বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একপর্যায়ে বাবা জানতে পারেন, যমুনা ফিউচার পার্কের পশ্চিম পাশের ফুটপাতের ওপর ১২–১৩ বছরের একটি অজ্ঞাতনামা মেয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান এবং মৃতদেহ শনাক্ত করেন। তাঁর ধারণা, বেপরোয়া গতির কোনো গাড়ির ধাক্কায় মেয়ে মারা গেছে।

নারী কনস্টেবল নাসরিন আক্তারের উপস্থিতিতে শিশুটির লাশের যে সুরতহাল হয়েছে, সেখানেও পুলিশের মন্তব্য ছিল একই। সুরতহালে লেখা হয়েছে, ‘পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ভুক্তভোগী সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে শিশুটির মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে। এরপরও মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ লাশ বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলো।’

default-image

তবে সুরতহাল প্রতিবেদনে আরও দুটি বিষয়ের উল্লেখ ছিল। এক, শিশুর নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। দুই, শিশুর যৌনাঙ্গের ওপরের অংশ ফোলা।

আসলে কী ঘটেছিল, তা জানতে বুধবার ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা লোকজন ও কুড়াতলিতে শিশুর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। শিশুর লাশ উদ্ধার হয় যমুনা ফিউচার পার্কের উল্টো পাশে সিয়াম এন্টারপ্রাইজের সামনে। ওই এলাকায় বুধবার দোকানপাট বন্ধ থাকে। শুধু যানবাহন সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠান খোলা পাওয়া যায়। সেখানে বহু বছর ধরে কাজ করেন মো. সিদ্দিক নামের এক ব্যক্তি।

default-image

মো. সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হয় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। ওই সময় দোকানপাটের নিরাপত্তাকর্মী আর রাস্তার ঝাড়ুদার ছাড়া কেউ থাকেন না। তাঁরাই প্রথম শিশুর মৃতদেহ দেখেন। তাঁরা বলাবলি করছিলেন, শিশুটিকে একটি বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু কেউ বলতে পারেননি।

যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে বেশ কিছুটা দূরে কুড়াতলি কয়লাওয়ালাবাড়ির একটা সরু গলির ভেতর এক কামরায় মা–বাবা আর ছোট ভাই–বোনের সঙ্গে থাকত মেয়েটি। গলির দুই পাশে এমন বেশ কয়েকটি ঘর। প্রতিবেশীদের সবাই সারা দিন ভিড় করেছিলেন ওদের বাসায়। মেয়েটি কতটা চঞ্চল ছিল, কত কথা বলত—এমন টুকরা টুকরা কথার মধ্যেই থেমে থেমে শোনা যাচ্ছিল মায়ের বিলাপ।

একজন সাংবাদিক কথা বলতে চান শুনেই লিপি আক্তার নামের এক নারী এসে মেয়ের স্বজনদের শাসান। তিনি বলেন, গতকাল থানায় যা বলেছেন, সেটাই ‘ফাইনাল’ (চূড়ান্ত)। সাংবাদিক হোক আর যে–ই হোক, এর বাইরে আর কোনো কথা হবে না।

মেয়ের মা প্রথম আলোকে বলেন, মাস কয়েক আগে মেয়েটা মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আহত হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায়ই মাথা ব্যথার কথা বলত। ব্যথা তীব্র হলে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ত। গাড়িচালক বাবার টাকার অভাব। ভালো চিকিৎসকের কাছে তাঁরা নিয়ে যেতে পারেননি মেয়েকে। কবিরাজি ওষুধ খাইয়েছিলেন।

মা বলছিলেন, মৃত্যুর এক দিন আগেও মেয়ে বলেছে, ‘মা, আমি আর বাঁচব না।’ পাড়া–প্রতিবেশী, খেলার সাথিদেরও বলেছে ওর সময় আর বেশি নেই। কুড়াতলি উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। ঘুম থেকে উঠে মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা দেখেন মেয়ে বাড়ি নেই। এরপরই শুরু হয় খোঁজ। তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু আর বলতে পারেননি। ছোট মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদেছেন শুধু।

বাসার কেউই মেয়ের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। শিশুর নানি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পরই তাঁকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেই কাগজপত্র, কবিরাজের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র হাতে করেই মেয়ে বাসা থেকে বের হয়।
ঘটনাস্থলে মঙ্গলবার থানা, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রতিনিধিদল গিয়েছিল। সূত্রগুলো বলছে, তারা ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মেয়েটির মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে আজ বুধবার তদন্ত কর্মকর্তা হাসান পারভেজকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। কথা বলেননি ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমানও।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন