default-image
>

শেষ পর্যন্ত জ্বর এল। জ্বরের সঙ্গে এল আরও কত উপসর্গ! এসব কিছুই এক শরীরে নিয়ে অজানা আশঙ্কায় অনেক দায় শোধ করলেন। অবশেষে এক অসম লড়াই বিজয়ী হয়ে ফিরে এসে নিজের কথার ঝুলি উজাড় করে দিলেন শেখ সাবিহা আলম

সাধারণ ছুটি ঘোষণার বেশ কিছুদিন পরের কথা। কাজ সেরে বাসায় ফিরছি। বসুন্ধরা শপিং মলের সামনে হলদে ফুলের ঝাড়ে চোখ আটকে গেল। অবাক করে দিল আশপাশের গাছগুলোও। এতগুলো বছর অধোমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি ওদের। হঠাৎ মনে হলো ওরা সব নওজোয়ান। সিনা টান করে ঝড়-তুফানের মোকাবিলা করে হররোজ।

প্রকৃতি আসলে বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কেন যেন বদলে যাওয়া প্রকৃতির রং-রূপ-রস-গন্ধ ঠিক উপভোগ করতে পারছিলাম না। কোথায় যেন একটা অস্বস্তি। নইলে করোনাকালে আকাশজুড়ে যে রংধনু উঠল, তা দেখে কিংবা পাখিদের কিচিরমিচির শুনে আমার তো আনন্দে বিহ্বল হওয়ার কথা। তা না হয়ে পাখিদের মনে হলো গ্রিক ট্র্যাজেডি ইডিপাস রেক্সের কোরাস। কেন এই অদ্ভুত তুলনা, সে প্রসঙ্গে পরে যাই। তার আগে বরং পুরোদস্তুর সাংবাদিক হয়ে কেন নিজের কথা বলছি, সে কথাটা খোলাসা করে নিই।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত হয়েছিলাম। বাসাতেই চার সপ্তাহের একরকম বন্দিজীবন শেষে কাজে ফিরেছি সম্প্রতি। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের নির্দেশে কি-বোর্ডে হাত রাখলাম। খুব ভালো লাগবে যদি এই অভিজ্ঞতা থেকে একজন পাঠকও উপকৃত হন।

গল্পে ফিরি। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) হিসাবে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন ৮ মার্চ; ১০ দিনের মাথায় মারা যান একজন। সংশ্লিষ্ট বিটের রিপোর্টাররা অবশ্য এর আগেই বিশ্ব পরিস্থিতির খবরাখবর দিচ্ছিলেন। আমি তখনো ঠিক ঘটনার ভয়াবহতা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এর মধ্যেই অফিসে তোড়জোড়।

দেখলাম, প্রথম আলো কার্যালয়ে লিফটের গোড়ায় পৌঁছানোর আগেই ইনফ্রারেড থার্মোমিটারে শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে, হাত স্যানিটাইজ ও জুতো জীবাণুনাশকে ধুলেই কেবল অনুমতি মিলছে ওপরে ওঠার। ওহ, লিফটেও পাঁচজনের বেশি ওঠায় নিষেধাজ্ঞা ছিল।

বরাবরের বেপরোয়া আমি সব শর্ত মেনে নিলাম, সবার মঙ্গলের প্রশ্ন যেখানে জড়িত সেখানে আসলে ফাঁকিবাজি চলে না। মাস্ক-গ্লাভস রোজকার পোশাকের অংশ হয়ে গেল। আস্তে আস্তে অফিসের কর্মী ব্যবস্থাপনাতেও রদবদল হলো। অনেককে ছুটিতে পাঠানো হলো, বাকিরা পালাক্রমে অফিস ও বাসা থেকে কাজ চালিয়ে নিতে শুরু করলেন। গমগমে নিউজরুম কেমন বিবর্ণ আর ধূসর হয়ে উঠল। আড্ডাবাজ আমার অবস্থা তখন রীতিমতো ডাঙায় তোলা মাছের মতো।

এখানেই বলে ফেলি, কেন পাখিরা আমার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। পান্থপথের যে জায়গাটায় আজ চৌদ্দ বছর আছি, সে জায়গাটা কখনো ঘুমায় না। রাতভর উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলো গতিরোধককে তোয়াক্কা না করে বিকট শব্দে চলতে থাকে, আশপাশে অনেকগুলো হাসপাতাল, কাঁচাবাজার, ব্যাংক, বাস কাউন্টার। হইহল্লা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সেই পান্থপথেও লকডাউনে রাত নামল। এমন এক রাতের শেষভাগে বিছানায় উঠে বসলাম আমি পাখিদের সম্মিলিত কিচিরমিচিরে। কথার ধরনে কখনো মনে হয় গল্প করছে ওরা, কখনো তর্ক, কখনো আর্তনাদ। ওরাও কি আমাদের ভবিতব্য নিয়ে আলোচনায় বসেছে? জানার তো আর উপায় নেই।

আমার সফোক্লেসের ইডিপাস রেক্সের কোরাসের কথা মাথায় এল। কারণ, ওখানেও ইডিপাস যে রাজ্যের রাজা, সেই থিবসে প্লেগের কারণে অগুনতি মানুষের প্রাণহানির খবর আমরা কোরাসের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম থিবসে আর নতুন কিছুর জন্ম হয় না। নবজাতকের আবির্ভাবে মায়েদের প্রসববেদনা ভোলার কাল গত হয়েছে। আছে শুধু দুঃখ আর মৃত্যু। কোরাসই দেবরাজ জিউস আর তাঁর সন্তান অ্যাথেনা, আর্টেমিস ও ফিবাসের কাছে প্রার্থনা করে। ইডিপাস জেনেছেন লেইয়াসের খুনির কারণে রাজ্য অভিশাপের কবলে। সেই খুনি কে, জানেন দেবতা অ্যাপোলোর সেবক অন্ধ সাধু টেইরেসিয়াস। তাঁকেও ইডিপাস হাজির করেন কোরাসের পরামর্শেই। ট্র্যাজেডির শেষ দিকে গিয়ে টেইরেসিয়াসের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়, পিতৃহন্তারক হিসেবে আবির্ভূত হন ইডিপাস নিজেই, পিতা হয়েও ভাই হন আপন সন্তানের, লজ্জায়-ক্রোধে নিজের চোখ অন্ধ করে দেন নিজেই।

আমি আমার এই এই শঙ্কার কথা ফেসবুকে লিখে বন্ধুদের জানালাম। আরও জানালাম, গানপাগল আমি অস্বস্তি থেকে বাঁচতে জুতসই গান খুঁজে পাই না। কানাডাপ্রবাসী বন্ধু হাসান মাহমুদ একগাদা গানের লিংক পাঠাল। শুনলাম, ভালোই। কিন্তু মন তো শান্ত হয় না।

দিন কয়েক বাদে শুনলাম আমাদের প্রিয় সহকর্মী প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ১৫ এপ্রিল জ্বর এসেছিল, ১৯ এপ্রিল রিপোর্ট পেয়েছেন তিনি। বুঝলাম, বিপদ এখন খুব কাছেই। ২০ এপ্রিল থেকে বাসায় বসে কাজ করার নির্দেশনা পেলাম আমরা সবাই।

পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে
পরিবর্তিত জীবনে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম আমরা সবাই। অপরাধ বিভাগের সাংবাদিক হিসেবে যাঁদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হয়, তাঁরাও মিটিংগুলো অনলাইনে করতে শুরু করলেন। পুলিশ সদর দপ্তর, র‍্যাব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একে একে সবাই জুমে বা ভিডিও বার্তায় যুক্ত হলেন।

এর মধ্যেই পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হওয়ার খবর পাচ্ছিলাম আমরা। আমাদের সহকর্মীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) যেতে হলো, চিকিৎসক আর পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হতে শুরু করলেন পাল্লা দিয়ে, মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক মঈনুদ্দিনকে দিয়ে চিকিৎসকদের মৃত্যু শুরু হয়েছিল, সংকটজনক অবস্থায় পড়লেন আরও কয়েকজন। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হলো পরপর। আজ এখানে লকডাউন হয় তো কাল ওখানে।

একবিকেলে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলাম উল্টো দিকে রাজাবাজারের গলির মুখ বাঁশ ফেলে আটকে দেওয়া হচ্ছে। শুনলাম এক গলিতেই সাতজন। লকডাউনের বাঁশের প্রতিবন্ধক এড়িয়ে আমার চোখ তখন আটকে আছে রিকশা গ্যারেজের দিকে। শতাধিক রিকশা অলস বসা। রিকশার পেছনের মানুষগুলোর কথা ভাবি। কেমন আছেন তাঁরা? কী করছেন? কী খাচ্ছেন? তাঁদের সন্তানেরা কি রোজ রাতে খিদে পেটে ঘুমাতে যায়? ঢাকা ছেড়ে কি চলে গেছেন তাঁরা?

ভাবনার তো আর সীমানা নেই, চাইলেই পাখা মেলে। ভয় হয় দীর্ঘদিন পথে নামতে না পারলে তাঁদের কেউ কেউ হয়তো অপরাধে জড়িয়ে পড়বেন। মনে পড়ল গাজীপুরের মা আর তিন সন্তান হত্যাকাণ্ডের কথা। র‍্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছিলেন, হত্যাকারীদের মধ্যে ভ্যানগাড়ি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক, দিনমজুর ছিলেন। তাঁদের জুয়ার নেশা তো ছিলই, কাজকর্ম ছিল না। টাকার খোঁজে ডাকাতি, সেই থেকে চার-চারটে খুন করে বসেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরও প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, নানা ধরনের অপরাধ বাড়তে পারে, সে শঙ্কা আছে।

সাতপাঁচ ভাবনার ঘোর ভাঙাল আমার বর আকিফুর রহমান। বলল, সাবিহা, আমাদের বাসাটা তো মূল সড়কের ওপর। কেউ আক্রান্ত হলে এটা লকডাউন করবে কী করে? আমি প্রমাদ গুনলাম। এই সময়ে এমন কথাও কেউ মুখে আনে? লকডাউন হবে, দেয়ালে লাল রং করবে, লোকে দেখলে ভয় পাবে, জানলে একঘরে করবে। আমার বড় মেয়ে পিয়েতা (১২) খুবই সংবেদনশীল, চাপা স্বভাবের। মুখে কিছু না বললেও এই চাপ সে সহ্য করতে পারবে না। মহাবিপদ হবে তখন। বিকেলটাই পানসে হয়ে গেল।

একটা কথা পাঠকদের বলে রাখি, বিকেলে ছাদে ওঠার সুযোগ মাঠের সাংবাদিকদের কাছে কিন্তু একরকম বিলাসিতা। দুবার মাতৃত্বকালীন ছুটি বাদে বিকেলে বাসায় থাকার সুযোগ হয়নি গত পনেরো-ষোলো বছরের সাংবাদিক জীবনে। সেই সুযোগ এবার সুদে-আসলে বুঝে পেলাম আমরা অনেকেই। কিন্তু তারপরও না পাওয়ার একটা বেদনা আছে।

সাংবাদিকতা ভালোবেসে করি, প্রথম আলোও আমার আরেকটা পরিবার। সে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে ঝগড়া হয়, তর্কবিতর্ক হয়। আবার একসঙ্গে মুড়ি মাখা, চা খাই, বেদম আড্ডা দিই, হেড অব রিপোর্টিংয়ের বকা শুনে হাসির শব্দ কমাই।

আমি মাঠটাকে খুব মিস করছিলাম। করোনাকালে কত কী ঘটে যাচ্ছে, সরেজমিন দেখতে ইচ্ছে হয়। সোর্সদের সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার বলে মনে করি। ভাবলাম সব সতর্কতা মেনে আবার বেরোতে শুরু করব। তত দিনে আমাদের সহকর্মীও সেরে উঠছেন।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে লালমাটিয়ায় গেলাম, আর ৭ মে গেলাম সেরে ওঠা পুলিশ সদস্যদের কাছে। করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হয়ে কাজে যোগ দিতে যাওয়া এই মানুষগুলোর আত্মবিশ্বাস দেখে প্রাণিত হই। সব সেরে মিন্টো রোড থেকে যখন ফিরছি, তখন বিকেল। মাথাটা কেমন ভার ভার বোধ হলো আমার, শরীর বশে নেই। একরকম জোর করেই লেখা, ছবি, ভিডিও শেষ করে পাঠালাম।

জ্বর এল
এক দিন পর জ্বর এল আমার। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার শোয়ার ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করলাম। আকিফকে বললাম, সবগুলো ফ্ল্যাটে জানিয়ে দিতে যেন কেউ না বাসায় আসেন।

এই ফাঁকে একটু বলে রাখি, আমি একটা বৃহৎ পরিবারের সদস্য। ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কটিতেই আমাদের আত্মীয়স্বজন আছেন। যে দু-চার ঘর বাইরের মানুষ ফ্ল্যাট কিনেছেন বা ভাড়া নিয়েছেন, তাঁরাও আর বাইরের নন, স্বজনই। আমাদের এই ভবনের ফ্ল্যাটগুলোয় রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তালা মারা হয় না, ফ্ল্যাটের শিশুরা এ বাড়ি-ও বাড়ি করে, দাদা-দাদির সঙ্গে লুডুর চাল কিংবা টিভি চ্যানেলে সিরিয়াল নাকি কার্টুন, তা নিয়ে তীব্র ঝগড়া করে, তারপর মিলেমিশে এটা-সেটা খায়, গল্প-গুজব করে। আমার মনে ভয়, এ বাড়িতে ষাট ও সত্তরের ঘরে থাকা স্বজনরা যদি আক্রান্ত হন! প্রায় প্রতি বাসাতেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছেন।

আমার শাশুড়ি অল্পস্বল্প কাপড়চোপড় নিয়ে তাঁর নিজের ফ্ল্যাট ছেড়ে, মানে আমি যেখানে থাকি, সেখান থেকে দুইতলা নিচে আরেক ছেলের ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলেন।

গত ৯ মে আমার নমুনা নিয়ে গেল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মাস্ক, গ্লাভস পরে আমি গাড়ি বারান্দায় গিয়ে বসলাম। নাম-ঠিকানা যেন নির্ভুল হয়, তাই তাদের দিতে আমার নিজের একটা কার্ড নিয়ে গিয়েছিলাম। খেয়াল করলাম হাত বাড়িয়ে কার্ডটা দিলেও তারা এড়িয়ে গেল। আমার হাতে থাকা জীবাণু তাদের আক্রান্ত করতে পারে, সেই ভয় থেকেই হয়তো।

এবার অপেক্ষা। দুদিন হলো জ্বরের, সঙ্গে মাথা, গা আর গলায় ব্যথা। গলাব্যথাটা তবু সহনীয়, মাথা আর গায়ের ব্যথাটা বড্ড বেশি। আমার সহকর্মী তখন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। দিনটা ১১ মে। সকাল সাড়ে ১০টা হবে। জানতে চাইলেন কেমন আছি। অভয় দিলেন, বললেন, আমার কিছু হবে না।

আমি বিছানায় শুয়ে দক্ষিণি নৃত্যশিল্পী অর্চনা রাজার নাচ দেখছিলাম।' মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ' গানের সঙ্গে এমন অপূর্ব নাচ আগে কখনো দেখিনি। গুগল করে নৃত্যশিল্পীকে জানার চেষ্টা করলাম। ফেসবুকে শেয়ার করলাম নাচের ভিডিও ক্লিপ, ভাইকে পাঠালাম। উদ্দেশ্য, ওকে কিছুটা হালকা করা। আমি আমার মা–বাবার একমাত্র মেয়ে, দুই ভাইয়ের একটি বোন। বয়স যতই হোক না কেন, এখনো আমি ওদের কাছে ছোট।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে রিপোর্ট পেলাম হাতে। আমি কোভিড-১৯ পজিটিভ!

default-image

কী করি, আমি কী করি
রিপোর্টটা হাতে নিয়ে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। আমার পিতৃ ও শ্বশুরকুলে কে এই ধাক্কা সামলাতে পারবেন, তা নিয়ে ধন্দে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত বরকেই প্রথম বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাকে জানালাম, দুশ্চিন্তায় পড়েছে মনে হলো। আর আমার ভীষণ আবেগপ্রবণ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, নাচটা দেখলি? অসাধারণ না? ভাই আমার খুব ধীরে ধীরে বলল, আমি শুনেছি, তুই পজিটিভ। একে একে সবাই জানলেন, আমার বাবা, বড় ভাই, শাশুড়ি। শাশুড়ি—যাঁর সঙ্গে আমার খাট্টা-মিঠা সম্পর্ক—তিনি পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসলেন।

আমি ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফকেও জানালাম। রিপোর্টারদের কমন গ্রুপে তিনি লিখলেন, 'আমাদের সাবিহার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে।' বেশ লম্বা একটা ছেদের পর একে একে সবাই মন্তব্য করতে শুরু করলেন। অনেকেরই লেখায় আতঙ্কের ছাপ। আমি তাঁদের অভয় দিতে লিখলাম, 'ভালো আছি, রাজপথ ছাড়ি নাই।' আমার প্রিয় কুররাতুল আইন আপা লিখলেন, করোনা এবার বুঝবে সে কাকে ধরেছে। হেড অব রিপোর্টিং শরিফুজ্জামান কিংবা সহকর্মী গোলাম মোর্ত্তুজারও ধারণা হলো করোনাভাইরাস আমাকে কাবু করতে পারবে না।

এর মধ্যে ফোন করলেন সম্পাদক মতিউর রহমান। আমাদের অপরাধ বিভাগের প্রধান কামরুল হাসান হন্যে হয়ে অবস্থার অবনতি হলে আমাকে কোথায় নেওয়া হবে, সে খোঁজখবর নিচ্ছেন তখন। শওকত হোসেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। কামরুল ভাই বললেন, পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আমাদের এক ভাই জানিয়েছেন আমার বুকের একটা এক্স-রে করতে হবে, রক্ত পরীক্ষাও লাগবে।

একের পর এক বেশ কটা হাসপাতালে ফোন করলাম আমি। নাম বলে জানালাম আমি কোভিড-১৯ পজিটিভ, পরীক্ষা করা যাবে কি না। সবাই না করে দিলেন। হাসপাতাল পাড়ায় থেকেও প্রত্যাখ্যাত হলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম কোনো পরীক্ষাই করব না। যা থাকে কপালে।

আমি আমার শৈশবের বন্ধু পপুলার মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ইশরাত রেজার পরামর্শেই চলব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সে আমাদের আস্থার প্রতীক।' আমরা বিদ্যাময়ীর' নামে স্কুলবন্ধুদের অনলাইনে গ্রুপে সারাক্ষণই সে সব ধরনের রিপোর্ট দেখতে থাকে, বেচারা! ওর কথাতে অ্যাজিথ্রোমাইসিন শুরু করেছিলাম জ্বরের শুরুতে, জিঙ্ক খেলাম, ভিটামিন সি ও ডি চলল। আর জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল। একটা পালস অক্সিমিটার কিনে নিলাম। নজরে রাখলাম অক্সিজেন স্যাচুরেশনের স্তর।

ভালোই তো আছি
শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার রোগের কথা সবাইকে জানাব। এ নিয়ে লুকোছাপার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি। আরও ভেবেছিলাম, আক্রান্ত নারীরা যেন কখনোই রোগকে অপরাধ না ভাবেন, স্বজনরাও যেন তাঁদের দূরে ঠেলে না দেন, সে জন্য যদি আমার ফেসবুক পোস্টটা একবিন্দুও কাজে লাগে, তাতেও স্বস্তি।

দিনভর শুভকামনা জানিয়ে বার্তা পাঠালেন বন্ধু-স্বজন, কাছের ও দূরের মানুষেরা। আমি ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপকমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) মো. মাসুদুর রহমানকে জানালাম। দুঃখ প্রকাশ করে বললাম, সেদিন যে যে আমার সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা যেন সাবধানে থাকেন।

কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গুম হয়ে যাওয়া ছাত্র ইশরাকের বাবা জামাল উদ্দিন ডিএনএ পরীক্ষা করাতে চেয়েছিলেন। ২০১৭ সালের আগস্টে বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে নিখোঁজ হন ইশরাক। পুলিশ-র‍্যাবের সন্দেহভাজন জঙ্গিদের তালিকায় নাম নেই। তিন বছর পর তবু জামালউদ্দিন চান বিভিন্ন অভিযানে নিহতদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে নিজেরটি মিলিয়ে দেখতে। ভাবলাম, যদি মারা যাই, যোগাযোগটা আর করিয়ে দেওয়া হবে না। কারও জন্যই কিছু থেমে থাকে না, তবু বেচারা বাবাকে হয়তো আরও দু-একটা দিন বেশি ঘুরতে হবে। র‍্যাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ফোন করলাম।

একটা প্রতিষ্ঠানকে অনুবাদের কাজে সাহায্য করেছিলাম। কিছু সংশোধন ছিল। ওটাও শেষ করে দিলাম।

হালকা জ্বর আর গলাব্যথায় দুটো দিন পার করে দিলাম। আমার দরজা বন্ধ। দরজার বাইরে আকিফ নির্দিষ্ট সময় পর খাবার রেখে যায়। আমার বৃহৎ পরিবারের সদস্যরা স্যুপ করে পাঠান, ফল পাঠান। আমি গরম পানি খাই, ভাপ নিই, গড়গড়া করি। দুই মেয়ে, বাবা, ভাইয়া, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা ভিডিও কলে কথা বলে। আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু রীতু কিছুতেই মানতে পারছিল না, ও বাসায় এসে আমাকে দেখে যাবে। বহু কষ্টে বোঝালাম করোনাকালে দূরে থাকাই ভালোবাসা। আসলে তো এ রোগের বড় কষ্ট একটাই, প্রিয়জনকে স্পর্শ করতে না পারার। জ্বর উঠবে, কপালে কারও হাতের স্পর্শ পাওয়া যাবে না—এ বড় কঠিন রোগ!

'দ্য প্লেগ' উপন্যাসে আলবেয়ার কাম্যু লিখেছিলেন, একটা সময় প্লেগ শহরের দরজাগুলো বন্ধ করে দিল, মানুষকে আলাদা থাকতে হলো, ভালোবাসার স্পর্শ—যার উষ্ণতায় সে সব ভুলে থাকতে পারে—তাও নিষেধ হলো।' তিনি লিখলেন মানুষের ভালোবাসার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কথা।

একটা কথা বলে রাখি, এ উপন্যাসের আরও অনেক অংশের সঙ্গে মিল আছে এখনকার পরিস্থিতির। সারাক্ষণ মুখ গুঁজে হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত থাকা মানুষ ওখানে ভালোবাসতেই ভুলে গিয়েছিল, তারপর যখন প্লেগ হতে শুরু করল, তখনো কর্তৃপক্ষের স্বীকার না করার অপচেষ্টা ছিল, আর অদৃষ্টের কাছে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ তো আছেই।

গলায় কেউ চাবি দিয়ে দিয়েছে
পঞ্চম দিন সকালে বুঝলাম গলাটা একেবারে বন্ধ। মনে হলো তালা দিয়ে কেউ চাবি নিয়ে গেছে। দ্রুত গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করতে শুরু করলাম।

বইয়ের তাক থেকে 'সোফির জগৎ'টা নামালাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বাধ্যতামূলক ছিল। কেন পড়িনি ঠিকঠাক সে সময়ে, সে নিয়ে আফসোসের সীমা নেই এখন। নতুন করে যদি অল্পস্বল্পও শিখতে পারি দর্শনের, তা-ই বা মন্দ কী। এগোতে পারলাম না। শরীরটা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম। মনে হলো শরীরের ভেতরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হবে। অস্থির লাগছিল খুব। স্বাদ-গন্ধ পাচ্ছিলাম না পঞ্চম দিন থেকেই। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস যেমন হয়, আমারও সে অবস্থা। খাবারের গন্ধ পেলেই বমি আসে।

মধ্যরাত থেকে বমি করতে শুরু করলাম। জ্বরটাও জেঁকে বসল। বুকের খাঁচার নিচ থেকে তীব্র ব্যথা। আমি ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে গেলাম। দেখলাম বন্ধ দরজার কাছে পায়চারি করছে আকিফ। উদ্বিগ্ন গলায় কাউকে কিছু বলছে। পরে শুনেছি, ফোনের অন্য প্রান্ত রাতভর আমার প্রায় আট মাসের গর্ভবতী চিকিৎসক বন্ধুটি ছিল।

রাতের ধকল কেটে গেলে সারা দিন ঘুমালাম। শুনেছি দরজাটা একটুখানি ফাঁক করে ঘরের লোকজন খেয়াল রাখছিল আমার বুক-পেট ওঠানামা করছে কি না। দেহঘড়িটা সেদিন যে উল্টে গেল, ঠিক হয়নি পরের দুই সপ্তাহতেও। রাতটাই দিন হয়ে গেছে এখন, দিনটা রাত।

default-image

সোমনীল গাইল 'মুক্ত করো ভয়'
একদিকে আমি সারা দিনে কোনো কথা বলিনি, অন্যদিকে আমার পরিবারের অন্যদের নমুনা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে আমি পজিটিভ হওয়ার পরই। সবাই দুশ্চিন্তায়। যদি আমার বরের পজিটিভ হয়, তখন ব্যবস্থাপনা কী হবে। শাশুড়ির কিছু হলে তিনি ধাক্কা সামলাবেন কী করে। আমার ভয়, আইসোলেশনে আসার আগে আমি দুই মেয়েকে দুই পাশে বসিয়ে মুখে তুলে ভাত খাইয়েছি, চুমুও দিয়েছিলাম। ওরা ঠিক আছে তো!

এর মধ্যেই আমার ছোট মেয়ে সোমনীলকে তার বাবা একটা কিছু গাওয়ার পরামর্শ দেয়। উদ্দেশ্য, আমাকে শোনানো ও সোমনীলের বন্ধুদের স্কুলের অনলাইন গ্রুপে পোস্ট করা। কী জানি কেন, এত গান থাকতে সোমনীল বেছে নিল 'সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান, সংকটেরও কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ'। ওর কচি গলার 'মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়' শুনে পরিবারের সবাই হালকা হলেন। আমিও শুনলাম। রাতে একাত্তর টিভিতে প্রচার হলো ওর গান।

সারা দিন বন্ধু-স্বজনের ফোন ধরিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের অনুরোধে ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলাম এই শর্তে যে আমি শুধু শুনব, কথা বলব না। বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বললাম। বাবা কাঁদছিল, আমার ভাইয়ের চোখেও পানি দেখলাম। ভোরবেলায় সবার রিপোর্ট পাওয়া গেল, সবাই নেগেটিভ। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বারবার মনে হলো দরজাটা খুলে মেয়ে দুটোকে ছুঁয়ে দেখি একটু, আবার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলাম।

পরদিনও শরীরটাকে বাগে আনতে পারছিলাম না। বেলায় বেলায় খাবার ঢুকছিল ঘরে, আমিও খাবারটা হাতে নিয়ে বিনে ফেলছিলাম। সম্পাদক ফোন করেছিলেন, কী খেতে পছন্দ করি, জানতে চাইলেন। বললাম, চকলেট আর কফি। পেয়েও গেলাম হাতে, বরও অবশ্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে চকলেট কুকিজ দিয়েছিল। সবই ঘরে ঢুকে নিজেদের মতো পড়ে রইল। মুখে রুচল না কিছুই। এত দুর্বল লাগছিল, পাঁচ লিটারের পানির বোতলের দিকে তাকিয়ে থেকে বহুবার ভাবলাম, এই বোতল থেকে পানি ঢেলে খাব কী করে? এর মধ্যে শুরু হলো ডায়রিয়া। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর কড়া ডাক্তার ইশরাত রেজা আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ খাওয়ার অনুমতি দিল। অনুমতি পেয়ে আমি একাধিক ওষুধ খেয়ে ঘুমালাম।

স্বপ্নে মা এসে মাথার কাছে বসল, ভারি সুন্দর একটা শাড়ি পরনে। অনেকক্ষণ পর মনে পড়ল, মারা যাওয়ার পর মাকে গোসল করানো হয়েছিল এই শাড়িটায়। স্বপ্ন তো সাদা–কালো, রঙিন শাড়ি কী করে দেখলাম? ঘুম ভেঙে গেল।

অনেক চেষ্টার পর আবারও ঘুমালাম। এবার স্বপ্ন দেখলাম, আমি দাঁড়িয়ে আছি উত্তাল সাগরের পাড়ে। অনেক দূরে একটা ট্রলার। সেই ট্রলার পর্যন্ত কি আমার গলা পৌঁছাবে? আমি কি ডুবেই যাব? এমন সব ভাবনার মধ্যেই আমাকে অবাক করে দিয়ে ট্রলারটা ঢেউ ভেঙে কাছে এসে দাঁড়াল। সাদরে মাঝি আমাকে উঠিয়ে নিলেন।

আমার মৃত্যুচিন্তা হলো। অমন উথাল-পাতাল নদী দেখলাম কেন! আব্বার কাছে পুলসিরাতের গল্প শুনেছিলাম ছোটবেলায়। চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম আর তলোয়ারের চেয়েও ধারালো সে সেতু কেউ চোখের নিমেষে পেরিয়ে বেহেশতে পৌঁছাবে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ দৌড়ে, কেউ হেঁটে অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে। যারা নিচে পড়বে, তারা সোজা দোজখে। পুলসিরাত কি কোনো নদীর ওপর? সুস্থ হলেই খোঁজ নেব সিদ্ধান্ত নিলাম। সনাতন ধর্মে বৈতরণি পেরিয়ে স্বর্গে যাওয়ার কথা পড়েছিলাম।' ট্রয়' সিনেমায় ছেলে হেক্টরের মৃতদেহ নিতে এসে তার বাবা রাজা প্রিয়াম বলেছিল নৌকায় পরপারে পৌঁছাতে মাঝিকে যে মুদ্রা দিতে হয়, তাকে যেন ছেলের চোখে অন্তত সে মুদ্রাটি দিয়ে সমাহিত করার সুযোগ দেয় অ্যাকিলিস। শেষ যাত্রার সঙ্গে জলপ্রপাতে যোগ আছে বোধ করি।

আয়নায় মুখ দেখলাম। গোটা মুখে র‌্যাশ।

দশম দিনে কিছুটা সুস্থ বোধ করলাম
দশম দিন সকাল থেকে একটু ভালো বোধ করলাম। হাসতে হাসতে আব্বাকে বললাম, দরজা খুলে দিলে এক দৌড়ে মিরপুরে চলে যেতে পারব, এত ঝরঝরে লাগছে। সুখ সইল না। দুপুরের পর থেকে পেটটা ক্রমেই ফুলতে শুরু করল।

১২ থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত এটা খুব কষ্ট দিয়েছে। ছবি তুলে চিকিৎসককে পাঠালাম। এই প্রথমবার ইশরাত বলল, টেলিমেডিসিনে আর কুলোচ্ছে না। আলট্রাসাউন্ড লাগবেই। আবারও পড়লাম চক্করে। দুটো প্রতিবেদন নেগেটিভ না হলে কোথাও আলট্রাসাউন্ড হবে না। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দেন যাঁরা, তাঁরা অ্যাম্বুলেন্স দিতে রাজি, তবে শর্ত হলো রোগের কথা বলা যাবে না। আমি এবারও সিদ্ধান্ত নিলাম ঘরে বসে থাকব। ভাগ্য আমার সহায় ছিল, বেঁচে গেছি।

অথচ সবার কপাল আমার মতো নয়। মারা গেছেন অনেকেই। আইসোলেশনে থাকা অবস্থাতেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের মৃত্যুসংবাদ শুনেছি, সানবিমস স্কুলের অধ্যক্ষ নীলুফার ম্যাডাম হাসপাতালে খবর পেলাম (পরে তিনি মারা যান)। শুনলাম দেশের সেরা ধনী এস আলম গ্রুপের এক সদস্য মারা গেছেন। এক ভেন্টিলেটর দুই ভাই ব্যবহার করছিলেন। একজনকে বাঁচানো যায়নি। গণস্বাস্থ্যের কিট আমি সুস্থ থাকার সময় আবিষ্কৃত হলো, সেটা আটকেই রইল। স্বাস্থ্য খাতে উন্নতির কত গল্প আমরা শুনি, আমাদের যা কিছু দীনতা, সব বেরিয়ে এল এবার—ভালো হলো, না মন্দ, তা নিয়ে তুলনামূলক বিচারে বসলাম। সম্পাদক স্নেহ করে বিপ্লবী বলেন আমাকে, সত্যিই মনে হলো স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে একটা বিপ্লব এবার করেই ফেলতে হবে।

সারা রাত ঘুম হতো না, অসুস্থ অবস্থায় গান গাইলে কেমন শোনায়, তার রেকর্ড রাখলাম। বুঝলাম দম পাই না।' গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে'—এই এক লাইন গাইতে দু-তিনবার দম নিতে হলো।

করোনাকালে আরও জানলাম, অনেকেই ভালোবাসেন আমাকে ও আমার পরিবারকে। ‘আনা কারেনিনা’ পড়তে মন চায় লিখেছিলাম, এক বড় ভাই পিডিএফ পাঠিয়ে দিলেন, খোঁজখবর নিয়েছেন অনেকে, সবার কাছে কৃতজ্ঞ আমি। এখন এই কোভিড-১৯ অতিক্রম করে বুঝতে পারি জীবন বড় সুন্দর।

আমার মুক্তি আলোয়-আলোয়
ঈদের আগে একটি টেস্টের রেজাল্ট পেলাম নেগেটিভ। তবু অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরোনোর অনুমতি পেলাম না। অপেক্ষা আরও একটি টেস্টের। আকিফ অবশ্য এর মধ্যেই দুবার দরজার কাছে চেয়ার দিয়েছিল। মাস্ক পরে ওখানে বসে একনজর দেখেছিলাম মেয়েদের। ঈদের দিনও ভিডিও কলে কথা হলো। পরদিন দ্বিতীয় টেস্টের রেজাল্টও নেগেটিভ এল। বাইরে বেরিয়ে এসে মেয়ে দুটোকে ছুঁয়ে তবে শান্তি পেলাম।

অবরুদ্ধ জীবন থেকে ছাড়া পেলেই কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত হয়ে যেসব পুলিশ সদস্য মারা গেছেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলব ঠিক করে রেখেছিলাম। বললাম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা কার্টুনিস্ট কিশোর ও ফটোজার্নালিস্ট শফিকুল ইসলামসহ পাঁচজনের ওপর লেখাটা অনেক দিন ধরে ঝুলে আছে। শফিকুল ভাইয়ের ছেলে মনোরম পলক দু-তিন দিন খুদে বার্তা দিয়ে জানিয়েছিল বাবাকে নিয়ে ও ভীষণ চিন্তায় আছে। টানা তিনটি প্রতিবেদন লিখলাম, আরও লিখলাম উপসর্গ দেখা দিলে কোথায় যেতে হবে, চিকিৎসা হবে কোথায়, সেই শিরোনামেও।

নিজের ইচ্ছায় কাজে যোগ দিয়ে বুঝলাম, আমি এখনো যথেষ্ট শক্ত নই। আবারও ছুটিতে গেলাম ছয় দিনের। ৪ জুন আমাদের গোটা পরিবারের আইসোলেশনের মেয়াদ শেষ হলো। সবাই মিলে ছাদে উঠলাম। মনে মনে গাইলাম, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে।’

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন