ঢাকায় রাতের ফ্লাইওভারে বেপরোয়া ‘রক কিং গ্যাং’

শনির আখড়ার কিছু তরুণের এই ‘গ্যাং’ ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ লাইকিতেও সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

‘আটকে পড়া ফিলিং’ থেকে বেরুবার ইচ্ছা থেকে আসে গ্যাংবাজি কালচার।
প্রথম আলো

রাত হলে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজিয়ে মোটরসাইকেলে বের হয় উঠতি বয়সের বখাটেদের দলটি। দাপিয়ে বেড়ায় মেয়র হানিফ মোহাম্মদ ফ্লাইওভারে, মানুষকে উত্ত্যক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ছিনতাই করে। নিজেদের নাম দিয়েছে ‘রক কিং গ্যাং’।

রাজধানীর শনির আখড়ার গোবিন্দপুরের কিছু তরুণ মিলে এই গ্যাং বা অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছেন। চুলে অদ্ভুত রং করে এবং ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ লাইকিতে ভিডিও তৈরি ও আপলোড করে অন্য তরুণদের আকৃষ্ট করেন। দলনেতা মো. রকি (২২) অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

গত ১৬ মে সন্ধ্যার পর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে একটি কারের গতি রোধ করে চালককে গালাগালি এবং মারধরের চেষ্টা করে এই গ্যাংয়ের সদস্যরা। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে র‌্যাব। গত সোমবার রাতে শনির আখড়া থেকে এই গ্যাংয়ের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তবে দলনেতা রকি এখনো পলাতক।

র‌্যাব-৩-এর উপপরিচালক মেজর রাহাত হারুন খান প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনের কাছ থেকে ইয়াবা বড়িসহ ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা শনির আখড়া, মান্ডা, পাগলাসহ ফ্লাইওভারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ছিনতাই করেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এই দলের এক সদস্য অন্তর হোসেন মোল্লার বাবা সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর দলটির উৎপাত বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাত গভীর হলে তাঁরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এলাকায় উচ্চ আওয়াজে এবং বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালান। কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর (ঢাকা দক্ষিণের ৬২ নম্বর ওয়ার্ড) মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদও এই গ্যাংয়ের বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি। তিনি জানান, এই গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল।

৩৩ বছর ধরে গোবিন্দপুর এলাকায় আছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই বখাটেদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। পরিবারকে জানালেও তারা সন্তানদের ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়নি।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, এই দলের সদস্যরা পাবজি গেমে (অনলাইনভিত্তিক অ্যাকশন গেম) আসক্ত। তাঁরা অনলাইনে জুয়া খেলেন। ছিনতাই ও মাদক বিক্রিতেও যুক্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার যাত্রাবাড়ী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি ও মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের দ্বারা কত মানুষ ভুক্তভোগী হয়েছেন, এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার এই গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে দুজন ইমন আহম্মেদ ওরফে শুভ (২০) ও মো. সুমন মিয়া (১৯) আপন ভাই। তাঁরা বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। গোবিন্দপুরে একটি খুপরিঘরে তাঁদের বাস। তাঁদের বাবা সালাউদ্দিন শনির আখড়ায় মাছ বিক্রি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে কাজ না থাকায় দুই ছেলে বেশির ভাগ সময় এলাকাতেই থাকেন। তাঁদের মোটরসাইকেল নেই, অন্যদের মোটরসাইকেলে চড়েন। বিভিন্ন সময় তিনি ছেলেদের নিষেধও করেছেন। কিন্তু তাঁরা শোনেননি। তবে তাঁরা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন সালাউদ্দিন।

ইমন ও সুমনের মা শিউলি বেগম অবশ্য বলেন, এই গ্যাংয়ের নেতা রকি মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত। কিন্তু তাঁর দুই ছেলে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন।

ইমন ও সুমনদের বাসার কাছেই দলনেতা রকির বাসা। রকির বাবা মাজু মিয়া কাপড়ের ব্যবসা করেন। বুধবার ওই বাসায় গেলে রকির স্ত্রী রাজমনিকে ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। রকি বেকার। রাজমনির দাবি, রকি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন। দুই দিন ধরে তাঁর খোঁজ নেই।

রকির বাসা থেকে কয়েক শ গজ দূরে অন্তর হোসেন মোল্লার বাবা মোবারক মোল্লার একতলা বাড়ি। এইচএসসি পাসের পর অন্তর আর পড়েননি। ছয় মাস আগে তিনি বিয়ে করেছেন। তাঁর বাসায় গিয়ে পাওয়া যায় বড় বোন খায়রুন নাহারকে। তিনি দাবি করেন, অন্তর একটু উগ্র হলেও কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁর বাবা মোবারক মোল্লা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনো পদে নেই বলে জানান।

গ্রেপ্তার নাজমুল হাসান ওরফে সৈকতের (২০) পরিবারও থাকে গোবিন্দপুরে। নাজমুল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তাঁর বাবা নাজিম উদ্দিন বাসচালক। একই গ্যাংয়ের আরেক সদস্য গ্রেপ্তার আজহারুল ইসলাম ওরফে দোলনের (২১) বাবা শহিদুল ইসলাম বেঁচে নেই। মা ও নানিকে নিয়ে গোবিন্দপুরে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। বুধবার ওই বাসায় গিয়ে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় উঠতি বয়সী কিশোর ও তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা গ্যাং বা অপরাধী চক্র কিছুদিন পরপর বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় আসছে। টিকটক ও লাইকির জন্য ভিডিও করাকে কেন্দ্র করেও গ্যাং তৈরি হচ্ছে, যাতে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে ফাঁদেও পড়ছে। সম্প্রতি ভারতে পাচার হওয়া এক তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর র‌্যাব-পুলিশ নারী পাচারকারী একটি চক্রের সন্ধান পায়, যারা টিকটক ভিডিও বানানোর ফাঁদে ফেলে অনেক তরুণীকে ভারতে পাচার করেছে।