default-image

দুই বছর আগে কেবল ‘অনুমানের’ ওপর ভিত্তি করে ৮৮০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। খেলার মাঠ, পার্ক, পদচারী–সেতুসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, আসলে পরিকল্পনাই ঠিকমতো হয়নি। অথচ এরই মধ্যে প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বেতন–ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিতেই খরচ হয়ে গেছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ নামের এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, খিলগাঁও, লালবাগ ও সূত্রাপুর এলাকার জন্য। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় ঢাকার পিছিয়ে থাকা ওই চার এলাকায় তিনটি খেলার মাঠ, আটটি শৌচাগার, নয়টি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র এবং পথচারী ও যান চলাচলের জন্য দুটি করে সেতু নির্মাণের কথা। এ ছাড়া ২০টি পার্কের উন্নয়ন, বুড়িগঙ্গা নদীর প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার তীর উন্নয়ন, চার কিলোমিটার সরু রাস্তা, ৩৯ কিলোমিটার নর্দমার উন্নয়নসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।

বিজ্ঞাপন

সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সময়ে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের মে মাসে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। নতুন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওই প্রকল্পের আওতায় উন্নয়নকাজ কোথায় হবে, ব্যয় কত হবে, এসব নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা (সমীক্ষা) হয়নি। এর ফলে মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যেমন তিনটি মাঠ তৈরির কথা বলা হলেও কোথায় হবে, জমি অধিগ্রহণ করা লাগবে কি না, তাতে কত ব্যয় হবে, এসব ছিল অনেকটা অনুমাননির্ভর। এমন পরিস্থিতিতে পুরো পরিকল্পনা বড় ধরনের পরিবর্তন করা ছাড়া উপায় নেই।

২০১৯ সালের ১ মার্চ এ প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের মোট ৮৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের ৮৩৪ কোটি টাকাই ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুনে।

এ প্রকল্পের পরিচালক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলামের কার্যালয়ে গিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, কোন এলাকায় কী ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে, এর বাস্তব একটা ধারণা আরও দুই মাস পর তিনি দিতে পারবেন। প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এখন চূড়ান্ত নকশা তৈরির কাজ করছেন।

বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতিকে ‘মডারেটলি আনস্যাটিসফ্যাক্টরি’ (মাঝারি মাত্রায় অসন্তোষজনক) উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেরিন আহমেদ মাহবুবের কাছে এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল প্রথম আলো। ই-মেইলে পাঠানো প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সব প্রকল্প বিস্তারিত কারিগরি, অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিশ্লেষণের পরে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পে চারটি এলাকা ঠিক করা হয়েছিল ব্যাপক আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে। দুঃখজনকভাবে করোনার কারণে পরিকল্পিত কার্যক্রম পিছিয়ে গেছে। দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে উদ্যোগ নিয়েছেন, প্রতি সপ্তাহে তদারক করা হচ্ছে। আশা করা যায়, প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ হবে।

অনেকটা এ প্রকল্পের মতোই প্রায় চার বছর আগে কোনো ধরনের সমীক্ষা যাচাই ছাড়াই ৯৪টি সেতু নির্মাণের কাজ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। সে সময়ে একটি সেতুর দৈর্ঘ্য ঠিক করা হয়েছিল অনুমানের ওপর ভর করে। আর খরচ ধরা হয়েছিল ধারণার ওপর ভিত্তি করে। পরে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এর কিছুই মিলছিল না। জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকার ওপর ভিত্তি করে ২০১৭ সালে দেশের ৪০টি জেলার ৯৪টি উপজেলায় মোট ১৩০টি সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ৩ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ নামের প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সময় সমীক্ষা করা হয়েছিল মাত্র ৩৬টি সেতুর। বাকি ৯৪টি সেতুর কোনো ধরনের সমীক্ষা করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ সিটির নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় মাঠপর্যায়ে গত দুই বছরে শুধু লালবাগ এলাকায় একটি সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, লালবাগের কিল্লার মোড় বাজারসংলগ্ন সড়কের একাংশের ওপর বালুর স্তূপ, পাশেই ইট সাজিয়ে রাখা। রাস্তার এক পাশ কেটে নালার জায়গা করা হলেও ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়নি। সড়কের এক পাশ কেটে রাখায় গাড়ি চলাচল করতে পারছে না।

সড়কটির পাশের দোকানি হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, করোনা মহামারির আগে সড়ক কেটে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা ছিল। কাজ এখনো শেষ হয়নি। মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছে।

দক্ষিণ সিটির তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বেতন-ভাতাসহ সব মিলিয়ে অর্থ খরচ হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

এ প্রকল্পের বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো প্রকল্প শুরুর আগে বিস্তারিত সমীক্ষা করতে হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও সমীক্ষা না করে প্রকল্প নিলে কাঙ্ক্ষিত সময়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আর অনুমানের ওপর পরিকল্পনা করা অদক্ষতা। এর ফলে পরে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুটোই বেড়ে যায়।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন