বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ বিচারককে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য আইনজীবীদের

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম বদরুদ্দোজা বাদল ও মোহাম্মদ শিশির মনিরছবি: সংগৃহীত

বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ কর্মকর্তাকে (বিচারক) আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য এসেছে। এ-সংক্রান্ত রিট আবেদনকারীদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, এটি আদালত অবমাননা। অন্যদিকে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম বদরুদ্দোজা বাদল বলেছেন, ‘এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারণ, যেহেতু অধ্যাদেশটি (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ) আইনে রূপান্তরিত হয়নি।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে অবস্থিত নিজ চেম্বারে আজ বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম বদরুদ্দোজা বাদল এ কথা বলেন। এর আগে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে এক ব্রিফিংয়ে শিশির মনির ওই মন্তব্য করেন।

এর আগে ১৫ কর্মকর্তাকে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করার বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার অফিস আদেশ জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচার শাখা-৩-এর ১৯ মের স্মারকমূলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের (১৫ বিচারক) পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের জন্য আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের (১৫ বিচারক) যোগদানপত্র ভূতাপেক্ষভাবে গ্রহণ করার কথা উল্লেখ রয়েছে অফিস আদেশে। ভূতাপেক্ষভাবে যোগদানপত্র গ্রহণের তারিখ ১০ এপ্রিল উল্লেখ রয়েছে অফিস আদেশে।

এর আগে সাত আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রায় দেন। রায়ের উল্লেখযোগ্য নির্দেশনার মধ্যে ছিল সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ।

হাইকোর্টের রায়ের পর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। গত ৭ এপ্রিল হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। আর বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করে সরকারি দল।

এ দিকে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বৈধতা নিয়ে সাত আইনজীবী গত ১৯ এপ্রিল হাইকোর্টে একটি রিট করেন। পরদিন রিটটি আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন শুনানির পর আদালত আপাতত রিটের শুনানি মুলতবি রাখেন।

আদালত অবমাননা বললেন শিশির মনির

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার অফিস আদেশের পর আজ বিফ্রিং করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনের বৈধতা নিয়ে করা পৃথক রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী হলেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় থেকে ১৫ কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়ে ব্রিফিংয়ে শিশির মনির বলেন, ‘সরকার গতকাল রাতে যা করেছেন, এটি সিরিয়াস...আদালত অবমাননা। এই সচিবালয়ে যাঁকে সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি থেকে শুরু করে ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ন্যস্ত করেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার ইচ্ছে করে বিচার বিভাগের সঙ্গে একটা সংঘাত লাগাতে চায়।’

এখনো হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা (সচিবালয় প্রতিষ্ঠা) বহাল উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, যে রিটটি (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন নিয়ে) বিচারাধীন আছে, তা ৭ জুনের পর শুনানির জন্য আসবে। অ্যাটর্নি জেনারেল সেদিন (২০ এপ্রিল) আদালতে মৌখিকভাবে এশিওরেন্স দিয়েছিলেন (আশ্বস্ত করেছিলেন) আর আদালত বলেছিলেন, তাদের ডিজায়ার (চাওয়া) যেন এ সময়ের ভেতরে সচিবালয়কে ডেসট্রয় (বিলুপ্ত) করা না হয়।...এই উইশের (প্রত্যাশা) প্রতি বিন্দু পরিমাণ শ্রদ্ধা দেখান নাই (সরকার)।’ আগামীকাল বৃহস্পতিবার আদালত অবমাননার আবেদন দায়ের করবেন বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, বললেন বদরুদ্দোজা বাদল

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, গতকাল গেজেট দিয়ে যেসব জুডিশিয়াল অফিসার সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েটের জন্য নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যেহেতু অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরিত হয়নি, পার্লামেন্টে পাস হয়নি; সেহেতু উনারা এটা ফাংশন করেন কীভাবে? সুতরাং স্বাভাবিকভাবে তাঁরা মিনিস্ট্রিতে অ্যাটাচড (মন্ত্রণালয়ে যুক্ত) হবেন। অ্যাটাচড হলে পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হবে।

এর মানে এই নয় যে এই আলাদা সচিবালয় বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে—উল্লেখ করে বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘কারণ, পৃথক সচিবালয়ের বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বা বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য আছে, বিএনপি বড় স্টেকহোল্ডার। এর আগে যে কমিটি ছিল, সে কমিটিতে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি ছিল না। ফলে বিএনপির তরফে যে বক্তব্যগুলো, সেই বক্তব্যগুলো আসেনি। ফলে অধ্যাদেশটি (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ) কম্প্রিহেনসিভ (সামগ্রিক বা পূর্ণাঙ্গ) ছিল না বলে বিএনপি মনে করছে।

বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘কাজেই এখন পার্লামেন্টে পরবর্তী সময়ে বিএনপি এটাকে কম্প্রিহেনসিভ বিল আকারে আনবে এবং এটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকারিতা লাভ করবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এটা নিয়ে ভিন্ন রকম মন্তব্যেরও কারও কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করছি না।’

আদালত অবমাননার শামিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘আদালত অবমাননা হবে কেন? কারণ, সংসদে এটি (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ) পাস হয়নি।...বিএনপি তো বলেনি যে এটা করবে না। বিএনপি বলেছে এটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিল আকারে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি এমনভাবে আনবে, যেন এটা নিয়ে পরবর্তী সময়ে কোনো বিতর্ক না হয়। কাজেই এখানে আদালত অবমাননার কিছুই নেই।’

আরও পড়ুন