

জ্বালানি তেল সরবরাহে সোনার বাংলা পাম্পে রেশনিং করা হচ্ছে কেন জানতে চাইলে কর্মচারী মো. সুজন বলেন, ‘সিরিয়াল অনেক লম্বা। সবাইকে যাতে দেওয়া যায়। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় রাত থেকে প্রাইভেট কারে জ্বালানি সরবরাহ করা যায়নি।’

বন্ধ পাম্পের সামনে জ্বালানির জন্য যানবাহনের ভিড়। আজ সোমবার দুপুরে আসাদগেট তালুকদার ফিলিং স্টেশনে
ছবি: আহমেদ উল্যা ইউসুফ

রাজধানীর আসাদগেটে সকাল থেকে তালুকদার পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এর মধ্যে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পাম্প বন্ধ থাকলেও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন কেনার আশায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে কিছু মোটরসাইকেলকেও।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ফয়েজ উল্লাহ। তিনি সাভার থেকে এসেছেন। গন্তব্য কেরানীগঞ্জ। পথের অন্তত পাঁচটি পাম্প ঘুরে কোথাও জ্বালানি পাননি।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনে এলে তেল সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। পরে দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান।

বেলা ১টায় কথা হয় ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে। তখনো তিনি তেলের জন্য অপেক্ষায়। তিনি বলেন, ‘দেড় কিলোমিটার গাড়ি ঠেলে এসেছি। ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন পাম্প খোলে জানি না। তেল না পেলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’

তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় অ্যাপে পণ্য সরবরাহ করা রাজন শিকদারের সঙ্গে। তিনিও সকাল ৬টা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য আজ তিনি পণ্য সরবরাহের কোনো অর্ডার নিতে পারেননি। তাঁর আশা ট্যাংক ফুল নিতে পারলে কয়েক দিন অন্তত মোটরসাইকেল চালানো যাবে। বললেন, তেল নিতে না পারলে অর্ডার নেব কীভাবে? এই কাজে সংসার চলে।

জ্বালানি তেল নিতে দীর্ঘ লাইন। পরীবাগ এলাকায় মেঘনা পেট্রলপাম্পের সামনে। আজ সোমবার দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

জ্বালানির হিসাব রাখছেন ট্যাগ কর্মকর্তা

যমুনা অয়েল কোম্পানির ঢাকা জোনের অফিসার (সেলস) ইমরান হোসাইন ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করছিলেন সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে। তেল লোড–আনলোডের হিসাব রাখছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমাকে আরও আটটি পাম্প ঘুরতে হবে। সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনই প্রথম। কোনো অসংগতি চোখে পড়েনি।’

সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ইমরান হোসাইন বলেন, ‘সরকার রেশনিং উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সব গ্রাহক যেন তেল পায়, তাই পাম্প মালিক কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেশনিং করছেন।’