বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১ লাখ কর্মী নেবে জাপান সরকার, দাবিটি সত্য নয়

জাপান সরকার প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ কর্মী নেবে এমন কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্তের সত্যতা পাওয়া যায়নিছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে

হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি করমর্দন করছেন। পেছনে দেখা যাচ্ছে দুই দেশের জাতীয় পতাকা। এমন একটি ছবি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, ‘জাপান সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ১ লাখ বাংলাদেশি জাপানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।’

সম্প্রতি চার দিনের সফরে জাপানে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও এক্সে প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশির জাপানে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার দাবিটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এক্সে দাবিসংবলিত একটি পোস্ট ১৮ লাখ বার দেখা হয়েছে। কিছু সংবাদমাধ্যমেও জাপান সরকার বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী নিতে রাজি হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

লিংক: এখানে

তবে যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো চুক্তি হয়নি। দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি হয়নি।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি এবং প্রেস ও জনকূটনীতি–বিষয়ক মহাপরিচালক কিতামুরা তোশিহিরো ২৯ অক্টোবর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে জাপান সরকার বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নিতে সম্মত হয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে। এ ধরনের দাবির কোনো সত্যতা নেই। ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাপান-বাংলাদেশ শীর্ষ সম্মেলনেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি হয়নি।

লিংক: এখানে

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের বিবরণ দেখার পরামর্শ দেন তিনি।

লিংক: এখানে

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। বরং বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লিংক: এখানে

এখানে জাপানি বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়ে জাপানে পাঠানোর কথা নয়।

কর্মসংস্থান চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তি

এর আগে ১৯ অক্টোবর ‘জাপানের সঙ্গে কর্মসংস্থান চুক্তি, কর্মী নিয়োগ শুরু ১ এপ্রিল থেকে’ শিরোনামে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের সঙ্গে কর্মসংস্থান–সংক্রান্ত ‘ইএসডিপি-এমওসি’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু করবে জাপান। ১৭ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে ‘মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন অন এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট’ (ইএসডিপি-এমওসি) চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

লিংক: এখানে

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়বে। ফলে চুক্তিটির সামগ্রিক মেয়াদ হবে ১০ বছর। এর আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মী পাঠানো ও গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানো ও গ্রহণের বিষয়ে চুক্তি হয়েছে ঠিকই, তবে সেই চুক্তিতে প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কোনো লক্ষ্যমাত্রা বা নিশ্চয়তা নেই। কর্মসংস্থান–সংক্রান্ত চুক্তি এবং প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী নেওয়ার চুক্তি এক বিষয় নয়। তবে এই চুক্তিতেও প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখ নেই।

পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী নিয়োগের পুরোনো তথ্য

অধিকতর যাচাইয়ে ‘বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ শ্রমিক নেবে জাপান’ শিরোনামে গত বছরের ২৯ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ শ্রমিক নিয়োগের কথা জানিয়েছিলেন জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

অর্থাৎ ওই সময়ের এক লাখ কর্মী নিয়োগের বিষয়টি ছিল পাঁচ বছরের একটি লক্ষ্যমাত্রা। প্রতিবছর এক লাখ করে পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা ছিল না। তা ছাড়া এটি জাপান সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী নেওয়ার নিশ্চয়তাও ছিল না।

উল্লিখিত তথ্যে জাপান সরকার প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেবে—এমন কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই দেশের সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকে বরং জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছে। তাই প্রতিবছর এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী জাপানে নেওয়ার দাবিটি সত্য নয়।