তাঁত মেলায় মণিপুরি কম্বো সেট, জামদানির ফিউশন-সবই পাওয়া যাচ্ছে

প্রদর্শনীতে এসে দর্শনার্থীরা দেখতে পাচ্ছেন কীভাবে তাঁতে কাপড় বুনন হয়।ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

পছন্দের মণিপুরি শাড়ি কেনার পর শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং কোটি, ব্যাগ, জুতা, গয়না—এসবের জন্য আর হন্যে হয়ে অন্য জায়গায় ঘুরতে হবে না। ম্যাচিং সব জিনিস বা কম্বো সেটটি পাওয়া যাচ্ছে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প মেলায়।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মেলায় প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এ প্রদর্শনী ও মেলায় মোট ১৫টি স্টল আছে।

আজ শনিবার দুপুরে রিংকিস অ্যাটায়ার নামক স্টলের স্বত্বাধিকারী রেহমুমা হোসেন। তিনি এই ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন। রেহনুমা বলেন, তিনি শ্রীমঙ্গলের মণিপুরি হ্যান্ডলুম নিয়ে কাজ করেন। কাপড়ের একটি টুকরাও তিনি ফেলেন না। হয় গয়না, না হয় ব্যাগ-কোনো না কোনো কিছু বানান। আর এখনকার ফ্যাশন সচেতন নারীরা কম্বো সেটসহ এসব পণ্য পছন্দও করেন।

১৬ মার্চ পর্যন্ত দুপুর ১২টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এটি চলবে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় তলার গ্যালারি ও চতুর্থ তলার উন্মুক্ত স্থানে।
ছবি; মানসুরা হোসাইন

৮ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী ও মেলা চলবে ১৬ মার্চ পর্যন্ত। দুপুর ১২টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এটি চলবে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় তলার গ্যালারি ও চতুর্থ তলার উন্মুক্ত স্থানে। এ আয়োজনের সহযোগী পার্টনার হিসেবে আছে প্রথম আলো।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চতুর্থ তলার উন্মুক্ত স্থানটির তুলনায় মেলায় স্টলের সংখ্যা কম। তাই ক্রেতারা নিরিবিলি পরিবেশে ঘুরে ঘুরে পণ্য পছন্দ করার সুযোগ পাচ্ছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা দেশীয় পণ্য কিনতে পছন্দ করেন বলেই শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এ মেলায় এসেছেন। পছন্দসই দেশীয় পণ্য কিনতে হলে বাজেটের পরিমাণ বাড়াতে হয়, এটাও মেনে নিয়েছেন। তাই দাম নিয়ে তেমন আপত্তি নেই। বিক্রেতারাও ক্রেতাভেদে ‘শুধু আপনার জন্য ৫০০ টাকা কম’ এমন অফারও দিচ্ছেন।

টাঙ্গাইলের মেসার্স করটিয়া তাঁত শাড়ি ঘরে বেসরকারি চাকরিজীবী মাহজুবা তাজরীন জানালেন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সামনে দিয়েই যাতায়াত করেন। মেলা ও প্রদর্শনীর সঙ্গে তাঁতশিল্প লেখাটি দেখেই মূলত তিনি এসেছেন। তিনি সব সময় দেশীয় শাড়ি পরার চেষ্টা করেন। মেলায় কিছু পণ্যের দাম একটু বেশি বলে তাঁর মনে হচ্ছে বলে জানালেন।

ফেস্টডিলস স্টলের স্বত্বাধিকারী রুমানা নাসরীন নারায়ণগঞ্জের জামদানি পণ্য নিয়ে কাজ করেন। তিনি জামদানি ফিউশন অর্থাৎ জামদানি কাপড়ে কোটি, ব্লেজার, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্য বানান। রাঙামাটির ঊর্মিলা ফ্যাশনে ক্রেতাদের বেশ ভিড় দেখা গেল।

মেলায় বিক্রি কেমন জানতে চাইলে রূপগঞ্জের সবুজ সাজের স্বত্বাধিকারী মো. মমিনুর রহমান জানালেন, বিক্রি একেবারে খারাপ হচ্ছে না। তবে ঢাকায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মতো জায়গায় দেশীয় পণ্যের ক্রেতার উপস্থিতি আর একটু বেশি হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন।

স্টলে শাড়ি দেখছেন কয়েকজন।
ছবি:শুভ্র কান্তি দাশ

মমিনুর রহমান জানালেন, তিনি মূলত জামদানি শাড়ি থেকে যে মোটিফগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো নতুন করে বুনছেন। ১৮৮০ শতকের নকশার একটি জামদানি শাড়ি সংরক্ষিত আছে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে। সেই নকশার অনুকরণে ২৫০ কাউন্ট সুতায় শাড়িটি তৈরি করেছেন মমিনুর রহমান এবং মো. জহিরুল নামের বয়নশিল্পী। সাদা জমিনে লাল হলুদে ঘোড়ার নকশা করা শাড়িটি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এটি বানাতে ৩ মাসের বেশি সময় লেগেছে।

স্টলে বসে মমিনুর রহমান কালো জমিনে সাদা সূক্ষ্ম সুতায় কাজ করা আরেকটি শাড়ি বের করে দেখিয়ে বললেন, ডালিম বা বেদানার ফুলের নকশা একসময় জামাদানিতে ব্যবহৃত হতো। এখন আর তেমন দেখা যায় না। যে পরিমাণ সময় লাগে সে পরিমাণ দাম পাওয়া যায় না বলে এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ডালিম ফুলের নকশার শাড়িটির দাম রাখা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

মেলায় মিরপুরের কাতান নিয়ে হাজির হয়েছেন সিদ্দিক সিল্ক হাউস। এ স্টলের স্বত্বাধিকারী শামীম আখতার জানালেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরা ভারতের বেনারস থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। জানালেন, মেলায় মূলত ইফতারের পর ক্রেতার সমাগম বেশি হয়। বিক্রি মোটামুটি ভালোই হচ্ছে। তবে তাঁর স্টলে একটি শাড়ি পছন্দ করেও দামের জন্য কিনতে পারছিলেন না মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষক মুক্তি সরকার। তিনি বলেন, শাড়ি পছন্দ হচ্ছে, তবে বাজেটে কুলাচ্ছে না।

হ্যান্ডটাচের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী খান জানালেন, তাঁর কারখানা পঞ্চগড়ে। তিনি খাদির টেবিল ক্লথ, ন্যাচারাল ডাইংয়ের শাড়ি, থ্রি–পিস, ওড়না, গামছা, শাড়িসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। সিরাজগঞ্জের তৌহিদ টেক্সটাইলে একটি হাতে বোনা তন্তুজ শাড়ির দাম রাখা হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। এখানে সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি পাওয়া যাচ্ছে।

মেলার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে তাঁতশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ, প্রযুক্তি ও কৌশল হাজির করা হয়েছে। তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ফুটি কার্পাস তুলা থেকে সুতা তৈরি, মসলিন কাপড় বুনন সবই প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব তাঁতবস্ত্র উৎপন্ন হয় তার নির্বাচিত অংশও এ প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছে।

চরকায় কাটা হচ্ছে সুতা। ১৪ মার্চ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় তলার গ্যালারিতে এই প্রদর্শনীতে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ি আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য, রেশমের জীবনচক্র, তাঁতশিল্পের ঐতিহাসিক নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের সুতা ও তাঁতযন্ত্রও প্রদর্শন করা হচ্ছে।

মেলা ও প্রদর্শনীর সার্বিক অবস্থা দেখভাল করছিলেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের প্রধান এবং মসলিন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আইয়ুব আলী, বোর্ডের ব্যবস্থাপক (বিপণন) মো. এবাদত আলী। তাঁরা জানালেন, মেলা ও প্রদর্শনী ভালো চলছে। এখানে টাঙ্গাইল, রাজশাহী, রাজধানীর মিরপুর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ঐতিহ্যবাহী পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীও সবার নজর কাড়ছে।