বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সোনার গোলাপ বালা আর সাগরিকা দুলের প্রচলন

সোনার দোকানে যে ভিড় কম, তা বোঝা গেল রাজধানীর কয়েকটি জুয়েলারির দোকান ঘুরে। তবুও যাঁদের শখটা এখনো ঈদ উৎসব মানে মূল্যবান কিছু কেনা, তাঁরা ঠিকই যাচ্ছেন সোনার দোকানে। বসুন্ধরা সিটির পঞ্চম তলায় এলিভেটরে উঠলেই আগে চোখে পড়ে অভিনন্দন জুয়েলার্স। এই দোকানের বিক্রয়কর্মী আলমগীর খান প্রথম আলোকে জানালেন, সুইসুতা, বাউটি বা কলেজ রিংয়ের মতো ট্র্যাডিশনাল কানের দুলগুলো তাঁরা আবার তুলে এনেছেন। এ দোকানে পাওয়া গেল সোনার গোলাপ বালার এক জোড়া। দুই ভরি দিয়ে বানিয়ে রাখা হয়েছে। এখনকার ক্রেতারা ২২ ক্যারেটের সোনার গড়ানো গয়না কেনেন। ১৮ ক্যারেটের গিনি সোনার গয়না এখন জাদুঘরে রাখার অবস্থা বলে জানালেন বিক্রয়কর্মীরা।

default-image

এই দোকান থেকে একই সঙ্গে দুই জোড়া কানের দুল কিনলেন কলাবাগান থেকে আসা দুই বোন সায়মা আক্তার আর জায়মা আক্তার। মায়ের সঙ্গে ঈদ উপলক্ষে মূল্যবান কিছু কিনতেই তাঁদের আসা। ইস্টার্ন প্লাজার চতুর্থ তলার শ্রীজা সোনার দোকানে ঈদের এই সময়েও ক্রেতাবিহীন একা বসে ছিলেন বিক্রয়কর্মী অনুপ সেন। প্রথম আলোকে বললেন, আগে ঈদের পরপর কিছু বিয়ের অনুষ্ঠান হতো। সে জন্যও বিক্রি বাড়ত। করোনার পর থেকে সব এলোমেলো হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ঝুঁকি নিয়ে নতুন গয়না আনা হয়নি। তবে যা বিক্রি হচ্ছে, এর অধিকাংশই পুরোনো নকশায় নতুন করে আনা গয়না। ধানছড়ি চেন, পাথর বসানো রিংয়ের আংটি বা সুইসুতা কানের দুলের মতো ছোট গয়নার বিক্রি বেশি।

default-image

এর বাইরে আছে বারবার সোনার দাম পরিবর্তনের ফলে ক্রেতার বাজেট বদলে যাওয়ার ঝামেলা। ভাকুর্তা গ্রামের গয়নার কারিগর দুলাল রাজবংশী বললেন, পুরোনো নকশা এখন ব্রোঞ্জের কাজেও উঠে আসছে। একই গয়না যখন ক্রেতা কম দামে পাচ্ছেন, তখন অনেকেই ঝুঁকছেন সেদিকে। আবার সোনার কারিগরেরাও নিজেদের পেশায় সংকট তৈরি হওয়ায় অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন ব্রোঞ্জ বা তামার গয়না নিয়ে। ঢাকার আশপাশের এলাকায় আছে বেশ কিছু গয়না–গ্রাম। সেখানকার তৈরি গয়না চলে আসে চকবাজারে। সেখান থেকে চলে যায় রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানে। তবে এর পাশাপাশি রুপার গয়নার প্রতিও ঝোঁক আছে নারীদের।

রুপার গয়নায় কল্কি আর সনাতনী ছাপ

মানুষের গয়নার রুচিতে যে অনেক পরিবর্তন এসেছে, বোঝা গেল বসুন্ধরা সিটি আর সায়েন্স ল্যাবের আড়ংয়ের আউটলেটে প্রবেশ করে। ‘ফ্যাশন জুয়েলারি সেকশন’ নামের পৃথক একটি জায়গাই করা হয়েছে এবার। সেখানে শিশুদের জন্যও রাখা হয়েছে ব্রাস ক্রিস্টালের তাগা। রুপার গয়না নিয়ে ক্রেতার আগ্রহ বেশি বলে আড়ং রুপার ওপরে কুন্দন, পুঁতি, মিনা করা কাজের গয়না এনেছে অনেক। বিক্রিও ভালো। রুপার সেটের দাম শুরু হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা থেকে। কল্কি আঁকা নকশার ভেতর লাল মিনার কাজের একটা রুপার সেট ২৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে গেল।

default-image

জামদানি শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে এখান থেকে গয়না কিনছিলেন এক নারী। শাড়ির চেয়ে গয়নার দাম বেশি হয়ে গেল বলে একটু আফসোস করলেন। তবে মুখে লেপটে আছে পছন্দের গয়না কেনার খুশি। বসুন্ধরার দেশিদশের কয়েকটি দোকানে বিক্রি হচ্ছে রুপার লম্বা গলার হার। শাড়ির ডিজাইনের সঙ্গে মিল রেখে নিজস্ব কারিগরদের দিয়ে রুপার গয়না বানিয়ে এনেছে এই দেশি বিপণিবিতানগুলো।

এবারের ঈদে গাঢ় লাল রঙের ওপরে রুপার কাজ করা পলা বিক্রি হচ্ছে অনেক। তবে এর অধিকাংশই বিক্রি হচ্ছে অনলাইনের পেইজ থেকে। কোনোটার শুধু মুখ জোড়া দেওয়া রুপা দিয়ে। কোনোটার গায়ে পদ্ম ফুলের বাহার বা কল্কির ছাপ। তবে দেশি রুপা দ্রুত কালো হয়ে যায় বলে অভিযোগ আছে ক্রেতাদের। তাই রুপাও পরাজিত হচ্ছে অন্য মেটালের কাছে।

ব্রোঞ্জ, ইমিটেশনে পুরোনো নকশার ছাপ চান ক্রেতা

সোনার দোকানগুলো যখন বলছে ক্রেতা নেই, তখন হাতে তৈরি বিভিন্ন মেটালের গয়না বিক্রি বাড়ছে। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটিতে ইমিটেশনের একটি গয়নার দোকানে নাতনির সঙ্গে বসে ছিলেন শাহেদা বেগম। নাতনি ঘুরেফিরে নানা ডিজাইনের চুড়ি দেখছিল। কিন্তু সত্তরোর্ধ্ব শাহেদা বেগমের কোনোটাই তেমন পছন্দ হয়নি। প্রথম আলোকে জানালেন, একসময় তিনি সূর্য বালা কানের দুল পরতেন। যেহেতু তিনি সোনার কিছু কিনতে পারছেন না, তাই ইমিটেশনের মধ্যে তেমন কোনো নকশার দুল পেলে কিনবেন। শাহেদা বেগম তেমন গয়না পেয়েছিলেন কি না, তা আর আমাদের জানা হয়নি।

default-image

বসুন্ধরার এক্সটিক নামের গয়নার দোকানের বিক্রয়কর্মী ইমরান খান বলছিলেন, বেচাবিক্রি কম। আগে একই রকম কাটের ডিজাইনের গয়নাই ক্রেতারা কিনতেন। এখন এসে নানা রকম নকশার খোঁজ করেন। এমন সময়ে যেমন কেনাবেচা হয়, ঈদ উপলক্ষে তাঁদের দোকানে সেটুকুও হচ্ছে না। একই চিত্র ইস্টার্ন প্লাজার ইউনিক ফ্যাশন থেকে বসুন্ধরার সারা কালেকশনে। ইউনিক ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ ইসমাইল প্রথম আলোকে জানালেন, ঈদ উপলক্ষে তাঁরা মুম্বাই থেকে ডায়মন্ড কাটের সেট এনেছেন। এগুলোর অধিকাংশ ভারতীয় চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় নায়িকাদের ব্যবহার করা গয়নার ডিজাইন থেকে করা। আছে অক্সিডাইজ প্লেট বা স্টোন বসানো জুয়েলারি। কিছু আনা হয়েছে রাজধানীর চকবাজারের পাইকারি দোকান থেকে।

default-image

তবে বড় দোকানগুলোর অবস্থা যখন এমন সঙ্গীন, তখন নিউমার্কেট আর চাঁদনী চকের নিচ তলার সাশ্রয়ী দোকানগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দেড় শ থেকে পাঁচ শ টাকার মধ্যে দিব্যি পাওয়া যাচ্ছে গলা আর কানের জোড়া সেট। মাকড়ি বা হাঁসুলির মতো গয়নার খোঁজও আছে এই দোকানগুলোতে। আছে ডজনের সেটে সোনালি, রুপালি চুড়ি। অধিকাংশ নারীর সাধ্য আর পছন্দের মধ্যে সামঞ্জস্য হয়ে যাচ্ছে এই গয়নাগুলো। কেউ কেউ একটা সেট কিনতে এসে দরাদরি করে কমিয়ে নিতে পারলে কিনে নিচ্ছেন আরও কিছু। এর পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে চুলের কাঁটা। কোনোটার মাথায় পাথর বসানো। কোনোটি প্যাঁচ এঁটে থেমে গেছে মাথায়। তবে এসব কাঁটা যাঁদের চুলের গোছায় খোঁপা হয় তাঁদের জন্য। ছোট চুলের নারীরা ঘেঁষছেন না কাঁটার দিকে।

default-image

সনাতনী গয়নার মতো সাশ্রয়ী মূল্যে এসব গয়নার চল আগে থেকেই প্রচলিত। ক্রেতা স্কুল বা কলেজে পড়ুয়া ছাত্রীরাই বেশি। তাই বলে হেলা করা যাবে না এসব গয়নাকে। গত বছরের মে মাসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মানচিত্রের কাজের জন্য সুইডেনের জঙ্গলে জরিপকালে ব্রোঞ্জ যুগের গয়নার সন্ধান পেয়েছিলেন থমাস কার্লসন নামের এক ব্যক্তি। বনের মধ্যে পাথরের পাশে পাওয়া গয়নাগুলোর মধ্যে আছে গলার হার, ব্রেসলেট, কাপড়ের পিনসহ প্রায় ৫০টি গয়না। যাঁদের পছন্দটা আরও একটু বদলেছে বা একটু বেশি দামে গয়না কিনতে পারছেন, তাঁরা যাচ্ছেন দেশি মেটেরিয়ালের দিকে। এবার ঈদে বীজ থেকে কাঠ, কড়ি থেকে কাপড় বা সুতার তৈরি গয়নার জয়জয়কার অনলাইনের পেইজগুলোতে।

সুতায় গাঁথা বীজ বা কাপড়ে সুতার নকশার গয়না

কুড়িয়ে আনা বীজ থেকে তৈরি গয়নায় উঠে আসছে নিজের সংস্কৃতি। রঞ্জনা, হরিতকি, পিন্দুক, লাটারা, রুদ্রাক্ষ বা তেঁতুলের বীজ দিয়ে গয়না তৈরি করে পরিচিত হয়েছে ‘ঋ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে পড়াশোনা করে ২০০৮ সাল থেকে ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করেন মাধুরী সঞ্চিতা। এক দশক ধরে কাজ করেছেন রঙ, যাত্রা, আড়ং, অরণ্য, ফ্রেন্ডশিপের মতো প্রতিষ্ঠানে। ঋ বলছে, আমাদের প্রকৃতির আদল বীজ দিয়ে তৈরি এসব গয়নায় উঠে আসে সবচেয়ে স্পষ্ট।

default-image

‘বৃত্ত’ গয়নার নকশা করেন জান্নাতুল ফেরদৌস। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, মাত্র তিন বছর হলো তাঁরা কাজ শুরু করেছেন। অনলাইনে অর্ডার নিয়েই ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। করোনার মধ্যেও তাঁদের ব্যবসা ভালো চলেছে। ঈদ উপলক্ষে প্রচুর চাহিদা তাদের সুতা, বীজ বা মুক্তার গয়নায়।

default-image

মাটি, কাঠ, কড়ির গয়নার প্রচলন হারিয়ে গিয়েছিল মাঝখানে। আবার ফিরছে সেসব গয়নার প্রচলন। এবারের ঈদে জংপড়া লোহার গয়না এনেছে বিজেন্স নামের একটি অনলাইনের ফ্যাশন গ্যালারি। ধূসর, বেগুনি, তামা, নীল রঙের নূপুর বিক্রি হচ্ছে ঈদ উপলক্ষে। এই নূপুর যে আপনার গহনার সিন্দুকে নেই হলফ করেই বলা যায় দাবি বিজেন্সের। বিজেন্সের একজন কর্ণধার জিনাত জাহান নিশা জানালেন, ঈদ উপলক্ষে তাঁদের বিক্রি ভালো। বিজেন্সের তামার গয়নাগুলো তৈরি করেন ঢাকার আশপাশে সাভার বা নারায়ণগঞ্জের কারিগরেরা। তাঁদের বেশির ভাগ ক্রেতা ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীরা।

default-image

কবে প্রথম নারীর গয়না পরতে ইচ্ছে হয়েছিল বলা কঠিন। তবে উৎসব মানেই গয়নার গল্প। স্যাকরার সামনে রাখা প্রদীপের আগুনের জায়গায় এখন এসেছে গ্যাস বার্নারের কাজ। হাতের কাজ হচ্ছে মেশিন কাটে। হোক মূল্যবান হীরা, পান্না অথবা কম দামের পুঁতি বা প্লাস্টিকের।

উসমানী সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজা সুলতান সুলেমান মন অস্থির থাকলে নিজের হাতে গয়না তৈরি করতেন। মূল্যবান দ্রব্য দিয়ে তৈরি সেই অমূল্য গয়না যে নারীর অঙ্গে শোভা পেত, সে বিবেচিত হতো ভাগ্যবান হিসেবে। গয়নার সঙ্গে ক্ষমতা ও সৌন্দর্য দুয়েরই সম্পর্ক। আছে মনসংযোগের গল্প। কোন দেশের গয়নার নকশা দেখে সে দেশের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। ঈদের গয়না কিনতে গিয়ে সনাতনী আর প্রচলিত দুই ধরনের গয়নাই কিনে বাড়ি ফিরেছেন শায়লা পারভীন নামের এক কর্মজীবী নারী। নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে হয়েছে বলে কিনে ফেলেছেন দুটি সেট। গয়নার ঝোঁক কেন জানতে চাইলে বললেন, ‘গয়না ছাড়া কি কখনো সাজসজ্জা সম্পূর্ণ হয়?’

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন