default-image

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, একটি আধুনিক শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য একটি করে খেলার মাঠ প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার। সে হিসাবে ঢাকার দুই সিটিতে মাঠ দরকার অন্তত ৬১০টি। কিন্তু ঢাকার দুই সিটিতে খেলার মাঠ রয়েছে ২৫৬টি। এসব মাঠের আয়তন ২০৯ দশমিক ১২ একর। সাধারণত ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি খেলার মাঠের আয়তন এক থেকে তিন একর পর্যন্ত হয়। কিন্তু ঢাকার দুই সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে অন্তত ২০টি মাঠ রয়েছে, যেগুলোর আয়তন এক একরের কম।

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, আয়তন বাদ দিয়ে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে ঢাকায় আরও বেশিসংখ্যক খেলার মাঠ প্রয়োজন। রাজধানীর জন্য করা ড্যাপের খসড়ায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য একটি করে খেলার মাঠ প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ বাস করে। সে হিসাবে ঢাকায় মাঠ দরকার ১ হাজার ৪৬৬টি।

মাঠে খেলাধুলার সুযোগের অভাবে বর্তমান প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুদূরপ্রসারী চিন্তার অভাবে ঢাকার মাঠ পর্যায়ক্রমে কমে গেছে। যখনই যাঁরা শাসন করেছেন, তাঁরা কখনো ভাবেননি তাঁদের নাতিদেরও একসময় খেলার প্রয়োজন হবে, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদেরও হাঁটার প্রয়োজন হবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ, নৈতিকতা ও সৌহার্দ্যের জন্যও মাঠের প্রয়োজন।

শিশুদের কাছ থেকে মাঠ কেড়ে নিলে তাদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে উল্লেখ করে গাজী আশরাফ হোসেন বলেন, মাঠ রক্ষার ব্যাপারে সবাইকে সোচ্চার হওয়া উচিত। ঢাকায় যে নতুন আবাসন প্রকল্পগুলো গড়ে উঠছে, সেখানে যাতে প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ রাখা হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কঠোর হওয়া দরকার।

শ্যামলী মাঠ সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নেই। মেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে নেই। তারা হাই অথরিটির পারমিশনে মেলা করে। কিন্তু কারা অনুমতি দেয়, তা জানি না।’
সৈয়দ হাসান নুর ইসলাম, উত্তর সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর

বেদখল মাঠ এখনো উদ্ধার হয়নি

ঢাকায় খেলার মাঠগুলোর বেশির ভাগই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতাধীন। কিছু মাঠ আছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার আওতায়। নগর-পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ঢাকা শহরের খেলার মাঠ নিয়ে ২০১৯ সালে একটি গবেষণা করেছিল। ‘ঢাকা শহরে বিদ্যমান খেলার মাঠের ঘাটতি ও চাহিদা পর্যালোচনা’ শীর্ষক ওই গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডে (দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ড ছাড়া) সরকারি-বেসরকারি মিলে ২৩৫টি খেলার মাঠ আছে। এর বাইরে নতুন যুক্ত হওয়া ৩৬ ওয়ার্ডে ২১টি খেলার মাঠ রয়েছে।

বিআইপির গবেষণায় আসা ২৩৫টি মাঠের মধ্যে ১৪১টি রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানায়, কলোনির মাঠ আছে ২৪টি, ঈদগাহ মাঠ আছে ১২টি। ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে গেছে। এর বাইরে মাত্র ৪২টি মাঠ আছে, যেগুলো সবাই ব্যবহার করতে পারে।

বিআইপির গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বিভিন্নভাবে দখল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠের তালিকায় এক নম্বরে ছিল উত্তর সিটির আওতাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলী ক্লাব মাঠ। গতকাল মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা গেছে মাঠে মেলা চলছে, খেলাধুলা বন্ধ। ঈদ উপলক্ষে মাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন করেছে শ্যামলী ক্লাব। মাঠটিও এই ক্লাবের দখলে।

মেলার জন্য মাঠের ভেতর বাঁশ পুঁতে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে প্রায় ৬০টি অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। বেশির ভাগ দোকান শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবির। এ ছাড়া অন্য কাপড় ও অলংকারসামগ্রীর দোকানও রয়েছে। বস্ত্র বিক্রির মেলা হলেও শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলাও বসানো হয়েছে।

খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শ্যামলী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আদাবর থানা যুবলীগের আহ্বায়ক আরিফুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো। কিন্তু রিং হলেও ফোন ধরেননি তিনি।

মেলা আয়োজনের বিষয়ে উত্তর সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শ্যামলী মাঠ সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নেই। মেলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে নেই। তারা হাই অথরিটির পারমিশনে মেলা করে। কিন্তু কারা অনুমতি দেয়, তা জানি না।’

মাঠের জায়গায় মার্কেট

বিআইপির উন্মুক্ত মাঠের তালিকায় ছিল পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠ। মাঠটির আয়তন ৭ দশমিক ৪৭ একর। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, এখানে তিনটি খেলার মাঠ একসঙ্গে যুক্ত ছিল। মাঠের চারপাশে ছিল ৩৯৪টি দোকান। মাঠের একাংশ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ও আরেক অংশ ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব ব্যবহার করত, অন্য অংশ সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। ছোট-বড় মিলে প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ খেলাধুলা করত। উন্নয়নের অংশ হিসেবে মাঠের চারপাশের দোকানগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। এসব দোকান নতুন করে বরাদ্দের জন্য মাঠের জায়গায় (পশ্চিমাংশে) পাঁচ তলা একটি মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। দোকান ছাড়াও এখানে হাঁটার রাস্তা, বসার ব্যবস্থা, গাড়ি রাখার জায়গা, রেস্তোরাঁ ও শিশুদের বিনোদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম জানান, ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করার জন্য মাঠের এক পাশে নতুন করে মার্কেট নির্মাণের কাজ হচ্ছে। তাঁর দাবি, মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। মাঠ আন্তর্জাতিক মানের হবে।

গতকাল সরেজমিনে ধূপখোলা মাঠে দেখা গেছে, উন্নয়নকাজের কারণে মাঠের আয়তন অনেক কমে গেছে। মাঠের এক পাশে একটি ক্রিকেট একাডেমিকে অনুশীলন করতে দেখা গেছে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, উন্নয়নের মধ্যে মাঠের মূল চরিত্র নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। আগে তিনটি মাঠ থাকলেও উন্নয়নের পর মাঠ হবে একটি। তাঁরা বলেন, এই মাঠে আগে তিনটি ক্রিকেট একাডেমি ও দুটি ফুটবল একাডেমি অনুশীলন করত। ফলে উন্নয়নের পর মাঠে সাধারণ মানুষের আর খেলার জায়গা থাকবে না। নাম না প্রকাশের শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, মাঠটির উন্নয়ন হচ্ছে মূলত বাণিজ্যিক স্বার্থে, মাঠের খেলাধুলার পরিবেশ প্রাধান্য পাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য, সামাজিকীকরণ, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও খেলার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঢাকায় পর্যাপ্ত মাঠ না থাকা দুঃখজনক। মাঠ তো বাড়ছেই না, উল্টো উন্নয়নের নামে উন্মুক্ত মাঠগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।
আদিল মুহাম্মদ খান, নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক

প্রতি ওয়ার্ডে চাই অন্তত একটি মাঠ

রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ড (বাড্ডা এলাকা), ২৩ নম্বর (খিলগাঁও-মালিবাগ এলাকা), ২৫ নম্বর (নাখালপাড়া), ৩০ নম্বর (ঢাকা উদ্যান এলাকা), ৩৫ নম্বর (বড় মগবাজার এলাকা), ৩৭ নম্বর (মধ্য বাড্ডা এলাকা), ৩৮ নম্বর (উত্তর বাড্ডা এলাকা), ৩৯ নম্বর (নুরেরচালা এলাকা), ৪১ নম্বর (মেরুলখোলা এলাকা) ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে (ফায়দাবাদ এলাকা) খেলার কোনো মাঠ নেই।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড (গোড়ান এলাকা), ৩ নম্বর (মেরাদিয়া এলাকা), ১৬ নম্বর (কাঁঠালবাগান এলাকা), ২২ নম্বর (গণকটুলী এলাকা), ২৫ নম্বর (লালবাগ এলাকা), ২৮ নম্বর (চকবাজার এলাকা), ৩২ ও ৩৫ নম্বর (বংশাল এলাকা), ৩৪ নম্বর (নবাবপুর এলাকা), ৩৬ নম্বর (শাঁখারীবাজার এলাকা), ৩৭ নম্বর (বাংলা বাজার এলাকা), ৪১ নম্বর (ওয়ারী এলাকা), ৪৬ নম্বর (মিল ব্যারাক অ্যান্ড পুলিশ লাইনস এলাকা), ৪৮ নম্বর (সায়েদাবাদ এলাকা), ৫০ নম্বর (পশ্চিম যাত্রাবাড়ী), ৫১ নম্বর (দোলাইরপাড় এলাকা), ৫২ নম্বর (মুরাদপুর এলাকা), ৫৩ নম্বর (পূর্ব জুরাইন এলাকা), ৫৪ নম্বর (পশ্চিম জুরাইন এলাকা), ৫৫ নম্বর (ঝাউচর এলাকা), ৫৬ নম্বর (ইসলামনগর এলাকা), ৬০ নম্বর (ইসলামবাগ এলাকা), ৬১ নম্বর (দনিয়া এলাকা), ৬২ নম্বর (কুতুবখালী এলাকা), ৬৪ নম্বর (মল্লিকপাড়া এলাকা), ৬৭ নম্বর (সারুলিয়া এলাকা), ৭১, ৭২ ও ৭৩ নম্বর (নন্দীপাড়া, দক্ষিণগাঁও এলাকা) এবং ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে (ফকিরখালি, নন্দীপাড়া ও ত্রিমোহিনী এলাকা) কোনো খেলার মাঠ নেই বলে ড্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ থাকা দরকার। খেলার মাঠ খেলা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে না। মেলা কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য খেলার মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। মাঠ যাতে ভাসমান বাজার, ট্রাক বা রিকশাস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার না করা হয়, সে ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে।

খেলার মাঠ একটি এলাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবে কাজ করে বলে জানান নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জনস্বাস্থ্য, সামাজিকীকরণ, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও খেলার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঢাকায় পর্যাপ্ত মাঠ না থাকা দুঃখজনক। মাঠ তো বাড়ছেই না, উল্টো উন্নয়নের নামে উন্মুক্ত মাঠগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে কীভাবে মাঠের সংখ্যা আরও বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন