প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে, পদার্থ বিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর: শিক্ষামন্ত্রী
এইচএসসির পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পাবেন পূর্ণ নম্বর, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে– এমন আশ্বাস দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলার মধ্যে আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে আলাদা দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এই আশ্বাস দেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও গতকাল পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টরা বলেছিলেন আবহাওয়া ভালো থাকবে। তাই পরীক্ষা বহাল রাখা হয়েছিল।
পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ মন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করে বলব। শিক্ষার্থীরা যার যার পড়ার টেবিলে ফিরে যাক। আমরাই উদ্বিগ্ন তাদের চেয়ে বেশি, কীভাবে পরীক্ষা সঠিকভাবে নেব। কীভাবে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করব। আমরা আশ্বাস দিচ্ছি, যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুলত্রুটি হয়েছে, সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিধান আমাদের রয়েছে।’
বর্ষার মধ্যে সারাদেশে এখন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য সব বোর্ডের পরীক্ষা ঘোষিত সময়সূচি ধরে চলছে।
এরমধ্যে গতকাল সোমবার প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সেদিন বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থ বিজ্ঞান (প্রথম পত্র), মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা (প্রথম পত্র) এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাব বিজ্ঞান (প্রথম পত্র) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তারমধ্যে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে দুটি ভুল ছিল বলে শিক্ষার্থীরা জানান।
দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় গতকালই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। আজ সকালে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা সড়কে বিক্ষোভে নামে। সেই বিক্ষোভ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়।
এই পরিস্থিতিতে বিকালে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের একটি সম্পূরক প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। কোনো কেন্দ্রে পানি উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লায় গতকাল প্রবল বৃষ্টির কারণে শহরের একটি কেন্দ্রে নৌকায় করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
কুমিল্লার সেই কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এটি ছাড়া অন্যান্য জায়গায় পানি উঠেছে, তা তেমন বেশি ছিল না, গুটিকয়েক কেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে পাল্টানো হয়েছে। পরীক্ষাদের যে সুবিধা দেওয়ার, তা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে জানান তিনি।
এরপরও যেখানে পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য কী করার আছে, তা তুলে ধরে এহছানুল হক বলেন, ‘যেসব ক্ষেত্রে এখনো মনে করি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের শুধরিয়ে দেওয়া আমাদের জন্য বিরাট কাজ নয়। কারণ আমরা অনেক জায়গায় পরীক্ষা বন্ধ করেছি। আমাদের প্রশ্ন সেট রয়েছে। আমরা আবারও পরীক্ষা নেব। আবারও পর্যালোচনা করছি, যদি কোথাও প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠার পরে পরীক্ষা দিতে না পারে, সে জরিপ আমাদের কাছে আসার পরে প্রয়োজনে আমরা পুনরায় পরীক্ষা নিতে পারি। আমরা চট্টগ্রাম বোর্ডে এ ব্যবস্থা করেছি। সে অবস্থান আমাদের রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাদের জাতির ভবিষ্যত। তাদের আমরা বঞ্চিত করতে পারি না, বঞ্চিত করব না।’
পরীক্ষা নেওয়ার যে কারণ দেখালেন মন্ত্রী
সম্পূরক প্রশ্নে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ উপেক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, গত তিন-চারদিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরগুলো পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। শিক্ষার্থীরা অনুরোধ করেছিল পরীক্ষা পেছানোর জন্য। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যে কারণে আজ ঢাকায় আন্দোলন হচ্ছে।
এইচএসসির মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এক–দুদিন পিছিয়ে দিতে কী সমস্যা ছিল, তা তিনি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চান।
জবাবে এহছানুল হক মিলন বলেন, সারা দেশে একযোগে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্র রয়েছে এবং ৬৪টি জেলায় একই সময়ে পরীক্ষা শুরু হয়। চট্টগ্রামে বন্যার পর পর্যায়ক্রমে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং এরপর পুরো চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৬৪ জেলার এসপি, আটটি বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং প্রত্যেকটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তারা জানিয়েছিল যে আর বৃষ্টি হবে না। বিকেল ৫টা পর্যন্ত আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবাই বলেছেন যে আবহাওয়া ভালো থাকবে, সে কারণেই আমরা পরীক্ষা বহাল রেখেছি।’
কিন্তু সকালে বৃষ্টি দেখে নিজেই তৎপর হয়েছিলেন বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মাঠ পানিতে ভরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা মেয়র, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিই পরীক্ষাকেন্দ্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে। পরে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে ওই স্কুলের পাঁচতলা ভবনে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।’
সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলে আর কোথাও কোনো দুর্যোগজনিত সমস্যার খবর পাননি বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, শুধু কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে এ ঘটনা ঘটেছে। যে মেয়েটির কাপড় ভিজে গিয়েছিল, তার বাড়ি থেকে কাপড় এনে দেওয়া হয়েছে। তাকে এক ঘণ্টা পরও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার সময়ও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসন—জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশ প্রশাসন—তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব কি না। প্রয়োজনে তারা পরীক্ষা স্থগিতও করতে পারেন।
তাদের সঙ্গে কথা বলেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান তিনি।
এই পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র চার মাস আগে। প্রশ্ন মডারেশন আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। আপনারা জানেন, প্রশ্ন মডারেশনের প্রক্রিয়া দুই বছর আগে থেকে শুরু করতে হয়। আমরা এসে নতুন করে কোনো প্রশ্ন প্রস্তুত করতে পারিনি।
বিগত সরকারের সময় যাঁরা মডারেটর ছিলেন, তাঁরাই এই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করেছেন। তবুও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা দিয়েছি যে ফিজিক্সের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল হয়েছে এবং ওই দুটি প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।’
এদিকে যশোর-৪ আসনের গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশে কওমি মাদ্রাসা রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। এসব মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।
মন্ত্রী আরো জানান, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি, এতে শিক্ষার্থী ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ২৪৬ জন; কিন্ডারগার্টেন ৩২ হাজার ৬৬৩টি, এতে শিক্ষার্থী ৬০ লাখ ৮৯ হাজার ৩১৩ জন; সংযুক্ত এবতেদায়ি মাদ্রাসা নয় হাজার ২৯৫টি, সেখানে শিক্ষার্থী প্রায় ১৫ লাখ; স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসা সাত হাজার ৫২৮টি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।