ছোট বোনের বয়স ৬৯। তিনি দেখাশোনা করবেন বলে গত ৬ এপ্রিল বড় বোন আর দুলাভাইকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। বড় বোনের বয়স ৭৮। আর দুলাভাইয়ের বয়স অন্তত ৮৮, তবে এ নিয়ে একটা মধুর বিতর্ক আছে।

ঢাকায় শ্যামলীর বাড়িতে আপা-দুলাভাইকে দেখভালের কেউ ছিল না। তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডায়। অবশিষ্ট মেয়েটি বৃদ্ধা শাশুড়ি, দুই বাচ্চা আর স্বামীকে নিয়ে উত্তরায় থাকেন। লকডাউনে সেটা দূরদেশে থাকার মতোই।

ছোট বোন রাশেদা নাসরীনের দুই সন্তানও যুক্তরাষ্ট্রনিবাসী। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে ৩২ বছরের পুরোনো গৃহ ‘সহকারী’ শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী এক নারীকে নিয়ে তাঁর একার সংসার। তাঁর অবশ্য আরেকটি বড় সংসার আছে। সেটার সদস্য প্রায় ৫০০ জন।

এই তিন প্রবীণের সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়াটা নিতান্তই কোভিডকালীন কাকতাল।

মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আদাবরে শেখের টেকের এক বাড়িতে গিয়েছিলাম কয়েকজন তরুণের সঙ্গে আলাপ করতে। তাঁরা লকডাউনের শুরু থেকে বিভিন্ন এলাকায় রোজগার হারানো মানুষদের যথাসাধ্য সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছেন।

সাধারণ মানুষদের ছোট-বড় সহায়তানির্ভর উদ্যোগগুলো যে কটি পরিবারকে পারে চাল-ডাল-আলু, সাবান, ওষুধ, কখনোবা নগদ টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। যে বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেখানে উদ্যোক্তাদের একটি দল রমজান মাসে ডিম-খিচুড়ি রান্না করিয়ে রোজ ৪০টির বেশি পরিবারকে এক বেলা খাইয়েছে। ঈদের দিন ৭৫০ জনকে খাইয়েছে মুরগির তেহারি।

ফেসবুকে যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর এমন সব গল্প পরে কখনো বলব। তবে এক গল্পের সুতোয় জড়িয়ে আরেক গল্প আসে। আমার আজকের গল্পটার শুরু যেমন সেদিনের স্বেচ্ছাসেবকদের আড্ডা থেকে। আড্ডায় ফেরদৌস আহমেদ মানুষের সহযোগিতা পাওয়ার প্রসঙ্গে রাশেদা নাসরীনের নাম করলেন।

একটু পরেই মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে ফেরদৌস আমাকে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন—‘রাশেদা আপা’। থতমত খেয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করি। রাশেদা বললেন, তিনি ভালো আছেন। তবে বাসায় প্রবীণ আপা-দুলাভাই আছেন। দুজনই ওপেন-হার্ট সার্জারি করা হৃদ্‌রোগী। তাঁদের ভালো রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন।

প্রশ্ন করে তিনজনেরই বয়স ৬৯, ৭৮ আর ৯০ জেনে আমি চমৎকৃত। কে কাকে দেখে? রাশেদা হেসে বলেন, ‘আমরা একজন আরেকজনকে দেখি।’

সেদিন রাশেদার ভাঙা ভাঙা নরম কণ্ঠস্বর শুনে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল। পরে ফেরদৌসের মুখে শুনলাম, তিনি আগারগাঁওয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি স্কুল চালান। করোনাকালে সেখানেও সহায়তা করছেন।

দুদিন পর রাশেদাকে ফোন করে জানতে চাই, সব সতর্কতা মেনে একবার তাঁর বাসায় গিয়ে কথা বলতে পারি কি না। তিনি বললেন, সংক্রমণের ভয় তিনি করেন না, তবে নিজের কথা বলতে নারাজ। অনেক অনুরোধ করে বলি, তাঁদের গল্পটা অনেককে সাহস দেবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি রাজি হলেন।

default-image

কোভিডকালে দেখা
কথামতো গত ১২ মে সকালে ইকবাল রোডের সুনসান এক গলিতে ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটির সামনে হাজির হই। আমাকে ঢুকিয়ে দ্বাররক্ষী বড় বড় কোকের বোতলে রাখা জীবাণুনাশক দিয়ে আমার জুতা শোধন করলেন। স্যানিটাইজার ঢেলে হাত ধোয়ালেন।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই দরজায় যিনি দাঁড়িয়ে, তাঁর বয়স বোঝা কঠিন। ছিপছিপে কর্মঠ চেহারার মানুষটি। রাশেদার মুখের হাসি নিমেষে আমাকে আপন করে নিল।

বসার ঘরের বড় জানালার বাইরে ভারি সুন্দর এক ছাদবাগান। একদেয়াল বই আর সাদামাটা সোফা পাতা ছোট ঘরটি সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে। টুক টুক করে হেঁটে এলেন দুলাভাই মো. নূরুল হক।

সাদা পায়জামার ওপর সুতির সাদাকালো ছাপা শার্ট পরনে, মাথায় ঘিয়ে রঙের জালি টুপি। চিবুক ঘিরে একগুচ্ছ সাদা দাড়ি, যার মধ্যখানে একটু কালোর ঝিলিক। দুলাভাইয়ের চোখে-মুখে প্রশান্তির হাসি। এসে বসলেন আপা, সাদা জমিনে মেরুন-কালো লতাপাতা ছাপা শাড়ি পরা ফরিদা হক। মাথায় আঁচল টানা, সরল মুখটিতে ভারি সরল হাসি।

সালোয়ার-কামিজ ছেড়ে রাশেদা মুগা সুতার নকশা বোনা ঘন নীল রঙের একটা শাড়ি পরে এলেন। আঁচল গুছিয়ে বড় সোফায় বোনের পাশে বসতে বসতে বললেন, শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাকে ঘরের বাইরে দেখা দিতে মন চায় না।

মুখোশ পরে তিন প্রবীণের সঙ্গে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব রেখে কথা বলছি। হাত টান টান করে ফোন ধরে ভিডিও করছি। ফেসবুকের ভাষায়, কীএ্যাক্টা অবস্থা। হায় রে! সামনে আরও অনেক দিন এভাবে সজাগ সতর্ক থেকে মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে।

কৌতূহল ছিল, আলাপের শুরুতেই তাই আগারগাঁওয়ের স্কুলের ইতিবৃত্ত জানতে চাই। তবে রাশেদার এই বড় পরিবারের গল্প পুরোপুরি বলার জন্য কোভিডের বিদায় আর স্কুল খোলার অপেক্ষা করতে হবে।

default-image

শিকড়ে আলোক
ঢাকা উইমেন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপনা করতেন রাশেদা। ব্যক্তিগত জীবনে দুই ছেলেমেয়েকে গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিল। এরই মধ্যে ১৯৯৮ সালে ছুটি নিয়ে দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রে শিশুশিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করে সেখানকার স্কুলে চাকরি করে এসেছেন। ২০০৩ সালে দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন।

তবে, বলেন তিনি, ‘নাগরিক হওয়ার জন্য আনুগত্য প্রকাশ করে সাধ মিটে গেল।’ গোড়াতেই রাশেদা বুঝেছিলেন, ‘আমেরিকা আমার জন্য নয়। বাংলাদেশের সীমানা পার হলেই আমার মন খারাপ লাগে। ’

ইতিমধ্যে তিনি কলেজটির অধ্যক্ষ হয়েছেন। প্রশাসনিক কাজ ভালো লাগত না। অবসরে কী নিয়ে থাকবেন, সেই ভাবনাও ছিল। আফজালুন্নেসা ফাউন্ডেশনের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ২০০৪ সালে আগারগাঁও বিএনপি বস্তিতে তেরপল টাঙিয়ে পাঁচটা বাচ্চা নিয়ে শুরু করলেন ‘আলোক শিক্ষালয়’।

কার্যত অবৈতনিক স্কুলটিতে আজ শিশু থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ জন ছেলেমেয়ে পড়ছে। গত বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পাস করেছে ৩৪ জন। সপ্তাহে পাঁচ দিন টিফিন দেয় স্কুল। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠা ছেলেমেয়েদের অন্য স্কুলে পড়তে পাঠায়। শিক্ষকেরা বিকেলে তাদের পড়ান। স্কুলটির বৃত্তি নিয়ে দুটি ছেলে ডাক্তার হয়েছেন।

সবটা কাজ চলছে শুভানুধ্যায়ীদের অনুদানে, দুলাভাই তাঁদের একজন। বন্ধু-স্বজন নিয়ে আলোক পরিষদ করেছেন রাশেদা। একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে প্রায় ৪০ জন শুভার্থী যুক্ত আছেন। তাঁর ছেলে ২০০৮ সালে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগামী’ নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত সহায়তা পাঠান।

মা বলেন, তাঁর সব কাজে ছেলে আছেন, ‘যার জন্য আমার খুব একটা শক্তি পেছনে।’ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীষ্মে ছেলেমেয়ের কাছে যান রাশেদা। বছরের বড় সময়টা কাটে দেশে তাঁর ভালোবাসার কাজে।

শুভার্থীদের নিয়ে গড়া আলোক শিক্ষালয়ের কমিটিতে রাশেদা সম্পাদক এবং স্কুলের পরিচালক। কলেজে তাঁর ১৭ বছরের কর্মজীবন শেষ হয়েছে ২০০৯ সালে। তারপর ব্র্যাকের শিক্ষা কর্মসূচিতে কাজ করেছেন। পাশাপাশি নিরন্তর চলেছে আলোক গড়ার কাজ।

গত ১৮ মার্চ থেকে স্কুলে করোনার ছুটি চলছে। শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা রিকশা চালান, গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করেন, মাটি কাটেন, বাসাবাড়িতে কাজ করেন; কেউ হয়তো দারোয়ান বা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। করোনাকালে তাঁরা আয়-রোজগার হারালেন।

রাশেদা শুভার্থীদের কাছে আবেদন জানালেন, ‘আমি চাই না যে আমার এই বাচ্চাগুলি না খেয়ে থাকুক বা স্কুল থেকে হারিয়ে যাক।’ সহায়তা এল। তা দিয়ে চারবার ৪২৬ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে নিয়মিত রসদ দিয়েছে স্কুল। ঈদের জন্য ছিল বিশেষ রসদ।

শিক্ষার্থীদের ভালোবাসেন রাশেদা, ‘কোভিডে ওরা যে খাবার পাবে না, আমার তো জানা ছিল।’ আর তিনি ভাবলেন যে স্কুলের অভ্যাস করাতেই ১৫ বছর লেগেছে। এখন এই অভ্যাসটা তো নষ্ট হয়ে যাবে!

১৯ জন শিক্ষক বরাবর দল ভাগ করে শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে খোঁজখবর-তদারক করতেন। স্কুলের কাছে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মুঠোফোন নম্বর ছিল। গত এপ্রিলের গোড়ায় স্থির হলো, শিক্ষকেরা ফোনে নিজ নিজ দলের শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একবার পড়ালেখার কাজ দেবেন। যথাসম্ভব কাজ আদায় করবেন।

এভাবে কোভিডকালের স্থবির সময়েও রাশেদার জীবন বাইরে আলোকের আপনজন, আর ঘরে দুই প্রবীণতর স্বজনকে ভালো রাখার কাজে সদা ব্যস্ত। আলোক পাড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ি তাঁদের ঘরের জীবনে।

default-image

তাঁরা তিনজন
বয়স নিয়ে শ্যালিকা-দুলাভাইয়ের রঙ্গ বড় আনন্দ দিল। রাশেদা বললেন, দুলাভাইয়ের বয়স ৯০। দুলাভাইয়ের প্রতিবাদ, নাহ্, ৮৮। চোখের কোনায় হেসে শ্যালিকা অতঃপর বললেন, ‘দুলাভাই দাবি করেন, তাঁর বয়স...। ’দুলাভাই ‘অশ্বত্থামা হত—ইতি গজ’ বলার মতো করে বলেন, ‘অফিশিয়াল...’!

কোভিডকালে আপা-দুলাভাইকে নিজের কাছে আনার গল্পটা বলতে গিয়েও রাশেদার চোখ হাসে, ‘দুলাভাই কিছুতেই আসবেন না। উনি একটু, কী বলব, কবি প্রকৃতির মানুষ। তাঁদের তো বিশাল বড় বাড়ি আছে শ্যামলীতে। কিন্তু শূন্য পরিবার।’

নূরুল হক আর ফরিদা হকের প্রবাসী চার ছেলেমেয়ে পালা করে বছরজুড়ে বাবা-মায়ের কাছে থাকেন। কোভিডের জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁদের উত্তরানিবাসী সংসারী মেয়েটির সঙ্গে পরামর্শ করে রাশেদাই দেখভালের দায়িত্ব নিলেন।

রাশেদা বলেন, ‘আপা বলল, তুই চলে আয়। আমি বললাম যে তোমাদের বাসায় গিয়ে কাজটা করব কিন্তু আমি। আমি যতটুকু তোমাদের চেয়ে সামর্থ্যবান। ’তাঁর গৃহ-সহকারীও অন্য বাসায় গিয়ে স্বচ্ছন্দ হতেন না।

দেখি দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন লাল-কালো ছাপা শাড়ি পরা তাঁর ৩২ বছরের গৃহ-সহকারী। শুনতে বা কথা বলতে পারেন না, মুখভর্তি হাসি নিয়ে অস্পষ্ট শব্দ করলেন। রাশেদা বললেন, ‘নাম বলছে—মাশু’। আরও বললেন, মাশু নিজের পরিসরে নিজের মতো করে কাজ করতে পছন্দ করেন।

নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দুলাভাই ও পাশের সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে পিঠ টান টান করে বসে ছিলেন। হাসিমুখে বললেন, শ্যালিকার বাসায় এসে ভালো লাগছে, ‘মহা আদরে আছি। আপন বোনও এতখানি করে না। ঝগড়াও করি দুইজনে। তার ব্যক্তিত্বও আছে, আমার ব্যক্তিত্বও আমি ছাড়ি না।’

পাশে বসা বোনের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে নরমসরম আপা মৃদু নম্র গলায় বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। খুবই ভালো লাগছে। নিশ্চিন্ত মনে আছি।’ বোন যোগ করেন, ‘নিজের সংসারটা মিস করেন...। ’

রাশেদারা ১৫ ভাইবোন। বেঁচে আছেন ১০ জন, ছয়জনই যুক্তরাষ্ট্রনিবাসী। ৯০ বছর বয়সী বড় ভাই শ্যামলীতে নিজের বাড়িতে শয্যাশায়ী। ঢাকায় আছেন দুই বোন, এক বোন কুমিল্লায়।

সবার আগে মারা গেছেন একাদশ ভাইটি। চলে গেছেন আরও দুই ভাই। মেজ ভাই প্রয়াত কাজী আকরাম হোসেন সত্তর ও আশির দশকের প্রথম ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের তুখোড় নেতা ছিলেন। সিপিবির একজন নেতার কাছে তাঁর ‘ভূমিপুত্র’পরিচয়, নিষ্ঠা, বাগ্মিতা আর গানের গলার কথা শুনেছি।

সাত বোনের মধ্যে বড় আর মেজ মারা গেছেন। ফরিদা হক রাশেদার ‘সেজ আপা’। রাশেদা ভাইবোনের মধ্যে নবম, আর বোনদের মধ্যে চতুর্থ। জন্মদাত্রী মা তাঁকে আট বছরের রেখে মারা যান।

রাশেদা আর ছোট ভাইবোনেরা তখন বড় ভাইয়ের কাছে ছিলেন। রাশেদা বলেন, ‘ভাই আর বাবা আমাদের যেভাবে আগলে রেখেছেন, আমরা মা ডাকিনি, এ ছাড়া বাকি সব পেয়েছি। ভালোবাসাও পেয়েছি প্রচুর আমরা।’

সেজ আপা বিয়ের পর ১৯৫৯ সাল থেকে স্বামীর কর্মস্থল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে ছিলেন। দেশে ফেরেন ১৯৭৩ সালে। রাশেদা বলেন, ‘আপা যখন আসেন, তখন থেকেই আমাদের মনে হতো যে এত দিন পরে আমরা আমার মাকে পেলাম।’

বয়সে প্রায় ১০ বছরের বড় বোনটিকে বরাবরই তিনি মায়ের আসনে রেখেছেন। রাশেদা বলেন, ‘আগে তো কোনো উপলক্ষ হয়নি। আপারা কেন সংসার ছেড়ে আসবেন? তারপর যখন আপারা এ রকম বিপদে পড়লেন, তখন আমি ভাবলাম যে আমার একটা সুযোগ হলো।’

এইখানে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে গলা বুজে আসে। আপার দিকে একঝলক তাকিয়ে রাশেদা বলেন, ‘মলিন হয়ে গেছেন। এত দুর্বল হয়ে গেছেন! কিন্তু মনের উৎকণ্ঠা তো নাই! মনে হচ্ছে, যা কিছু ঘটবে, আমার সামনেই ঘটবে।’

রাশেদারও বয়স হয়েছে, ‘অনেক দুর্বল অবস্থায়’ আছেন। কিন্তু বলেন, ‘তারপরও আমার মনে অনেক সাহস আছে যে আমি তো তা-ও কাছে যেতে পারব, দাঁড়াতে পারব কিছু হলে। আমার কিছু হলে আমি আপাকে সামনে দেখতে পারব!’

অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের অন্য বাসিন্দারা প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। তিনি বলেছেন, জীবন আর কদিনের, ‘আমি অন্তত আমার বোনকে এই সময় আনতে পারব না কোভিডের জন্য? সেটা আমি পারব না।’

default-image

গৃহবন্দী জীবন
স্ত্রীকে দেখিয়ে দুলাভাই বললেন, বয়স হলে একজনকে ছাড়া অন্যজনের থাকা খুব কষ্ট। গেলে একসঙ্গেই চলে যাওয়া ভালো।

কিন্তু মৃত্যুর ছায়ার চেয়ে বড় সত্য, রোজকার জীবনের ছন্দ। রোজার মাসজুড়ে শেষ রাতে রাশেদা আর মাশু সাহ্‌রি করে আপা-দুলাভাইয়ের ভোরের কফির জন্য ফ্লাস্কে গরম পানি আর মুড়ি-বিস্কিট গুছিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন।

দুলাভাই বলেন, ভোরে উঠে নামাজ পড়ে হালকা নাশতা সেরে স্ত্রী কোরআন শরিফ পড়তেন। তিনি আরেক দফা ঘুমিয়ে নিতেন। নয়টা-সাড়ে নয়টায় রাশেদা ও মাশু উঠলে নাশতা করতেন। তারপর টিভি দেখা, ল্যাপটপে ছবি দেখা।

দুপুরে গোসল করে নামাজ পড়ে ভাত খেয়ে আবার ঘুম। বিকেলে টিভির ধর্মীয় আলোচনা শুনে সন্ধ্যায় ছোলা-মুড়ি আর লোনা শরবত দিয়ে ইফতার। তাঁদের গৃহবন্দী ছিমছাম শান্তির রুটিনের অনেকটা সময় যায় গুগল করে নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে আর গল্পসল্প করতে।

রাশেদার কাছে অবশ্য অনবরত ফোন আসে, ম্যাসেঞ্জার আর ই–মেইলে যোগাযোগের কাজ চলে। আলোক শিক্ষালয়ের ব্যবস্থাপনা, কখনো স্বেচ্ছাসেবকদের খোঁজখবর করা, সাধ্যমতো সহায়তা পাঠানো—কাজ তাঁর একটি নয়।

তাঁরা তিনজন নিজেদের কাপড় নিজেরা কাচেন। দুলাভাই গোসল শেষে বাথরুম ধুয়ে বেরোন। মাশু ঘরদোর পরিষ্কার করেন, রান্নার জোগাড় দেন। রাঁধেন রাশেদা। দুলাভাই যৎকিঞ্চিৎ ভোজনরসিক।

গত মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহেও আপা-দুলাভাই এখানে ছিলেন। দুলাভাই তখন একা একা বেরিয়ে পড়তেন। এখন সবার বেরোনো নিষেধ। আপার গাড়ির চালক টুকটাক জিনিসপত্র এনে দেন। রাশেদা কাছের সুপারশপে ফোন করে সদাই আনান। এ ছাড়া আপার ঢাকাবাসী চিকিৎসক বড় জামাই খোঁজখবর করেন।

বাসাটি ঘুরিয়ে দেখান রাশেদা। তিন শয়নকক্ষের একটিতে মাশু আর একটিতে তিনি থাকেন। বড়টিতে থাকছেন আপা-দুলাভাই। সেটার বারান্দার সামনে খোলা ছাদবাগান। রাশেদা আমাকে বলেন, ‘গাছে আম হয়েছে, দেখো!’

ঘরে বিছানায় বসে আপা কাপড় ভাঁজ করছেন। রাশেদা বলছিলেন, তাঁরা আপাকে খুব জ্ঞানী মানুষ বলে জানেন,‘আপা পড়াশোনা এত করেন, এত মনে রাখতে পারেন! আমার বই ঘেঁটে ঘেঁটে আপাই বেশি পড়েন।’

খাবার ঘরের বড় বইয়ের তাকের পাশে একটি ফ্রেমে কয়েকটি ছবি। ভারতের খড়গপুরে আইআইটিতে সমাবর্তনে রাশেদার ছেলে আর যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মেয়ে; মেয়ে আর পুত্রবধূ; শাশুড়ি। কোনায় বাঁকা হয়ে আছে রাশেদার অল্প বয়সের প্রাণোচ্ছল চেহারা।

রাশেদার ছেলে তানজিম আহসান আর মেয়ে তমালিকা আহসান পেইক—দুজনই ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন। ছেলে কাজ করেন ব্রডকম করপোরেশনে। মেয়ে আর তাঁর দক্ষিণ কোরীয় বংশোদ্ভূত স্বামী ডাক্তার।

খাবার ঘরে টিউববাতির কাঠের ফ্রেম একদিকে ঝুলে পড়েছে। রাশেদা দুলাভাইকে ডাকেন, ‘এটা সোজা করতে পারবেন?’ বৃদ্ধ বলেন, ‘পারতাম, কিন্তু...।’ শ্যালিকা বলেন, ‘মই দিয়ে তো ঠিক করে দেয়, এখন এটা আমাকেও শিখতে হবে!’

ছাদের এজমালি বাগানটা দেখাচ্ছিলেন রাশেদা। কখন এসে দাঁড়িয়েছিলেন দুলাভাই। বললেন, ‘রিটায়ার্ড লাইফ। একজনের হইল (রাশেদাকে দেখান) রিটায়ার্ডের উপরেও মোস্ট অ্যাকটিভ লাইফ।’

রাশেদা এশিয়াটিক সোসাইটি আর বাংলা একাডেমির সদস্য। আরও কয়েকটি সংগঠনে যুক্ত আছেন। কোষগ্রন্থসহ কয়েকটি সংকলনে তাঁর লেখা আছে। লেখাপড়ায় লম্বা ছেদের পর ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। অনুবাদ করতে ভালোবাসেন।

রাশেদাদের বাবা কাজী মোজাম্মেল হোসেনও ইংরেজির ছাত্র ছিলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনার্স পড়তে পড়তে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে জেলে গিয়েছিলেন। পরে স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন, মারা যান ১৯৭৭ সালে।

default-image

কোভিডের পর
দুলাভাই নূরুল হকের ধারণা, কোভিড-১৯-এর ফলে পৃথিবীটা সম্পূর্ণ বদলে যাবে। ধীরে ধীরে যুদ্ধবিগ্রহ কমে যাবে। জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং প্রকৃতির সুরক্ষা বেশি গুরুত্ব পাবে। সুন্দর একটা পৃথিবী গড়ে উঠবে।

তিনি গুটিবসন্ত আর কলেরার মহামারি দেখেছেন। সেগুলোর ফলে দুনিয়াটা কি বদলেছে? আলোজ্বলা চোখে দুলাভাই বলেন, ‘অনেকটা বদল হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক গবেষণা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক উন্নতি করেছে। গড় আয়ু মানুষের বাড়ছে না?’

তাঁর বিশ্বাস, কোভিডের বিশ্বজোড়া অভূতপূর্ব তাণ্ডবের মুখে স্বাস্থ্যসেবা আর গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়বে। প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগ কমে যাবে। নয়তো বিশ্ব টিকে থাকতে পারবে না। কারণ, এমন আজাব আরও আসতে পারে।

আর দুলাভাই বললেন, ‘কো–অপারেশনের দিকে যাবে সব জাতি। মানে ওয়ান ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট। বার্ট্রান্ড রাসেল যেটা লিখে গেছিল না?’ ১৯৫০ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে তিন বছর পড়াশোনা-প্রশিক্ষণের সময় তিনি রাসেলের বইগুলো পড়া শুরু করেন।

এই ব্রিটিশ দার্শনিকের বিরাট ভক্ত তিনি। বললেন, ‘খুব ভালো লাগে আমার এসব বই পড়তে।’ দুঃখ করলেন, বইগুলো হারিয়ে গেছে আর চোখের সমস্যার জন্য তাঁর পড়াও কমে গেছে।

মানুষটি বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজে চাকরি করেছেন। স্বাধীন দেশে ফিরে ১৯৭৪ সালে অবসরে যান। তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার পুনর্গঠনে শ্রম দিয়েছেন। সাত বছর লিবিয়ায় চাকরি করেছেন। জিজ্ঞাসা করি, তাঁর বিশ্বাস হয় যে মানুষ এত ভালো হবে? তাঁর উত্তর, ‘হইতে বাধ্য। পরিস্থিতি বাধ্য করবে।’

কোভিড অন্তে মানুষ আর পৃথিবী অনেক ভালো হয়ে যাবে, সে আশা করতে রাশেদারও ভালো লাগে। তবে তিনি বলেন, ‘যখন চলছে, তখনো মানুষ এত নির্মমভাবে এত দুষ্কৃতি করছে, এত নির্মমভাবে অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে কার্পণ্য করছে, তখন মানুষ কীভাবে এটা সেরে গেলে ভালো হবে—আমার বিশ্বাস হয় না।’

নিজের জীবনে রাশেদা দেখেছেন, মানুষের জীবনে পরিবর্তন ঘটানো খুব সহজ কথা নয়। একটু ভেবে তিনি বললেন, ‘মানুষ তার এই বিপর্যয় থেকে শিখুক, কীভাবে উঠে আসা যায়। তার সাথে মানুষের যে সম্প্রীতি, সহানুভূতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা—সেগুলো আস্তে আস্তে মানুষ আত্মস্থ করুক। সেইটা আশা করতে হবে আমাদের।’

দুলাভাই কিঞ্চিৎ বিতর্ক তুলতে চাইছিলেন। রাশেদা অভিভাবকের গলায় বললেন, ‘এখন গোসল করতে যান। নামাজের টাইম আসছে।’

‘করোনাবিজয়’
মে মাসের শেষ দিকে আগারগাঁও এলাকায় গিয়েছিলাম। দু–তিনজন রিকশাচালককে আলোক শিক্ষালয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই চিনলেন। একজনের দুই বাচ্চা সেখানে পড়ে। গতকাল তিনি সেখান থেকে ঈদের রসদ নিয়ে এসেছেন।

ঈদের দুদিন আগে আলোকের ফেসবুক পাতায় পড়লাম, টেলিফোনে পড়াশোনার কাজটি এগোচ্ছিল না। এমন চললে স্কুল শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও দায়িত্ব নেবে না—এই ঘোষণার পর গতি আর উৎসাহ এসেছে। শিক্ষকেরা ঈদের বোনাস আর বাড়তি ফোনবিল পেয়েছেন। তাঁরা খাদ্যসহায়তাও পেয়েছিলেন।

সৃষ্টিকর্তার কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাশেদা লিখেছেন, এই সাফল্য ‘করোনা-বিজয়ের’ছোটখাটো একটি প্রতীক। আমার মনে পড়ে যায়, তিনি আমাকে বলেছিলেন, জীবনে যখন যা পান, সেটাকে কেন্দ্র করেই ঘুরতে থাকেন, ‘তখন আমার আর দুঃখটা থাকে না, বা আফসোসটা থাকে না।’

দুঃখ–কষ্ট, উৎকণ্ঠা আর মনখারাপের এই কোভিডকালে সেদিন এই তিন প্রবীণের ছায়ায় খুব শান্তি পেয়েছিলাম। তাঁরা সুস্থ থাকুন, নিশ্চিন্ত থাকুন, শান্তিতে থাকুন, মানুষের পাশে থাকুন। নিশ্চয় আমাদের আবার দেখা হবে।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন