ভাষার লড়াই

শিক্ষার্থীদের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন জনতার স্রোতোধারায় মিশে সফল হয়েছিল বায়ান্নর একুশে। সেই প্রতিবাদী দিনের অমলিন স্মৃতিকথা।

হাসান হাফিজুর রহমান

একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (মধুর দোকানের সামনে) সভা হয়। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। সেখানে ছাত্রদের চাপে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভাইস চ্যান্সেলরও ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। ১০ জন করে একেক গ্রুপে কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বেলা একটা-সোয়া একটার দিকে অলি আহাদ আমাকে বললেন, ‘মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে যে গেট, সেখানে ছাত্ররা পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়ছে। সেখানে গিয়ে ছাত্রদের ঢিল ছোড়া বন্ধ করুন।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আছে, পুলিশ হয়তো আজকে গুলিও করতে পারে।’ আমি দেড়টার দিকে সেখানে যাই।

কলেজের গেটে আমি দেড়টার দিকে পৌঁছে দেখি, ছেলেরা ঢিল ছুড়ছে এবং আমার যতদূর মনে হয়, সেখানে আমার পৌঁছার মিনিট পনেরো পরেই গুলিটা হয়। প্রথম ব্যারাকে বরকত ছিল বোধহয় ঘরের ভেতরে, বাঁশের বেড়া ভেদ করে গুলি তাকে আঘাত করে। এ ছাড়া বাইরের লোকও আঘাত পায়। গুলি হলে ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

আমি, আমীর আলী আর একজন আমার সঙ্গে ছিল। আমরা তিনজন মধুর ক্যানটিনে ফিরে আসি এবং জেলখানার উল্টো দিকে ক্যাপিটাল প্রেসে চলে যাই। সেখানে বসে একটা লিফলেট লিখি। এ সময় আমি স্বেচ্ছায় ও লিফলেট লেখার কথা চিন্তা করে প্রেসে যাই। সেখানে ঘণ্টা দু-তিনেকের মধ্যে প্রুফ দেখে লিফলেটটি ছাপিয়ে আনি। এর হেডলাইন ছিল—‘মন্ত্রী মফিজউদ্দিন-এর আদেশে গুলি’। লিফলেট ১১৬ সাইজ ছিল। প্রেসটি সেদিন আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেছিল।

চারটা-সাড়ে চারটার দিকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি। লিফলেট প্রায় দুই-তিন হাজার ছিল। চকবাজার, নাজিরাবাজার ও বিভিন্ন দিকে লিফলেটগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। উৎসাহী ছাত্ররাই এ লিফলেটগুলো চারদিকে ছড়িয়ে আসে। আমাদের এ আন্দোলন পরিচালনার প্রধান ঘাঁটি ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। তখন এর ক্যাশিয়ার ছিলেন ব্যারিস্টার আক্তার উদ্দিন।

আসাদ-আমিনেরও এ বিষয়ে যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। সলিমুল্লাহ্‌ মুসলিম হলে দিন-রাত ধরে মাইকে বক্তৃতা হতো। এ মাইকে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় কী কী কর্মব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে জনগণকে জানিয়ে দেওয়া হতো।

২২-২৩ ফেব্রুয়ারি আমার হাতে পার্টির একটি লিফলেট আসে ছাপিয়ে দেওয়ার জন্য। এ লিফলেট ছাপি সাতরওজার কাছে একটি প্রেস থেকে। আমার ছোট ভাই চাদরে ঢেকে সে লিফলেটগুলো পৌঁছে দেয় এসএম হলের সামনে। এ লিফলেট নিয়ে আমি হলে যাই।

২২ ফেব্রুয়ারি বিরাট মিছিল বের হয়, তাতে আমরা অংশ নিই। মিছিল আবদুল গনি রোড ধরে গুলিস্তানের দিকে এগোতে থাকলে মিছিলের মাঝামাঝি অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। আমরাও তখন ঠিক সেখানেই ছিলাম। এরপর আমরা কিছু লোক কার্জন হলের বড় গেট টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

সেখানে দেখি, কার্জন হলের গেটের চারপাশে পুলিশ বা আর্মি আজ আর আমার ঠিক মনে নেই, পজিশন নিয়ে ছিল। আমি এবং আমার সঙ্গে তোফাজ্জল হোসেন; আমরা দুজন কার্জন হল ঘুরে ঘুরে নাজিমউদ্দীন রোডের দিকে চলে যাই। আমরা দেখলাম, ফজলুল হক হল, এসএম হল ও সেক্রেটারিয়েটের দিকে অসংখ্য পুলিশ বা আর্মি বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ দেখে আমরা হকচকিয়ে গিয়েছিলাম।

ঢালওয়ালা পুলিশ এসে মিছিল দুই ভাগে ভেঙে দেয়। মিছিলের একটি অংশ নাজিরাবাজারের দিকে, আরেকটি হাইকোর্টের দিকে চলে যায়। পরে মিছিলটি একত্র হয়েছিল। কিন্তু আমি এরপর মিছিলের সঙ্গে আর যেতে পারিনি। ২২ ফেব্রুয়ারিতেও কয়েকবার গুলি চলেছিল।

২১ তারিখে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমি শুধু বরকতকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তখন আমরা একুশের পুরো খবর পাইনি। কিছু লাশ গুম হয়েছিল বলে শোনা গেছে। কিছু লোককে শনাক্ত করা হয়েছিল, কিছু লোককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সালাম, বরকত, রফিক—তাঁদের নাম পাওয়া গেছে। কিন্তু বাজারে জোরগুজব ছিল—৫০–৬০ জন মারা গেছে। সে সময় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন থাকলেও বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো সংগঠনই দ্বিমত পোষণ করেনি।

সূত্র: একুশের পটভূমি একুশের স্মৃতি, সম্পাদক: মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন

  • হাসান হাফিজুর রহমান: প্রয়াত কবি ও সম্পাদক, ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী ’ সংকলনের সম্পাদক