করোনা রোধে কাজ করছেন বস্তির ১০ নারী

সুখী, হাসি, স্বর্ণা, কল্পনা, শাহনাজ, শারমীন, বাসনা, আফসানা ও রীনা নেমেছেন ভিন্ন এক সংগ্রামে। বিভিন্ন বয়সী মেয়ে ও নারীদের এ দলের সদস্যরা সবাই রাজধানীর কল্যাণপুর বস্তিতে থাকেন। আর করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কল্যাণপুর বস্তিতে এই নারীরাই অন্য বস্তিবাসীর শরীরের তাপমাত্রা মাপা, জ্বর থাকলে তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া, ত্রাণ বিতরণসহ অন্যান্য কাজগুলো করছেন।
শরীরের তাপমাত্রা মাপাসহ অন্যান্য বিষয়ে এই নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন নামের বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা, রক্তদান কার্যক্রম, নিরাপদ পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে। আর গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই ১০ নারী বস্তির ৫০০টি পরিবারের তথ্য নেওয়া, অটোমেটেড মেশিনে ব্লাড প্রেশার মাপা, ইনফারেড থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপছেন। এ ছাড়া নিয়মিত হাত ধোয়াসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ পেয়ে এই নারীরাই এখন অন্যদের সচেতন করছেন। এই নারীদের অনেকে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট চিকিৎসক শেখ মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম বললেন, বস্তির যে নারীরা একটু শিক্ষিত, ইংরেজি পড়তে পারেন তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের এই দুর্যোগে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই নারীদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য গ্লাভস, মাস্ক, অ্যাপ্রোনসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আর এই নারীরা বস্তিতে বসবাস করেন, ফলে তাঁদের জন্য বস্তিতে কাজ করাটাও তুলনামূলক সহজ।
১০ নারীর একজন স্বর্ণা আক্তার। মুঠোফোনে কথা বলার সময় নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্বর্ণা জানাল ত্রাণ কারা পাবে তার লিস্ট করছে সে। করোনাভাইরাস বিস্তারে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্বর্ণার এ কাজ করতে গিয়ে ভয় লাগে কি না জানতে চাইলে বলল-‘ভয় তো লাগেই। তবে ভয় পাইলে তো চলব না। আমরা পাশে না থাকলে বস্তির মানুষের পাশে আর কে দাঁড়াবে? আর বস্তির একজনও যদি করোনাভাইসে আক্রান্ত হয়, তখন তো আমরাও বাঁচতে পারব না।’
এই বস্তিতেই স্বর্ণার জন্ম । বাবা রিকশা চালান। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে স্বর্ণা সবার বড়। স্বর্ণা বলল, ‘বস্তিতে ভয়ে কেউ ঢুকতে চায় না। ত্রাণ দেওয়ারও সাহস করে না। হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ভাইয়া আপুরা সাহস করে এ সময়ও কাজ করছেন। ভাইয়া আপুরাই আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।’
স্বর্ণাসহ দলের অন্যরা বস্তিতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেন। তবে এ কাজ করতে গেলে বস্তির অনেকেই গালি দেন, ‘ভুয়া ডাক্তার’ বলেন এবং অনেকে বলেন ত্রাণ তো দেবেই না উল্টো ত্রাণ মেরে দেওয়ার ধান্দা করছে বলেন বলে জানাল স্বর্ণা।
এই ১০ নারীর কাজের সমন্বয় করছেন হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক বিবিএ পাস করা নাদিয়া আফরিন। তিনি থাকেন ইস্কাটনে। সুরক্ষার কথা চিন্তা করে স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা নাদিয়াকে কাজটি করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। তবে নাদিয়া বললেন,‘মানুষের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল সব সময়। তাই করোনাভাইরাস বিস্তারের এই সময় মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইনি। ইস্কাটন থেকে কল্যাণপুরে যাওয়ার ঝক্কি আছে। অনেক সময় বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষের জন্য কিছু তো করতে পারছি।’

নাদিয়া জানালেন, বস্তির ৫০০টি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আপাতত কাজ হচ্ছে। কারও জ্বর থাকলে তাঁকে ঘরে আলাদা থাকার জন্য বলা হচ্ছে। বস্তির মানুষ এটুকু বুঝতে পেরেছেন যে একজনও যদি আক্রান্ত হন তাহলে অন্যরাও আর নিরাপদ থাকতে পারবেন না। অন্যরা সচেতন বলেই কাজ করা সহজ হচ্ছে।
হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা জানালেন, এই নারী কাজের জন্য কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না। তবে ৫০০ পরিবার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে এক মাসের খাবার পাচ্ছে। এই ১০ নারীর পরিবারও এ সহায়তা পাবে।
গত ১১ বছর ধরে সুখী বেগম কল্যাণপুর বস্তিতে বসবাস করছেন। তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে সব থেকে ছোটজনের বয়স মাত্র ১৯ মাস। দাবি করলেন, শত্রুতা করে এক মামলায় তাঁর স্বামীর নাম ঢুকিয়ে দেওয়ায় স্বামী বর্তমানে কারাগারে আছেন।
সুখী বেগম বললেন,‘ সংসারের কাজ রাত্রেই শেষ কইরা রাখি। দিনের বেলায় বস্তির ঘরে ঘরে যাই, মানুষের তাপমাত্রা মাপি। ভাইয়া আপুরা দেখাই দিছেন কত দূরে দাঁড়াইয়া কাজটা করন লাগব। আগে বুঝতাম না, এখন বুঝি-বস্তির একজনেরও যদি এই রোগ হয় তো আমরাও বাচুম না।’
হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম বললেন, ‘বস্তির নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকার তাগিদে অথবা ত্রাণ সংগ্রহ করতে প্রতিনিয়ত বাইরে যাচ্ছেন। ঘরে খাবার না থাকলে এই মানুষগুলোকে ঘরে থাকার কথা বলাও যাবে না। তাপমাত্রা মাপা, করোনা সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট জায়গায় পাঠিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন কাজ করছি। তবে আমাদের সামর্থ্যও খুব বেশি না। স্পৃহা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় মাত্র ৫০০ পরিবারের এক মাসের খাদ্যসামগ্রীর সংস্থান করতে পেরেছি। তবে বস্তির অন্য পরিবারগুলোর সুরক্ষার জন্য অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’