চকবাজারে জমজমাট শতবর্ষী ঈদমেলা

বিজ্ঞাপন
default-image

ঈদের ছুটিতে নাজিম উদ্দিন রোডের ফাঁকা রাস্তা হয়ে বেগমবাজারের সামনে দিয়ে চকবাজার এলাকায় ঢুকতেই চমকে গেলাম। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। নাগরদোলার কর্কট আওয়াজের সঙ্গে বিচিত্র বাদ্যযন্ত্র বাঁশির আওয়াজ। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক। ধোঁয়া উঠছে উত্তপ্ত কড়াই থেকে, ভাজা হচ্ছে পুরি, জিলাপিসহ নানান খাবার। সব মিলে উৎসবমুখর পরিবেশ। 

সকাল থেকে হরেক রকম দোকান সাজিয়ে বসলেও মেলা জমে ওঠে বিকেলের পর। চকবাজারের কয়েকটি রাস্তা ও গলিতে লোকসমাগম থাকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। স্থানীয় লোকজন জানান, শত বছরে ধরে চলা মেলাটি শুধু দুই ঈদের পর দুই থেকে তিন দিন ও মহররম মাসে এক দিনের জন্য বসে। শতবর্ষেরও অধিক সময় ধরে এ মেলা চলে আসছে রাজধানীর চকবাজারে।
মূলত ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে দোকানিরা আসেন এ মেলায়। একেবারে শুরুর দিকে ঐতিহ্যবাহী খাবারের কয়েকটি দোকান থাকলেও দিনে দিনে বেড়েছে দোকান ও পণ্যের সংখ্যা। ছুটির সময়ও যাঁরা রাজধানীতে থাকেন, তাঁরাই মূলত এসবের ক্রেতা। ঢাকার আশপাশ থেকেও অনেকে আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে।
শুক্রবার বিকেলে দেখা গেল মানুষের স্রোত চকবাজার এলাকায়। মেলায় ঢুকে প্রথমেই নজরে এল নাগরদোলা। এখানেই কথা হলো বেগমবাজারের এনায়েত করিমের সঙ্গে। বললেন, বিকেল বেলা ঘরে না বসে থেকে বন্ধুকে নিয়ে মেলা ঘুরতে এসেছেন। জানালেন, তাঁরা শুনেছেন শত বছরের অধিক সময় ধরে চকবাজারে ঈদকে উপলক্ষে করে এ মেলা চলে আসছে। তিনি নিজেও ছোটবেলা থেকে এ মেলায় আসছেন। এখন বাড়ির ছোটদের নিয়ে আসেন। বলা যায়, বংশপরম্পরায় এটি সবার কাছে প্রিয় মেলা।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘ঢাকা সমগ্র’ বইয়ের প্রথম খণ্ডে আশরাফউজ্জামানকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘ঈদের মেলা হ’ত চকবাজার এবং রমনা ময়দানে। বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত নানা রকমের। কাঠের খেলনা, ময়দা এবং ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে। কাবলীর নাচ হ’ত বিকেলবেলা।’
সেই পুরোনো ধারা বজায় রেখে এখনো চকবাজারে ঈদের মেলা বসে। আরমানীটোলা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ওয়াসিউর রহমান বলেন, ‘চকের মেলার সন্দেশওয়ালারা আসতেন নদীর ওই পার থেইকা। ওই সন্দেশের স্বাদ এখনো মুখে লাইগা আছে।’
মেলায় সবচেয়ে বেশি দেখা গেলে আচারের দোকান, যার প্রতিটিতেই ছিল ভোজনরসিকদের ভিড়। কোনো কোনো দোকানে পাঁচমিশালি আচার, চালতা-বরইয়ের মিষ্টি ও ঝাল আচার, তেঁতুল চাটনি, জলপাই চাটনি, আমড়ার চাটনি, আমফালির মতো ১৪ থেকে ১৫ পদের জিবে জল আসা সুস্বাদু চাটনির পসরা।

default-image

আজিমপুর গৃহিণী নাসরিন বেগম এসেছেন তাঁর মেয়ে অধরা ও ছেলে আলিফকে নিয়ে। নাসরিন বলেন, ‘ছোটবেলায় আব্বা আমাদের এখানে নিয়ে আসতেন। এখন আমি বাচ্চাদের নিয়ে আসি। প্রতি ঈদেই আসা হয়। দেখা যায় আশপাশে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে এখানে দেখা হয়ে যায়। মেলাটি এখন দেখা সাক্ষাতেরও জায়গা হয়ে গেছে।’
এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল আচার বিক্রেতা কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রামিজ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বললেন, কেরানীগঞ্জের কামরাঙ্গীরচরের একটি জায়গার নামই আচার ঘাট। এ মেলায় বিক্রি হওয়া সব আচারই সেখানকার। পূর্বপুরুষদের পথ ধরেই তিনি আচার বিক্রি করছেন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল আচারের দরদামও। প্রকারভেদে ৮ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে আচার ও চাটনি বিক্রি হচ্ছে।
মুড়কি, মুরলি, মাষকলাই বড়া, খই, মোয়া ইত্যাদি দিয়ে সাজানো দোকানের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। যেমন ছিল বড় ফুচকার দোকান। কোনো কিছু ছাড়াই খালি মুখে দিয়ে দিলেই স্বাদ পাওয়া যায় দারুণ। আর মচমচে শব্দটা ‘দিলখুশ’ করে দেয়।
আরও ছিল শিশুদের বাহারি সব খেলনা আর গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় রকমারি পণ্যও। এসব দোকানেও ছিল প্রচণ্ড ভিড়। বেশির ভাগ দোকানেই এক দামে খেলনা বিক্রি চলছিল। এর কারণ জানতে চাইলে এক দোকানি তাজুল ইসলাম বললেন, ‘দেখছেন কি ভিড়! এর মধ্যে দরদাম করে বিক্রি করতে গেলে সময় নষ্ট হবে, বিক্রি করাটাও কঠিন হবে। এর চেয়ে ভালো এক দামে বিক্রি করা।’
চকবাজার শাহি মসজিদকে ঘিরে চলা এ মেলায় আরও পাওয়া যাচ্ছে বাসনকোসন, রান্নার বিভিন্ন উপকরণ, মাটির তৈজসপত্রসহ বাহারী সব সামগ্রী। আজ শুক্রবার মেলার আনুষ্ঠানিক শেষ দিন হলেও মেলায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন জানালেন আগামী দু-এক দিনও তাঁরা এখানে বসবেন।

default-image

বিপুল মানুষের উপস্থিতি থাকলেও কোনো রকম বিশৃঙ্খলা শুক্রবার দেখা যায়নি। চকবাজার থানার ওসি শামীম আল রশীদ বলেন, পুরান ঢাকা ও আশপাশের মানুষ এ মেলায় বেশি আসেন। সবাই স্থানীয়, তাই আইনশৃঙ্খলার কোনো সমস্যা হয় না। তিনি জানান, ‘এ মেলার কোনো কমিটি নেই। যাঁরা বসেন, নিজের উদ্যোগেই বসেন। ঐতিহ্য অনুসারে এটি চলে আসছে বছরের পর বছর। তাই রাস্তায় বসলেও আমরা বাধা দিই না।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন