সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের শর্তে বিনা করে বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ দেওয়া হলেও রাস্তার অবস্থা মলিন। সম্প্রতি রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে
সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের শর্তে বিনা করে বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ দেওয়া হলেও রাস্তার অবস্থা মলিন। সম্প্রতি রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়েছবি: দীপু মালাকার

শব্দের কারসাজি করে বিলবোর্ড ভাড়া দেওয়ার কারণে পাঁচ বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৬২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। কাজটি করেছেন দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারাই, যা ধরা পড়েছে সরকারি নিরীক্ষায়।

সরকারের আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী এলইডি সাইনের (ডিজিটাল বিলবোর্ড) বার্ষিক কর প্রতি বর্গফুট ২০ হাজার টাকা। কিন্তু দক্ষিণ সিটি ডিজিটাল বিলবোর্ডকে ‘এলইডি স্ক্রিন’, ‘কার্টেইন’ ইত্যাদি নাম দিয়ে প্রতি বর্গফুট ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় ২৪ হাজার ৭১৩ বর্গফুট ডিজিটাল বিলবোর্ড বরাদ্দ দেয়। এ ক্ষেত্রে কোনো দরপত্র ডাকা হয়নি। কত দিনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা-ও নির্দিষ্ট করা হয়নি।

আদর্শ কর তফসিলে উল্লেখ নেই, এমন কোনো খাতে কর নির্ধারণের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অবশ্য দক্ষিণ সিটি অনুমোদনের ধার ধারেনি। তারা আগে বিলবোর্ড বরাদ্দ দিয়েছে, তারপর একাধিকবার চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয়কে আদর্শ কর তফসিল সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি।

এই কারসাজির সঙ্গে দক্ষিণ সিটির চাকরিচ্যুত সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারসহ আরও কয়েকজন এবং সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের ঘনিষ্ঠজনেরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিকে দক্ষিণ সিটিতে মেয়র হিসেবে শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এলইডি বিলবোর্ডগুলোকে প্রতি বর্গফুট ২০ হাজার টাকা করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত

বিলবোর্ড বরাদ্দে শব্দে কারসাজি শুরু হয় ২০১৫ সালে। ওই বছর এপ্রিলে দক্ষিণ সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়ে লোহা বা স্টিলের কাঠামোর ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড অপসারণের ঘোষণা দেন সাঈদ খোকন। পুরোনো বিলবোর্ড সরিয়ে বসানো হয় ডিজিটাল এলইডি বিলবোর্ড।

সিটি করপোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী করপোরেশনের নিজস্ব জায়গায় এলইডি সাইন স্থাপনে প্রতি বর্গফুটের জন্য বছরে ২০ হাজার টাকা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গার জন্য ১০ হাজার টাকা কর দিতে হয়। এর বাইরে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) রয়েছে।

ডিএসসিসির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ২৫ থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তড়িঘড়ি করে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলোর কর ধার্য করে দক্ষিণ সিটি। বিলবোর্ডের নাম পরিবর্তন করে বলা হয় ‘ডিজিটাল স্ক্রিন প্রজেকশন’, ‘ডিজিটাল কার্টেইন’, ‘ডিজিটাল মাল্টিভিশন’।

- ডিজিটাল বিলবোর্ডের ভাড়া প্রতি বর্গফুট ২০,০০০ টাকা। এলইডি স্ক্রিনে তা ৮০০-১১০০ টাকা।
- বিষয়টি নিয়ে দুদক তদন্ত করছে।
-এখন ভাড়া দেওয়া হচ্ছে প্রতি বর্গফুট ২০ হাজার টাকা করেই।

ডিজিটাল স্ক্রিনের বার্ষিক কর ডিএসসিসির নিজস্ব জায়গায় প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ১০০ টাকা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় ৫৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ডিজিটাল কার্টেইনের ক্ষেত্রে নিজস্ব জায়গায় প্রতি বর্গফুট ৮০০ টাকা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় ৪০০ টাকা ধরা হয়।

নাম পরিবর্তন করে কর নির্ধারণের দুই দিনের মাথায় ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘ডিজিটাল টেক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে শাহবাগ ও বাংলামোটরে দুটি বিলবোর্ড বরাদ্দ দেয় ডিএসসিসি। এরপর দেওয়া হয় অন্যদের।

কারসাজি করে কম টাকায় বিলবোর্ড বরাদ্দের বিষয়ে ডিএসসিসির চাকরিচ্যুত প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার ৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর ৮০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি কমিটি অনুমোদন দিয়েছে, যেটা এলইডি বিলবোর্ড, ২০ হাজার টাকার, সেটা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আমরা ডিজিটাল প্রজেক্ট...কী একটা নামে দেওয়া হয়েছে, এখন মনেও নেই।’

উল্লেখ্য, ইউসুফ আলী সরদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক।

নিরীক্ষায় ধরা

দক্ষিণ সিটির ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব গত নভেম্বরে নিরীক্ষা করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদপ্তর। এতে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম টাকায় বিলবোর্ড বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। বলা হয়, ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে কম টাকায় বিলবোর্ড বরাদ্দ ১৬২ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

দক্ষিণ সিটি এভাবে মোট ১২টি প্রতিষ্ঠানকে বিলবোর্ড বরাদ্দ দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার বর্গফুট বরাদ্দ পাওয়া মেসার্স জনতা এন্টারপ্রাইজের মালিক সৈয়দ ওমরান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘করপোরেশন যে হার নির্ধারণ করে দিয়েছিল, আমরা সে হারেই কর পরিশোধ করেছি।’

দুটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন থেকে বরাদ্দ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তি দামে বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ দেয়। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাড়তি নেওয়া হয় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে করোনাকালে বিজ্ঞাপনে ভাটা পড়েছে।

বরাদ্দ পাওয়া বাকি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে টিসিএল অপটো ইলেকট্রনিকস, বৈশাখী ট্রেডার্স, মিডিয়া ভিশন, জি-টেক, ডিজিটাল টেক, ভিশন ওয়ার্ল্ড, অ্যাড ওয়ার্ল্ড, নুর ট্রেডার্স, টপটেন মার্ট, বেস্ট ওয়ান ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। নিরীক্ষায় বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৭৪ লাখ থেকে ৪২ কোটি টাকা পর্যন্ত কম আদায় হয়েছে।
দক্ষিণ সিটির মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে দুদক থেকে কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল। তা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বরাদ্দের পর অনুমোদনের আবদার!

শব্দে কারসাজি করে কম টাকায় বিলবোর্ড বরাদ্দের মাস দেড়েক পর দক্ষিণ সিটি ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়। এতে কর তফসিলে ডিজিটাল স্ক্রিন ও ডিজিটাল কার্টেইনকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করা হয়। মন্ত্রণালয় তা করেনি।

default-image

দক্ষিণ সিটি তিন বছর পর আবার ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এতে তফসিল সংশোধনের পাশাপাশি যেদিন থেকে কম টাকায় বিলবোর্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকেই সংশোধনী কার্যকরের আবদার করা হয়। একই বিষয়ে ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল আরেকটি চিঠি দেয় ডিএসসিসি।

অবশ্য দক্ষিণ সিটির তফসিল সংশোধনের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি করপোরেশন-১) নুমেরী জামান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রস্তাব অনুমোদনের উপযোগী নয় বলেই মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি।

তবু রাজস্ব বকেয়া

কম দামে বিলবোর্ড বরাদ্দ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভাড়ার টাকা পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি দক্ষিণ সিটি। সংস্থাটি রাজস্ব বিভাগ সূত্র বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরে বিলবোর্ড ভাড়া বাবদ ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।

চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে নির্ধারিত কর কমিয়ে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কেউ ঘটাতে না পারে।
ইকবাল হাবিব, স্থপতি

রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বকেয়া টাকার বিষয়টি অমীমাংসিত। করপোরেশন অনুমোদনের তারিখ থেকে কর হিসাব করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো কর দিতে চায় বিলবোর্ড চালুর দিন থেকে। প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে হিসাব করছে, তাতে বকেয়া থাকে না। কিন্তু অনুমোদনের সময় শর্ত ছিল, তিন মাসের মধ্যে তারা ব্যবহার শুরু না করতে পারলে জানাতে হবে। কেউ করপোরেশনকে এটি জানায়নি।

আগে ৮৮ হাজার, এখন ২২ লাখ

চলতি অর্থবছর থেকে বিলবোর্ডগুলোকে আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী ‘এলইডি সাইন’ হিসেবে ভাড়া দিচ্ছে দক্ষিণ সিটি। এখন পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠান বার্ষিক ২০ হাজার টাকা কর দিয়েও বরাদ্দ নবায়ন করেছে।

এর মধ্যে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে ৯৬ বর্গফুটের একটি বিলবোর্ড নবায়ন করেছে বেস্ট ওয়ান নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কাছ থেকে দক্ষিণ সিটি এখন পাচ্ছে ২২ লাখ টাকার বেশি, যা আগে ছিল ৮৮ হাজার টাকা। বেস্ট ওয়ানের বিপণন ব্যবস্থাপক মামুন শিহাব প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছরে প্রতি বর্গফুট ২০ হাজার টাকা ভাড়া হিসেবে অনেক। তবে বিজ্ঞাপনদাতাদের অনুরোধে নবায়ন করেছি।’

প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে হিসাব করছে, তাতে বকেয়া থাকে না। কিন্তু অনুমোদনের সময় শর্ত ছিল, তিন মাসের মধ্যে তারা ব্যবহার শুরু না করতে পারলে জানাতে হবে। কেউ করপোরেশনকে এটি জানায়নি।

দুটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন থেকে বরাদ্দ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তি দামে বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ দেয়। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাড়তি নেওয়া হয় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে করোনাকালে বিজ্ঞাপনে ভাটা পড়েছে।

সার্বিক বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে নির্ধারিত কর কমিয়ে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা কেউ ঘটাতে না পারে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন