ববিতা হালদার বলেন, ‘আমার স্বামী হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বিনোদপুর রাম কু্মার উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে তাঁর ক্লাসের বয়ান রেকর্ড করানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাঁকে বারবার প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখন যেখানে থাকি, অনেক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। সব সময় মনে হয়, কেউ আমাদের তাড়া করছে। এ ঘটনার পর বাসা থেকে বের হলেই আমাকে ‘‘মণ্ডল মণ্ডল’’ বলে ডাকা হয়।’

আজকের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, ‘যেসব কথা বলার জন্য মুন্সিগঞ্জের স্কুলশিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, হুবহু একই কথা শুধু আমি নই, পৃথিবীর সব বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ বলে থাকেন।’ এ সময় জাফর ইকবাল সরকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে আমাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না?’

মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘মনে অনেক দুঃখ ও কষ্ট নিয়ে এখানে হাজির হয়েছি। আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। আমরা সব সময় শুনে এসেছি, আমাদের দেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর প্রথম ধাপ হচ্ছে, স্কুল-কলেজে আমাদের ছেলেমেয়েদের সঠিকভাবে বিজ্ঞান শেখানো। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন হৃদয় মণ্ডল। শুধু এ কারণেই তাঁকে এখন হাজতে বসে থাকতে হচ্ছে। আমার বিশ্বাস হতে চায় না যে এটি আমাদের দেশ।’ তিনি বলেন, একজন শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন, বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন; সেখানে এক ছাত্র কোনো একটি প্রশ্ন করেছে এবং শিক্ষক সেই প্রশ্নের সবচেয়ে যৌক্তিক উত্তরটি দিচ্ছেন। সে জন্য ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে হাজতে রাখা হয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব?

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, ‘সব মানুষের অংশগ্রহণ ও ত্যাগ–তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। যেসব কারণে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি করা। এখন দেশে যা ঘটছে বা ঘটতে দেওয়া হচ্ছে, স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ না করলে, রুখে না দাঁড়ালে, আমরা আবার পিছিয়ে যাব।’

সরকার ও প্রশাসনের উদ্দেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, আপনারা বুকে হাত দিয়ে নিজের কাছে প্রশ্ন করুন, যে ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য একজন শিক্ষকের কি জেলখানায় থাকা উচিত? তিনি বলেন, ‘হৃদয় মণ্ডলের সঙ্গে ছাত্রের কথোপকথনটি আমি পড়েছি। দশম শ্রেণির একজন ছাত্র কখনোই এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারে না। ছাত্রদের দিয়ে পদে পদে প্রশ্নগুলো সাজিয়ে শিক্ষককে ফাঁদে ফেলা হয়েছে।’

সাবেক ছাত্রনেতা খান আসাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের নেতা নিরোদ বরণ মজুমদার, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা মণীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির নেতা মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অরুণ কুমার গোস্বামী, নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগের সংগঠক আকরামুল হক, মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি শহীদ-ই-হাসান ও ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ প্রমুখ।

গত ২২ মার্চ রাতে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা ও ধর্মীয় গ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ এনে মামলা করেন তাঁর স্কুলের অফিস সহকারী মো. আসাদ মিয়াঁ। এরপর হৃদয় মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন