বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বছর দুই আগেও জান্নাতের পরিবারের পরিস্থিতি এমন ছিল না। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে নিজেদের বাড়িতে একটা ছোট্ট উঠান ছিল। যার সীমানা দেওয়া হয়েছিল তিনটি লিচু, দুটি কাঁঠাল আর সারি সারি সুপারিগাছ দিয়ে। সেখানে বসে থাকলে পথের দু-একজন পথচারীর দেখা পাওয়া যেত। শিশুটি কখনোই সুস্থ ছিল না, তবে অভাবের ভেতরও একটা সুস্থ পরিবেশ ছিল গৌরীপুরে। ঘর আর উঠানে গড়াগড়ি করেই দিন ফুরিয়ে দিন আসত শিশুটির। শরীরে লেগে থাকত উঠানের ধুলোমাটি, পথচারীর পায়ের ধুলো, কফ আর জীবাণু নয়; যা এখন জান্নাতের অধিকাংশ দিনের জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে।

গৌরীপুরের সেলিনা আর তরিকুল দম্পতি ছিল ভাগচাষি। ফসলের মৌসুমে মানুষের বাড়ির গৃহস্থালি কাজ করে সেলিনা কোঁচড় ভরে নিয়ে আসতেন মুড়ি। বছর শেষে দুটি নতুন কাপড়। এ দম্পতির প্রথম সন্তান জান্নাত। জন্মের পরপরই কিছু বোঝা যায়নি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হতে শুরু করে ওর একেকটি সীমাবদ্ধতা। ভালো করে বসা শিখল না, দুবছরেও ডাকতে শিখল না। তখন বোঝা গেল আসলে শিশুটি স্বাভাবিক শিশুদের মতো নয়। সাধ্য অনুযায়ী অভাবী পরিবারটি চিকিৎসক, কবিরাজ সবই করতে করতে একসময় হাল ছেড়ে দিল।

বড় সন্তানটি অসুস্থ বলে দ্বিতীয় সন্তান আবদুল্লাহর জন্ম অনেক দিন পরে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাঁদের টিকতে দিল না গৌরীপুরে। এই পরিবারটির ভাগ্যে জমা ছিল এক ভয়ংকর সংকটের কাল, যখন দারুণ এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হলো তাদের। তরিকুলের গল্পটা হয়ে গেল বিখ্যাত উপন্যাস ‘সিটি অব জয়’ বা ‘আনন্দ নগরী’র মতো। ফরাসি লেখক দোমিনিক লাপিয়ের ৬৭ বছর আগে লিখেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুলিয়ার হাসারি পাল আর অলকা দম্পতি স্বপ্ন দেখে কলকাতায় এসে ঠাঁই নেওয়ার গল্প ও করুণ পরিণতির কথা।

default-image

গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজার পদচারী–সেতুর ওপর অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও জান্নাতের মা ফিরছিলেন না দেখে চলে আসছিলাম। হন্তদন্ত হয়ে একটা পাঁচ টাকার কেক হাতে নিয়ে তখন এলেন সেলিনা। প্রথম আলোকে জানালেন, ‘মেয়েটা তো কথা বলতে পারে না কিন্তু ওর একটু পর পর খিদে লাগে। একটা কেক আনতে গেছিলাম। আসলে এই লুলার লগে আমি নিজেও লুলা হইয়া গেছি আপা। মাইনষের বাড়িতে কাজ করলেও পেট চালাইতে পারতাম কিন্তু একটা মুহূর্ত দূরে থাকার উপায় নাই। সংসার আর চলে না। এখন তাই সপ্তাহে দুই–তিন দিন জান্নাতরে ফুটপাতে বসায় দিই। মানুষ দয়া কইরা যদি দশ–পাঁচ টাকা দেয়। সেই টাকা দিয়া মেয়ের খাবার কিনি। গরিব, তাই সন্তানের মুখে খাবার দিতে পারব না তা তো মানতে পারি না। প্রতিবন্ধী সন্তান, তবু আমার মন চায় জান্নাতরে একটা ফল কিনা খাওয়াই। লুডুস পছন্দ কইরা খায় আমার মেয়েটা।’

সেলিনার স্বামী তরিকুল গৌরীপুর থেকে রাজধানীতে আসার সময় উঠানের জলপাই গাছটা বিক্রি করে তিন হাজার টাকা পেয়েছিলেন। সেটুকুই ছিল একমাত্র পুঁজি। ঢাকায় এসে এখন হয়েছে ভাড়ার রিকশাচালক। পাঁচ যুগের বেশি সময় আগে আনন্দ নগরীর হাসারি পালও দিনমজুর থেকে ভাগের চাষি, এরপর হয়েছিল টানা রিকশার চালক। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের সেই ব্যাপক নিষ্ঠুর অবিস্মরণীয় সমাজব্যাধি যাকে অর্থনীতিবিদেরা আখ্যায়িত করেছিলেন অনিবার্য দারিদ্র্যচক্র নামে, সেই ব্যাধির আসলে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিষাক্ত তিক্ত কালচক্রে তখনো যেমন বলি হয়েছে হাসারি পালের মতো লাখ লাখ মানুষ, এখনো এর ব্যতিক্রম ঘটে না তরিকুল শেখদের ভাগ্যে।

প্রথম আলোকে মুঠোফোনে তরিকুল জানালেন, ভেবেছিলেন উপার্জন বাড়বে কিন্তু এ শহরে উপার্জনের চেয়ে ব্যয় বেশি। ভাড়ার রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তিন শ টাকা জমা দিতে হয় মালিককে। এই নগরে টাকা দিতে হয় ঘাটে ঘাটে, না হলে রিকশা নিয়ে নেবে। মাঝেমধ্যেই তাঁর খুব কষ্ট হয় সওয়ারি নিয়ে রিকশা টানতে। মেয়ের খাবারটুকুই জোগাড় হতে চায় না আর তো চিকিৎসা।

default-image

মহাখালীর সাততলা বস্তিতে এক রুমের ভাড়া ঘরে পরিবারের সব মানুষের স্থান হয় না। তাই গ্রামের বাড়িতে মা আর তিন বছরের শিশুসন্তানটি থাকে। নিজের সেই সন্তানের সঙ্গে দেখা হয় বাড়ি যেতে পারলে। সে–ও আরেক খরচের ব্যাপার। নিজেরই আরেক সন্তানকে সে তাই বছরে দুবারের বেশি দেখতে পারেন না। দুই বছর ধরে রিকশা চালিয়ে এখনই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তরিকুলের। মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে প্রথম আলোকে জানালেন, ‘আমার বয়স ৩১ কিন্তু দেখলে যে কেউ বলবে পঞ্চাশের বেশি। আল্লাহ আর এই ঢাকা শহরের জমিন জানে আমি কেমন কষ্টে আছি।’

সেলিনা আর তাঁর স্বামী জানতেন না দারিদ্র্য যে আরও নির্মম এক দারিদ্র্য ডেকে আনে। আনন্দ নগরীর বাঁকুলি গ্রামের হাসারি পাল আর অলকা চরিত্রের পরিণতি খুব নিষ্ঠুর ছিল। সে গল্প জানা নেই এ দম্পতির। কিন্তু ঠিক তেমনই এক পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছেন গৌরীপুর থেকে আসা তরিকুল, সেলিনা। সমাজের সেই ক্ষতের সাক্ষী ৯ বছরের প্রতিবন্ধী এক শিশুর শরীরে লেগে থাকা পথচারীদের ধুলো, ময়লা আর জীবাণু।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন