বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘আমি সকালে বিদায় দিলাম, চিরবিদায় হয়ে গেল’

নাঈমের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায়। তার বাবা শাহ আলম ঢাকার নীলক্ষেতে বইয়ের ব্যবসা করেন। শাহ আলমের দুই ছেলের মধ্যে নাঈম ছোট। শাহ আলম কামরাঙ্গীরচরের ঝাউলাহাটি চৌরাস্তা এলাকায় পরিবারসহ বাস করেন।

আহত নাঈমকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে খবর পেয়ে উপস্থিত হন তার বাবা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তিনি হাসপাতালের চেয়ারে বসে রয়েছেন। তাঁর ছোট ছেলেটি ২০-২৫ গজ দূরের একটি ঘরে শুয়ে আছে। নটর ডেম কলেজের ইউনিফর্ম পরে সে বেরিয়েছিল। বাবার তখন অপেক্ষা কাফনের কাপড় গায়ে পরিয়ে ছেলেকে নিয়ে ফেরার।

শাহ আলমকে ঘিরে তখন মানুষের ভিড়। কিন্তু তাঁর সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি শুধু কাঁদছেন আর মৃত ছেলের উদ্দেশে অবিরাম কথা বলে যাচ্ছেন। বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘বলেছিলে না, বাবা, আমাকে আর হাত ধরে পার করে দিতে হবে না? আমি একাই পারব। আহ! আমার পাখিটা! আমি সকালে বিদায় দিলাম, চিরবিদায় হয়ে গেল?’

সন্ধ্যা সাতটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে নাঈমের লাশ নিয়ে কামরাঙ্গীরচরের বাসায় যায় তার পরিবার। সেখানে জানাজার পর বুধবারই নাঈমের মরদেহ লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঘটনায় মামলা হয়নি।

‘আমি বাঁচতে চাই’

নটর ডেম কলেজের কয়েক শ শিক্ষার্থী গতকাল নগর ভবনের সামনে উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভকালে নাঈমের মৃত্যুকে হত্যা উল্লেখ করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিতের দাবি করে। এ সময় তাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। অনেকের বুকে-পিঠে লেখা ছিল ‘আমি বাঁচতে চাই’। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস (আমরা ন্যায়বিচার চাই)’।

একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে নগর ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে। তবে ভবনের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। এরপর বেলা তিনটার দিকে তারা স্লোগান দিতে দিতে দুর্ঘটনাস্থলে চলে যায়। সেখানে তাদের অবস্থানকালে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে নটর ডেম কলেজের ছাত্র পরিচালক ফাদার সুশান্ত গোমেজসহ তিন শিক্ষক ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।

সুশান্ত গোমেজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এ ঘটনায় তোমরা যেমন ব্যথিত হয়েছ, আমরাও হয়েছি। তোমরা যেমন সহপাঠীকে হারিয়েছ, আমরাও সন্তানের মতো শিক্ষার্থী হারিয়েছি। তার (নাঈম) বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তোমাদের যে চাওয়া, তোমাদের যে আবেগ, তোমাদের যে অবস্থা, আমরা বুঝতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে।’

default-image

শিক্ষকদের কথায় সড়ক ছেড়ে দেওয়ার আগে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে ছয়টি দাবি জানায়—১. মানুষের পাশাপাশি সব প্রাণীর জন্য সড়ক নিরাপদ করতে হবে। ২. ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পর পাস হওয়া সড়ক আইন বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। ৩. নাঈমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. নাঈমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৫. গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম সড়কে পদচারী-সেতু স্থাপন করতে হবে। ৬. সব ধরনের ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী মকিব সরকার প্রথম আলোকে বলে, ‘নাঈম লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব নিত। সে তো আর নেই। আমরা চাই সিটি করপোরেশন যেন তার পরিবারের দায়িত্ব নেয়।’

দক্ষিণ সিটির তদন্ত কমিটি

পুলিশের মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আটক রাসেল গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। তবে ওই গাড়ির নির্ধারিত চালক তিনি ছিলেন কি না, সেটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

অবশ্য ডিএসসিসির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করছেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন হারুন অর রশিদ, যিনি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। সূত্র জানায়, সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সময় ডিএসসিসিতে বিপুলসংখ্যক অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাঁরা এখন অফিস সহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের কাউকে কাউকে ময়লা পরিবহনের গাড়ির চালক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এদিকে নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সংস্থার প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সিতওয়াত নাঈমকে।

দক্ষিণ সিটির মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের প্রথম আলোকে বলেন, কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ডিএসসিসি এক বিজ্ঞপ্তিতে গত রাতে জানায়, নাঈমের সন্তানহারা পিতা-মাতাকে সান্ত্বনা দিতে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তাঁদের কামরাঙ্গীরচরের বাসায় যান। তিনি বলেন, ‘আমার নিজেরও দুই সন্তান। নিজেই উপলব্ধি করি, এটা কী রকম বেদনাদায়ক, মর্মান্তিক ঘটনা।’ তিনি বলেন, এই ঘটনায় কোনো অন্যায় বরদাশত করা হবে না।

ছয় মাসে সড়কে ঝরেছে ৩,২২২ প্রাণ

ঢাকার কুর্মিটোলায় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাসচাপায় দুই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে। তাদের দাবির মুখে ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর সরকার শাস্তি বাড়িয়ে নতুন সড়ক আইন সংসদে পাস করে। তবে সড়কে মৃত্যু কমছে না।

দুর্ঘটনার পরপরই চালকের লাইসেন্স না থাকা, যানবাহনের ফিটনেস না থাকা, সহকারীর হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব থাকা, কিশোর চালকদের হাতে দুর্ঘটনার বিষয়গুলো বেরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, দেশে চলতি বছরের গত জুন পর্যন্ত ৬ মাসে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ২২২ জন।

নটর ডেমের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান গতকাল বিক্ষোভকালে প্রথম আলোকে বলে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর শুধু নতুন আইন হলো, আর তো কিছু হলো না।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন