‘বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা ককশিট, ভাঙা পাত্র কিংবা জমে থাকা পানিতে লার্ভা জন্মাচ্ছে। হাসপাতাল ও বড় ভবনেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা যাচ্ছে। তাই মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। অন্যথায় মশক নিয়ন্ত্রণের সব উদ্যোগ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ওষুধের কোনো ঘাটতি নেই, ঘাটতি রয়েছে সচেতনতায়।’
বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো ডটকম আয়োজিত ‘মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও করণীয়’ শীর্ষক ফেসবুক লাইভে কথাগুলো বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম।
পার্থ শঙ্কর সাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ঢাকার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, কীটনাশকের ব্যবহার ও কার্যকারিতা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার সরাসরি সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম, প্রথম আলোর ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে।
মশা গত বছরের তুলনায় কম
শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে এবং মশার ঘনত্ব ও উপদ্রব কমাতে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
উত্তরে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে মশার যে উপদ্রব ছিল, এ বছর তা অনেকটা কম। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে নানারকম কার্যক্রম পরিচালনা করছি। ৭৫টি ওয়ার্ডে জরিপ চালিয়ে ২৭টি ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে “ক্র্যাশ প্রোগ্রাম” চালানোর পাশাপাশি মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।’
মশার ওষুধ ছিটানোর নির্দিষ্ট নিয়ম ও সময়সূচি আছে কি না—সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘একটি জায়গায় ওষুধ দেওয়ার পর নতুন করে লার্ভা জন্মালে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে তা মশায় রূপান্তরিত হতে পারে। তাই প্রতিদিন ওষুধ দিতে হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।’
যদি নির্ধারিত সময়ে ওষুধ প্রয়োগ না হয়, সেক্ষেত্রে নাগরিকেরা কীভাবে অভিযোগ জানাবেন? এ বিষয়ে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজে সিটি করপোরেশনের কন্ট্রোল রুমের নম্বর দেওয়া আছে। পাশাপাশি একটি অ্যাপও চালু করা হয়েছে। সেখানে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
কীটনাশক নির্বাচন ও কার্যকারিতা
কীটতত্ত্ববিদদের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের অবস্থান সম্পর্কে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘সরকার ও মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি দেখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদেরা এসে কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়টি ঠিক করেন। তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হয়।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। উত্তরে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘সকালে “টেমিফস” ব্যবহার করা হয় লার্ভা নষ্ট করার জন্য। বিকেলে কীটনাশকের ধোঁয়ার মাধ্যমে “মেলাথিয়ন” ব্যবহার করা হয় উড়ন্ত মশা নিধনের জন্য। এসব কীটনাশক সিটি করপোরেশন নিজে পরীক্ষা করে না। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বোর্ডে কীটতত্ত্ববিদসহ সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষা করে যে ওষুধ অনুমোদন করেন, সেটিই ব্যবহার করা হয়।’
কীটনাশকের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল। পরে মন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে ওষুধের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করান। পরীক্ষার পর সেটি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন করা হয়।’
ওষুধের নয়, সচেতনতার ঘাটতি
সঞ্চালক জানতে চান, মশা নিয়ন্ত্রণে তাঁর নতুন উদ্যোগগুলো কী এবং এর ফলে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না।
উত্তরে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ আর জনগণের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ। দুই পক্ষের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন হলে শতভাগ ফল পাওয়া সম্ভব। সেটা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নিয়মিত কর্মসূচি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে মশার উপদ্রব অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।’
নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা
এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নজরদারি কতটা জোরদার করা হয়েছে? সঞ্চালক জানতে চাইলে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি বিভাগকে সক্রিয় রাখা এবং কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া নজরদারি অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য ও পূর্ত বিভাগ এবং সাংবাদিকদের নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল, নির্মাণাধীন বহুতল ভবন এবং ধানমন্ডির মতো এলাকায় সরাসরি উপস্থিত হয়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। নিয়ম অমান্যকারী ভবনে জরিমানাও করা হচ্ছে। এর ফলে অনেকাংশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।’
জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘গণমাধ্যম জনগণকে সচেতন করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সিটি করপোরেশনের ভুলত্রুটি যেমন তুলে ধরা হবে, তেমনি জনগণের ভুলত্রুটিও তুলে ধরতে হবে।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য কেন দেখা যায়? এ প্রসঙ্গে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘কোনো রোগী অন্য জেলা থেকে এসে দক্ষিণ সিটির হাসপাতালে ভর্তি হলে, সেই ঠিকানার কারণে তাকে দক্ষিণের রোগী হিসেবে দেখানো হতে পারে। এখানে রোগীর প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করা জরুরি।’
রোগী, মশা ও কীটনাশকের কার্যকারিতা—এই তিন ধরনের তদারকি নিয়ে জানতে চাইলে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘রোগী কোথা থেকে আসছে, সেই তথ্য বের করা দরকার। সেটি প্রচার হলে ওই এলাকার মানুষ সচেতন হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগও কাজ করতে পারবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা সম্পর্কে জানান মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ আসার আগেই প্রধানমন্ত্রী আমাদের সতর্ক করেছেন এবং প্রায় ১৫ দিন পরপর সমন্বয় সভা করেন। সরকারপ্রধান যখন বিষয়টিতে জোর দেন, তখন সংশ্লিষ্টদেরও কাজের মধ্যে থাকতে হয়।’
সবশেষে নাগরিকদের উদ্দেশে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘নিজের ঘর, বাড়ি, আঙিনা ও রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব আছে এবং সেটি যতটুকু বাড়ানো দরকার, আমরা চেষ্টা করছি। তবে ১০০ শতাংশে যেতে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ এই নগর আপনার, এই নগর আমার—দায়িত্ব আমাদের সবার।’