বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাজউক এলাকায় এখন ভবন নির্মাণ করা হয় ২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা অনুযায়ী। বিদ্যমান বিধিমালায় পুরান ঢাকার কোনো এলাকার রাস্তা যদি ৩০ ফুট চওড়া হয় এবং সেই রাস্তার পাশে কারও যদি ৫ কাঠা জায়গা থাকে, তাহলে তিনি সেখানে যে উচ্চতার ভবন করতে পারেন, গুলশান বা সাভারেও একই উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যায় (যদি রাস্তার প্রস্থ এবং জমির পরিমাণ একই থাকে)। বর্তমানে রাজউকের আওতাধীন সব এলাকাতেই এফএআরের মান সমান।

এখন রাজউক যে বিধিমালা করতে যাচ্ছে, তাতে জমি ও রাস্তার পরিমাণ একই থাকলেও পুরান ঢাকা, গুলশান ও সাভারে ভবনের আয়তন বা উচ্চতায় পার্থক্য হবে। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যেসব এলাকার জনঘনত্ব বেশি, সেসব এলাকায় এফএআরের মান কম ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ভবনের আয়তন বা উচ্চতা কমবে। আর যেসব এলাকায় জনঘনত্ব কম, সেসব এলাকায় তুলনামূলকভাবে এফএআরের মান বেশি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভবনের আয়তন বা উচ্চতা বাড়ানো যাবে। খসড়ায় দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের (উত্তরার ১ থেকে ১০ নম্বর সেক্টর) যে অংশে জনঘনত্ব বেশি, সে অংশে এফএআর ১ দশমিক ৬৩ এবং যে অংশে জনঘনত্ব কম, সেখানে এফএআর ৩ দমশিক ৪৩ দেওয়া হয়েছে।

রাজউকের নগর–পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, খসড়া বিধিমালা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। খসড়াটি আরও পর্যালোচনার জন্য আগামী মে মাসে রাজউকে সভা হবে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের (অক্ষয় দাস লেন, শাঁখারী নগর লেন) জনঘনত্ব একরপ্রতি ১ হাজার ৩৭৯ জন। এই ওয়ার্ডের প্রত্যাশিত ধারণক্ষমতা একরপ্রতি ১৫০ জন। ধারণক্ষমতার চেয়ে এখানে ৯ দশমিক ২ গুণ মানুষ বেশি বাস করে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে (জাফরাবাদ-রায়েরবাজার) এলাকায় একরপ্রতি ৬৬৮ জন বাস করে। এই এলাকার ধারণক্ষমতা একরপ্রতি ১৬৭ জন। এখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে সাড়ে চার গুণ বেশি মানুষ বাস করে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ বাস করায় নাগরিক সুবিধা প্রকট হচ্ছে।

এলাকাভেদে এফএআর মান ঠিক করে দেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান বিধিমালায় সব এলাকার জন্য একই এফএআর দেওয়ায় অনেক এলাকার ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বাস করছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নাগরিক সেবা ও নগরের বাসযোগ্যতায়। এলাকাভিত্তিক এফএআর নির্ধারণ করা হলে ওই সব এলাকার অবস্থা আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

বর্তমানে রাজউকের আওতাধীন এলাকা ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও গাজীপুরের একাংশ রাজউকের আওতাধীন। অবশ্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের জন্য গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। চেয়ারম্যান নিয়োগ ছাড়া এই কর্তৃপক্ষের অন্য কার্যক্রম শুরু হয়নি। গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু হলে গাজীপুর রাজউকের আওতাধীন এলাকা থেকে বাদ পড়বে।

রাজউক সূত্র বলছে, এফএআর ছাড়াও বড় আকারের আরও নতুন তিনটি কৌশল যোগ করা হয়েছে খসড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়। এগুলো হচ্ছে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা অনুমোদন, স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং (কাঠামো নকশা) যুক্ত করা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত সব অনুমোদন নেওয়া।

এ বিষয়ে নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভবনের পরিকল্পনা অনুমোদনের বিষয়টি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি অনুপস্থিত। এর মাধ্যমে ভবনের আকার ও ব্যবহার অনুযায়ী ভবনটির আশপাশের এলাকার কী কী প্রভাব পড়বে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে কোনো এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে, এমন ভবন তৈরি থেকে বিরত থাকা যায়। অন্যদিকে কাঠামো নকশার বিষয়টি ভবনের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, এটি ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় যুক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, বিশেষ কোনো প্রকল্প বা বড় আকারের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করার নিয়ম আছে। যাতে ওই এলাকায় যানচলাচলে সমস্যা না হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পার্কিং–সুবিধা রাখা হয় নতুন ভবনে।

নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, এলাকাভিত্তিক এফএআর নির্ধারণের বিষয়টিকে তাঁরা সাধুবাদ জানান। তবে কাঠামো নকশা ও পরিকল্পনা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগে রাজউককে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তবে তিনি বলেন, নতুন দুটি বিধান যুক্ত করতে গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে রাজউককে।

রাজউকের আওতাধীন এলাকায় প্রতিবছর প্রায় চার হাজার বাড়ি নির্মাণ করা হয়। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, বছরে যত আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়, তার প্রায় ৪১ শতাংশ তৈরি করেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। ৫১ শতাংশ বাড়ি নির্মাণ করা হয় ব্যক্তি উদ্যোগে। বাকি ভবন নির্মাণ করে সরকার।

রাজউকের খসড়া ইমরাত নির্মাণ বিধিমালার বিষয়ে আবসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তাসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করেও বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া যায়। কোনো পরিকল্পনা করার আগে ঢাকার আয়তন ও মানুষের চাহিদার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু এসব না করে রাজউক শুধু ভবনের উচ্চতা কমানোর মাধ্যমে ঢাকার জনঘনত্ব ‘জোর’ করে কমানোর চেষ্টা করছে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন