default-image

কারাগারে পাঠানোর তাগাদা দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ মোট ১২ বার চিঠি দিলেও ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেপ্তার বিতর্কিত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম প্রভাব খাটিয়ে এখনো হাসপাতালেই রয়েছেন। চিকিৎসার কথা বলে আট মাসের বেশি সময় ধরে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আছেন। হাসপাতালের প্রিজন্স অ্যানেক্স ভবনের চারতলা ভবনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে শুয়ে-বসে দিন কাটছে তাঁর।

কারাগারের এক কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালে ‘ভিআইপি সেবা’ দেওয়া হচ্ছে জি কে শামীমকে। হাসপাতালে তাঁকে নিরাপত্তা দিতে কারা কর্তৃপক্ষেরও বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। গত ৫ এপ্রিল ডান হাতের চিকিৎসার জন্য তাঁকে কেরানীগঞ্জে স্থাপিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আট মাস আগে আমরা তাঁকে হাতের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলাম। এখন শুনি তাঁর প্রেশার, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ। তবে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি তাঁকে ফেরত পাঠাতে। ফেরত না পাঠালে আমরা কী করতে পারি?
মাহমুদুল হাসান,ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারা চিকিৎসক

চিকিৎসা শেষে দুই দিনের মধ্যে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় চিঠি পাঠালেও তাঁকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। এর সন্তোষজনক কোনো জবাব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে না বলে কারা সূত্র জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
চিকিৎসার জন্য আমরা পাঠালেও ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রত্যেক মাসে চিঠি দিচ্ছি এই বন্দীকে ফেরত পাঠাতে। আমরা আর কী করতে পারি?
সুভাষ কুমার ঘোষ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার

জি কে শামীমের অসুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারা চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আট মাস আগে আমরা তাঁকে হাতের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলাম। এখন শুনি তাঁর প্রেশার, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ। তবে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি তাঁকে ফেরত পাঠাতে। ফেরত না পাঠালে আমরা কী করতে পারি?’

কারা অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, জি কে শামীমকে হাসপাতালে পাঠাতে ‘উচ্চপর্যায়ের’ তদবির ছিল। এখনো তাঁকে আরাম-আয়েশে হাসপাতালে রাখার জন্য প্রভাবশালীদের অনুরোধ রয়েছে। সাবেক আইজি প্রিজন (কারা মহাপরিদর্শক) এ কে এম মোস্তফা কামাল পাশার সুপারিশে জি কে শামীমকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।

জি কে শামীমকে ফেরত পাঠাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সর্বশেষ ৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালককে (হাসপাতাল) চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দী রোগীসহ সারা দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন ২০০ জন কারারক্ষী ও প্রধান কারারক্ষী নিয়োগ করতে হয়। এতে কারাগারে থাকা প্রায় ১০ হাজার ২৯৭ জন বন্দী ও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০ থেকে ২৫ জন বন্দীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কারা প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া বাইরের হাসপাতালে বন্দীদের চিকিৎসার বিষয়ে তদারকিসহ দ্রুত চিকিৎসা শেষে কারাগারে ফেরত আনতে বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। চিঠিতে দ্রুত জি কে শামীমকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়।

প্রত্যেক রোগীর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তাঁরাই বলতে পারবেন কেন তাঁকে (জি কে শামীম) ছাড়পত্র দিচ্ছেন না। তিনি ভিআইপি সেবা পাচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, ‘আমি বিষয়টির খোঁজ নেব
জুলফিকার আহমেদ আমিন , বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
জে কে শামীমকে হাসপাতালে পাঠাতে ‘উচ্চপর্যায়ের’ তদবির ছিল। এখনো তাঁকে আরাম-আয়েশে হাসপাতালে রাখার জন্য প্রভাবশালীদের অনুরোধ রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য আমরা পাঠালেও ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। আমরা প্রত্যেক মাসে চিঠি দিচ্ছি এই বন্দীকে ফেরত পাঠাতে। আমরা আর কী করতে পারি?’

গ্রেপ্তারের আগে জি কে শামীম কখনো নিজেকে যুবলীগের সমবায়বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন। আবার কখনো পরিচয় দিতেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে। চলতেন সামনে-পেছনে সাতজন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বড় কাজের প্রায় সবই ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠানের কবজায়। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন তাঁর কার্যালয় থেকে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজপত্র, ৯ হাজার মার্কিন ডলার, ৭৫২ সিঙ্গাপুরি ডলার, একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং মদের বোতল জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারের পর শামীমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা করা হয়। পরে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও মামলা হয়। এ মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দেশের ১৮০টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৩৭ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে শামীমের। এ ছাড়া ঢাকায় তাঁর দুটি বাড়িসহ প্রায় ৫২ কাঠা জমির মালিক তিনি।

চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে এসে প্রায় এক বছর হাসপাতালে ছিলেন ক্যাসিনো-কাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। নানা সমালোচনার মুখে গত ৭ অক্টোবর তাঁকে হাসপাতাল থেকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনকেও প্রায় এক বছর পর গত মাসে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মোটামুটি সুস্থই আছেন জি কে শামীম। তবে ২৪ ঘণ্টা এখানে তাঁর পাহারায় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি আমরা। পুরো ভবনে তিনি একাই। বেলায় বেলায় নার্স আসে প্রেশার মাপে, ডায়বেটিস মাপে, থেরাপি দেয়। অন্য বন্দীদের চেয়ে অনেক ভালো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আছেন তিনি
ইউনুস আলী, হাসপাতালে দায়িত্বরত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান কারারক্ষী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আহমেদ আমিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রত্যেক রোগীর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তাঁরাই বলতে পারবেন কেন তাঁকে (জি কে শামীম) ছাড়পত্র দিচ্ছেন না। তিনি ভিআইপি সেবা পাচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, ‘আমি বিষয়টির খোঁজ নেব।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রেশার’, ‘ডায়াবেটিস’, বুকে ব্যথা’ এ রকম নানা রোগের কথা বলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন কাটাচ্ছেন বন্দী শামীম। হাসপাতালে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন পাঁচজন কারারক্ষী ও চারজন পুলিশ।

হাসপাতালে দায়িত্বরত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান কারারক্ষী ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোটামুটি সুস্থই আছেন জি কে শামীম। তবে ২৪ ঘণ্টা এখানে তাঁর পাহারায় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি আমরা। পুরো ভবনে তিনি একাই। বেলায় বেলায় নার্স আসে প্রেশার মাপে, ডায়বেটিস মাপে, থেরাপি দেয়। অন্য বন্দীদের চেয়ে অনেক ভালো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আছেন তিনি।’

মন্তব্য পড়ুন 0