গবেষণার ফলাফলের বিষয়ে বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শেখ রোমানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের অবস্থা বেশি ভয়াবহ। অন্যান্য দেশের একজন শ্রমিক ঝামেলায় পড়লে স্বয়ং সরকারের লোকজন গিয়ে সেখানে হাজির হয়। আর বাংলাদেশি শ্রমিকদের ফাঁসি হলেও সরকারের কিছু আসে যায় না। তাঁরা শুধু দেখে কত রেমিট্যান্স আসছে।

দেশে ফেরত আসা ৬৫৫ নারী অভিবাসী শ্রমিকের ওপর গত বছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালনা করে ইফপ্রি। এই অভিবাসীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরের বাসিন্দা।

গবেষণা অনুসারে, নারী শ্রমিকদের প্রায় ৫৯ শতাংশ ফিরেছেন করোনার সংক্রমণ শুরুর পর। বাকি ৪১ শতাংশ ফিরেছেন এর আগে (২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মার্চ)। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর ১১ শতাংশের ধারণা, করোনার কারণে তাঁদের চুক্তি কমিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাকিরা ফিরেছেন অন্যান্য কারণে।

দেশে ফিরে নারী শ্রমিকের ৫৩ শতাংশ আর কাজ খোঁজার চেষ্টা করেননি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আর ২৬ শতাংশ চেষ্টা করেও কাজ খুঁজে পাননি।

গবেষণার তথ্য বলছে, নারীদের মধে৵ প্রায় ৪৩ শতাংশ ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে, ২৩ শতাংশ জর্ডান, ১১ শতাংশ লেবানন থেকে। তাঁদের ৭০ শতাংশ ছিলেন আবাসিক গৃহকর্মী, ২০ শতাংশ গার্মেন্ট কর্মী। অংশগ্রহণকারী শ্রমিকের ৩৭ ভাগ বিদেশে ছিলেন মাত্র এক থেকে দুই বছরের মতো সময়। আর ২৬ শতাংশ অবস্থান করেছেন এক বছরের কম সময়।

ফেরত আসা নারী শ্রমিকের ৪১ শতাংশের বিদেশে কোনো নারীবন্ধু ছিল না বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন নিউজিল্যান্ডের লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাজমুন নাহার। তিনি বলেন, নারী শ্রমিকেরা বিদেশে গিয়ে ঘরে আবদ্ধ থাকেন। দীর্ঘ সময় কাজ করেন। এটা আধুনিক দাসত্ব।

কর্মশালায় প্যানেল আলোচনা হয়। তা সঞ্চালনা করেন ইফপ্রি–এর গবেষক মুজনা আলভি। আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নমিতা হালদার ও বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের (বিএনএসকে) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম।

সাদেকা হালিম বলেন, অন্যান্য দেশ নারী শ্রমিক পাঠানোর আগে তাঁদের ওপর যে বিনিয়োগ করে, বাংলাদেশ সরকার ততটা করে না। বিদেশে পাঠানোর আগে ভাষার ওপর কিছুটা জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যৌন–শোষণ সম্পর্কে শেখানো হচ্ছে না। এটা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কারণে হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের বাহিরে পাঠানোর আগে মানসিকতায় থাকে যে তাদের কাজের জন্য পাঠানো হচ্ছে। কাজের বাইরে অন্য কিছু আর প্রাধান্য পায় না।

সৌদি আরবের প্রসঙ্গ টেনে সাদেকা হালিম বলেন, কোনো শ্রমিক তাঁর কর্মস্থল থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও গেলে তিনি অবৈধ হবেন না। কারণ, সেখানে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক ধর্ষণের সাজা হয় না।

পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নমিতা হালদার বলেন, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ভারতের গৃহকর্মীরা যেভাবে পুলিশে কল করে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের মেয়েরা তা করেন না বলে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পুলিশ। অভিযোগ করতে না চাওয়ার কারণটা ভাষাগত দক্ষতা না থাকা। ভাষা একটি সম্পদ।

নমিতা হালদার আরও বলেন, নারী শ্রমিকদের সঠিকভাবে বিদেশে পাঠাতে হলে দেশের দালালদের একই ছাতার নিচে আনতে হবে। সে জন্য তাঁদের শিক্ষিত করতে হবে। অন্যান্য দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো দর–কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিকের বেতন বাড়াতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের এজেন্সিগুলো পারে না। তাঁর দাবি, প্রতিটি দেশের মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো যোগাযোগ করলে নিগৃহীত কর্মীদের উদ্ধার করা আরও সহজ হবে।

সুমাইয়া ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নারী অভিবাসী গৃহকর্মীরা বুঝে উঠতে পারেন না কখন বিশ্রামের সময় আর কখন কাজের সময়। এ জন্য সৌদি আরবে হোস্টেল সুবিধা চালু করা দরকার। সেখান থেকে শ্রমিকেরা বাসায় গিয়ে কাজ করবেন।

সুমাইয়া ইসলাম আরও বলেন, সরকার নারী শ্রমিকদের বিনা মূল্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মেয়েদের এখন আওয়াজ তুলতে হবে। যাওয়ার জন্য শ্রমিকদের উল্টো টাকা দিতে হবে। তাঁদের পাসপোর্ট ও প্রশিক্ষণসহ নানা বিষয়ের খরচ শ্রমিক গ্রহণকারী দেশকে বহন করতে হবে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন