আদিবাসী দিবসের আলোচনায় ভূমি ও অধিকারের দাবি উঠল জোরেশোরে
সরকার বদলালেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির মালিকানা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। পাহাড়ে ও সমতলে বিচারহীনতা, অন্যায্য জমি দখল ও বৈষম্যের কারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আজও নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে রয়েছেন। এসব ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্যে।
আজ রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা।
ফি বছর এই দিবস পালনের অনুষ্ঠানে যেসব আয়োজন হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন। অনেকেই এসেছিলেন নিজস্ব রীতির পোশাক পরে। তাঁদের বর্ণিল সেসব পোশাকে চারপাশে ভিন্ন এক আবহ তৈরি হয়।
দেশে ৫০টির বেশি জাতিসত্তার বসবাস। ভিন্ন তাদের ভাষা, পোশাক ও সংস্কৃতি। এই জাতিগত বৈচিত্র্য, জ্ঞান ও সংস্কৃতির সম্ভার বাংলাদেশের বড় সম্পদ বলেই গণ্য হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল—‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’। কিন্তু সেই সুরক্ষা কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
‘পরিবর্তনের সুফল আদিবাসীরা পাচ্ছে না’
আলোচনা সভায় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী ও ‘নিজেরা করি’–এর সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, একের পর এক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলেও আদিবাসীদের অধিকারের চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যায়ভাবে আদিবাসীদের জায়গাজমি দখল হয়ে যাচ্ছে, অথচ কষ্ট করে জমি উদ্ধার করলেও সরকারি নথিতে তা নিবন্ধিত হচ্ছে না। এনআইডিতেও আদিবাসী পরিচয় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সব নাগরিকের সমতা, স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ছাড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সুফল কখনোই অর্জিত হবে না বলেও উল্লেখ করেন এই নারীনেত্রী।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রসঙ্গ আসে। সভায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মূল বিষয়গুলো এখনো অকার্যকর। বর্তমান সরকারের প্রতি নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট পথরেখা (রোডম্যাপ) নির্ধারণের জোর দাবি জানান তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পার্বত্য অঞ্চলেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় স্থায়ী শান্তি অর্জন ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীকে সরাসরি এই শান্তির প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি অকার্যকর ভূমি কমিশনকে দ্রুত সক্রিয় করে আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণসহ বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতনের একাধিক ঘটনার বিচার আজও ঝুলন্ত। সুপ্রিম কোর্ট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের কোনো পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নেই। পাশাপাশি কোটা কমিয়ে ১ শতাংশ করার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে আদিবাসী কোটা পুনর্বহালের দাবি জানান তিনি।
ঐতিহ্য অস্বীকারের রাজনীতি বন্ধের আহ্বান
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার বলেন, ঔপনিবেশিক আমল থেকে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বজায় রাখা জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অস্বীকার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। দিবসটি সরকারিভাবে পালনের আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণেই পাহাড় ও সমতলে আজ বঞ্চনা বাড়ছে।
আলোচনা সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের লড়াই কখনোই থেমে থাকে না। আজ না হলেও আগামী প্রজন্ম তাদের সঠিক পরিচয়, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়বে।
লেখক ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, যে রাষ্ট্র আদিবাসী শব্দটি বলতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, পানির অধিকার ও অন্যান্য অধিকার দেবে এটা বিশ্বাস করা যায় না। তবে আদিবাসীদের অধিকার দিতে না পারার বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার। আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, আদিবাসীদের জায়গাজমি দখল, ভাষা–সংস্কৃতি বিলীন ও মৌলিক উন্নয়নের অভাব সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপে ব্যর্থতা দুঃখজনক। বাংলাদেশকে প্রকৃত বৈচিত্র্যময় রাখতে নতুন সরকারকে আদিবাসীদের ভূমি, সুপেয় পানি ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় বক্তারা অবিলম্বে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির মালিকানা সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরির দাবি জানান।
সংহতি জানিয়ে সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকমল বড়ুয়া, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, লেখক ও গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন প্রমুখ।
শহীদ মিনারের সভাস্থলে ‘আমাদের ভূমি আমাদের অধিকার’, ‘আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে’, ‘আদিবাসী দিবস সফল হোক’, ‘অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন কার্যকর করতে হবে’ প্রভৃতি লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়।
আলোচনা সভা শেষে একটি র্যালি বের হয়। পরে শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কয়েক শ মানুষ।
আট দফা দাবি
আজ আলোচনা সভায় আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো:
১. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
৩. সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
৪. আদিবাসীদের সম্পর্কে বিকৃত, খণ্ডিত বা মিথ্যা তথ্য প্রচারকৃত সব গণমাধ্যম, মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে।
৫. আদিবাসীদের ওপর সব নিপীড়ন–নির্যাতন বন্ধ করাসহ সব মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহীত আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলও ১৬৯ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন ও আইএলও কনভেনশন ১০৭ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদ্যাপন করতে হবে।
৮. সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা (চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসংক্রান্ত) যথাযথভাবে চালু ও বাস্তবায়ন করতে হবে।