কার্জন হলে 'রুটিফল' গাছ

বিজ্ঞাপন
default-image

গাছটির বাহারি সবুজ পাতার অগ্রভাগ দেখতে হাতের আঙুলের মতো। লম্বায় ৫০ ফুটের কাছাকাছি। সুন্দর–সুবিন্যস্ত ঘন পাতার কারণে ভরদুপুরেও চারপাশে নিবিড় ছায়া তৈরি হয়ে আছে। বিশেষ করে পাতার বৈশিষ্ট্যর কারণে বাগানের আরও অনেক গাছের ভেতর থেকে এই গাছটিকে খুব সহজেই আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বাগানে লাগানো এই বৃক্ষটির নাম ‘রুটিফলগাছ’। ইংরেজি নাম ব্রেডফ্রুট ট্রি। বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus communis। গ্রিক শব্দ আরটস অর্থ রুটি আর কারপাস অর্থ ফল। বিশেষ করে তাহিতি, হাওয়াই ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে এই গাছের ফলের বহুল ব্যবহার আছে। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২৩১ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঐতিহাসিক নৌ–বিদ্রোহের গল্প। 

১৭৬৮ সালে ইংরেজ নাবিক জেমস কুক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাংকস ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির জাহাজে চড়ে এক অনুসন্ধানমূলক ভ্রমণে বের হন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নতুন কোনো গাছের সন্ধান ও ক্রীতদাসদের জন্য সস্তা কোনো খাদ্যের খোঁজ বের করা। ওই অভিযানেই ফরাসি পলিনেশিয়া অঞ্চলের তাহিতি দ্বীপে তাঁরা এ গাছটির সন্ধান পান। গাছটিতে প্রচুর ফল ধরে; এবং অসাধারণ খাদ্যগুণসমৃদ্ধ এই ফল খেয়েই ওই দ্বীপের বাসিন্দারা জীবনধারণ করতেন। 

পরে ইংল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে আনা ক্রীতদাসদের খাবার হিসেবে এই ফল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন সম্রাট তৃতীয় জর্জ। জেমস কুক ও জোসেফ ব্যাংকসের প্রাথমিক অভিযানের ১৯ বছর পর তিনি এই গাছ আনার দায়িত্ব দেন লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ব্লাইকে। তবে গাছ, ফলসহ ব্লাই তাঁর ফিরতি যাত্রায় বিদ্রোহের মুখে পড়েন। দ্বীপের বাসিন্দারা তাঁকেসহ আরও ১৯ নাবিককে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। পরে এই কাহিনি অবলম্বনে ১৯৬২ সালে মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি নামের একটা বিখ্যাত চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, যাতে অভিনয় করেন মার্লোন ব্র্যান্ডো, ট্রেভর হাওয়ার্ড ও রিচার্ড হ্যারিসের মতো বাঘা বাঘা অভিনেতা। এই ছবিটি ষাটের দশকে ঢাকার মধুমিতা হলেও মুক্তি পেয়েছিল। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগানো গাছটি শ্রীলঙ্কা থেকে আনা। ২০০০ সালের গোড়ায় এটা শ্রীলঙ্কা থেকে নিয়ে আসেন এয়ার কমোডর (অব.) জিয়ারত আলী। রোপণ করেন ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সরকারি বাসভবনে। তবে ২০০৩ সালে বাসা ছেড়ে দেওয়ার সময় তিনি এটা উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগকে উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যোগাযোগ করেন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সঙ্গে। 

default-image

অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, দুটি শর্তে জিয়ারত আলী গাছটি দিতে চেয়েছিলেন। প্রথম শর্তটি ছিল গাছে ফল ধরলে তাঁকে খেতে দিতে হবে। আর ভবিষ্যতে এই গাছের একটা চারা তাঁকে দিতে হবে। ২০০৫ সালে গাছে প্রথমবারের মতো ফল আসার পর একটা শর্ত পূরণ হয়েছে। তবে পরে তিনি আর চারা নিতে চাননি।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক জানান, এই গাছের ফল দেখতে অনেকটা চাপালিশ কাঁঠালের মতো। পাতলা আবরণ উঠিয়ে ফলটি কাঁচা, পুড়িয়ে, শুকিয়ে গুঁড়ো করে রুটির মতো বানিয়ে কিংবা রান্না করেও খাওয়া যায়। সুষম খাদ্যের সব ধরনের উপাদান ফলটিতে আছে। স্বাদ অনেকটা মিষ্টি আলুর মতো। সাধারণত আগস্টের শুরু থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত একটা বড় আকারের গাছে পাঁচ শতাধিক ফল ধরে। তবে শেষ পর্যন্ত খাওয়ার উপযোগী দেড়–দুই শর মতো ফল পাওয়া যায়। ফল ধরে শাখার অগ্রভাগে। 

বাংলাদেশে দুর্লভ এই গাছের ফলে কোনো বিচি নেই। চারা হয় গাছের মূল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাগানো গাছটি থেকে এ পর্যন্ত দুটি চারা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটা চারা লাগানো হয়েছে বাগানের দক্ষিণ পাশে। অন্য চারাটি বাঁচেনি। 

শ্রীলঙ্কা বাদেও বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে। এর আগে মালয়েশিয়া সরকারও এই ফল উৎপাদনে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। 

অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছটি ২০০৫ সাল থেকে টানা ফল দিয়ে যাচ্ছে। তার মানে বাংলাদেশের আবহাওয়া–জলবায়ু গাছটি বেড়ে ওঠার উপযোগী। এ ক্ষেত্রে এখানেও এর বাণিজ্যিক চাষ হতে পারে। 

এই গাছের ঔষধি গুণও চমৎকার। রুটিফলের পাতার ক্বাথ উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্ট উপশম করে। জিহ্বার প্রদাহে পাতা বেঁটে প্রলেপ দেওয়া হয়। এর কষ চর্মরোগ উপশমে বিশেষ উপকারী। অনেক এলাকায় রুটিফল দিয়ে ক্যান্ডি, চিপস, এমনকি মিষ্টি আচারও তৈরি হয়। এ ছাড়া পাখি ধরার ফাঁদ হিসেবে রুটিফল গাছের আঠার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের প্রাঙ্গণ বাদেও কুমিল্লার বার্ড, ফার্মগেটের খামারবাড়ি ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি রুটিফলগাছ আছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন