স্বাস্থ্য খাতে ৫টি বড় অসংগতি ও স্ববিরোধ আছে: হোসেন জিল্লুর রহমান

পিপিআরসি ও ইউএসসি ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভার বক্তারাছবি: প্রথম আলো

গবেষক বলছেন, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে, কিন্তু মানসম্পন্ন সেবা দিতে অক্ষম। এ রকম অসংগতি আর স্ববিরোধিতার মধ্যে পড়ে আছে স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলছেন, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের জন্য স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার ঠিক করে তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। ই–হেলথ কার্ড অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে।

আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় তাঁরা এসব কথা বলেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসেপিশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএসসি ফোরাম যৌথভাবে এই সভা আয়োজন করে। সভায় স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষক, জনস্বাস্থ্যবিদ, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেপের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অধিকাংশ আলোচক নতুন সরকারের করণীয় বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন। প্রতিমন্ত্রী সরকার কী করছে ও করবে, তার বর্ণনা দেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বড় ধরনের পাঁচটি অসংগতি আর স্ববিরোধ আছে। এগুলো হচ্ছে—দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে, তবে তার উৎপাদনশীলতা কম; স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কম পাশাপাশি অর্থ ব্যয় করার দক্ষতাও নিম্ন পর্যায়ের; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে অস্পষ্টতা আছে; সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া মারাত্মভাবে কেন্দ্রীভূত এবং জনবলের নিশ্চয়তা ছাড়াই অবকাঠামো তৈরি হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বা প্রথম ছয় মাসে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু কাজ চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে আছে ই–হেলথ কার্ড প্রবর্তন করা, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয় চূড়ান্ত করা, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব করার ক্ষেত্রে আইন–নীতি ঠিক করা; দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা জোরদার করা; স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন করা; হাসপাতাল দালালমুক্ত করা; স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; অ্যাম্বুলেন্স পুল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া; চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।

এসব কাজ কীভাবে হবে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে অনেক উদ্যোগ, পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছিল তারও উত্তর থাকা বা কারণ জানা দরকার। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন যে স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে বা বিশেষজ্ঞরা যে হেলথ অথরিটি তৈরির কথা বলছেন, সেই কমিশন বা অথরিটির বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোর অনেক মিল আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গত অর্থবছরে স্বাস্থ্যের বাজেট ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর এক–তৃতীয়াংশ টাকা কেটে নেওয়া হয়। অন্যদিকে এক–তৃতীয়াংশ টাকা মন্ত্রণালয় খরচই করতে পারেনি। বাকি এক–তৃতীয়াংশের অনেক টাকাই অপচয় হয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের কাজের দ্বৈততা আছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনা সভার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ইউএসসি ফোরামের সদস্য আমিনুল হাসান। মুক্ত আলোচনা পর্বে একাধিক অংশগ্রহণকারী বলেন, দেশের মানুষের পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ অথচ আলোচনা ও সরকারি কর্মকাণ্ডে পুষ্টি গুরুত্ব পায় না। কেউ বলেন, নতুন সরকারের উচিত জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি, জাতীয় পুষ্টি নীতি ও জাতীয় জনসংখ্যা নীতি পর্যালোচনা করে দেখা। কেউ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল ঠিক করা দরকার।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এ ফয়েজ ও অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান আকরাম হোসেন, আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান, আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন।