বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকায় সাম্প্রতিক কালে এ ধরনের সংঘর্ষ হয়নি। সংঘর্ষের কারণে গতকাল প্রায় পুরো দিন রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক মিরপুর রোডের সায়েন্স ল্যাব থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ ছিল। এর প্রভাবে আশপাশের সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নীলক্ষেত ও নিউমার্কেট এলাকার বিপণিবিতানগুলো খোলা সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীদের দাবি, এক দিনেই অন্তত ১০০ কোটি টাকার কেনাবেচা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাঁরা।

প্রথম দফায় গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। দ্বিতীয় দফায় গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ইফতারের পর দুই পক্ষই আবার রাস্তায় নামে। রাত সাড়ে ১০টার পর ছাত্ররা এবং দোকানমালিক ও কর্মীরা সড়ক থেকে সরে যান।

সংঘর্ষের মধ্যে গতকাল দুপুরে ঢাকা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ টি এম মইনুল হোসেন এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ৫ মে পর্যন্ত কলেজের ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করেন এবং বিকেলের মধ্যেই ছাত্রাবাস খালি করার নির্দেশ দেন। তবে ছাত্ররা এ নির্দেশ মানেননি। তাঁরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধও করেছিলেন।

শুরু যেভাবে

নিউমার্কেটের দোকানমালিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিপণিবিতানটির ৪ নম্বর ফটকে ওয়েলকাম ও ক্যাপিটাল নামে দুটি খাবারের (ফাস্ট ফুড) দোকান রয়েছে। সোমবার বিকেলে ইফতারি বিক্রির জন্য হাঁটার রাস্তায় টেবিল বসানো নিয়ে ওই দুই দোকানের কর্মচারী বাপ্পী ও কাওসারের মধ্যে বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে কাওসারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বাপ্পী সেখান থেকে চলে যান।

রাত ১১টার দিকে বাপ্পীর পক্ষ হয়ে সাদা টি-শার্ট পরিহিত এক যুবকের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জন নিউমার্কেটে যান। সাদা টি-শার্ট পরিহিত ওই যুবকের হাতে রামদা ছিল। তাঁরা ক্যাপিটাল ফাস্ট ফুডে গিয়ে কাওসারের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন। তখন কাওসারের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ছুরি ও চাপাতি নিয়ে তাঁদের ধাওয়া করেন। পরে রাত ১২টার দিকে ধাওয়া খাওয়া দলটি ঢাকা কলেজের একদল শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে নিউমার্কেটে গিয়ে হামলা করে।

ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রথম আলোকে বলেন, কলেজটির ছাত্রলীগের কয়েকজনের সঙ্গে ক্যাপিটাল ফাস্ট ফুডের কর্মচারী বাপ্পীর সখ্য আছে। তাঁদের মধ্যে নিউমার্কেটকেন্দ্রিক ‘লেনদেনের’ সম্পর্ক রয়েছে। তাই তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে কিছু ছাত্র সেখানে যান। নিউমার্কেটে হামলা করতে ছাত্রদের হল থেকে বের করেছিলেন ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির নেতা সামাদ আজাদ ওরফে জুলফিকার, মাইনুল হাসান ওরফে সোহাগ, ফুয়াদ হাসান, সরকার লিখন প্রমুখ।

দোকানমালিকদের দাবি, সোমবার রাত ১২টার দিকে নিউমার্কেটে গিয়ে বিপণিবিতানটির দুটি ফটক ভেঙে ফেলেন ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। এ সময় কিছু দোকানে ভাঙচুর চালানো এবং কয়েকজনকে মারধর করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় দোকানমালিক ও কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রদের ধাওয়া দেন। রাত আড়াইটা পর্যন্ত পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলতে থাকে। ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে ও জলকামান ব্যবহার করে দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশীদ সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানান।

সকাল থেকে আবার সংঘর্ষ

সোমবার রাতের পর গতকাল সংঘর্ষ শুরু হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। তবে এর আগেই ঢাকা কলেজের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলেন।

সাত কলেজ আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ঢাকা কলেজের ছাত্র ইসমাঈল সম্রাট প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে সোমবার রাতে ‘পুলিশি আক্রমণের’ প্রতিবাদে তাঁরা সকাল সাড়ে নয়টায় নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করতে যান। এ সময় নিউমার্কেট থেকে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা ছাত্রদের ওপর ইটপাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ শুরু করেন। এ কারণে আবারও সংঘর্ষ বাধে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা কলেজের ছাত্রদের একটি অংশ কলেজের ছাদে, আরেকটি অংশ চন্দ্রিমা মার্কেটের সামনে রড-লাঠিসোঁটাসহ অবস্থান নেয়। অন্যদিকে নিউমার্কেট ছাড়াও আশপাশের অন্যান্য বিপণিবিতানের দোকানমালিক, কর্মচারী ও ফুটপাতের হকাররা লাঠিসোঁটা হাতে রাফিন প্লাজা, বলাকা সিনেমা হল ও গাউছিয়া মার্কেটের সামনে অবস্থান নেন।

ছাদে থাকা ছাত্ররা দোকানমালিক ও কর্মীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়। রাস্তায় থাকা দোকানমালিক ও কর্মীরাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। চলতে থাকে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া।

সংঘর্ষ থামাতে প্রথম আড়াই ঘণ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। বেলা একটার দিকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। দেখা যায়, পুলিশের ধাওয়ায় ঢাকা কলেজের ছাত্ররা কলেজ এলাকার দিকে বারবার পিছু হটেছেন। এ সময় দোকানমালিক ও কর্মীরা পুলিশের পিছু পিছু এসে ছাত্রদের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।

দিনভর এ রকম পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলে। এর মধ্যে দুপুরের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও কিছুক্ষণ পরপর সাঁজোয়া যান থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের রাস্তা থেকে সরিয়ে ক্যাম্পাসে নিয়ে যান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। এ সময় কলেজের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন দোকানমালিক ও কর্মী ঢাকা কলেজের ফটকে গিয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। এরপর বিকেল সোয়া চারটার দিকে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে ছাত্ররা তাঁদের ধাওয়া দেন।

বিকেল পাঁচটার দিকে সংঘর্ষ কিছুটা স্তিমিত হয়। এর আগে বিকেল সোয়া চারটার পর নিউমার্কেট এলাকায় দ্রুতগতির মুঠোফোন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা চালু হয় রাত সাড়ে আটটার পর।

পথচারীর মৃত্যু

নিহত নাহিদ ডি-লিংক নামের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ‘ডেলিভারিম্যান’ হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর বাবা নাদিম হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তাঁর তিন ছেলের মধ্যে নাহিদ সবার বড়। নাহিদ সাত মাস আগে বিয়ে করেছেন। গতকাল সকালে তিনি কর্মস্থল এলিফ্যান্ট রোডের উদ্দেশে কামরাঙ্গীরচরের বাসা থেকে বের হন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুপুরে নিউমার্কেট এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে মাথায় আঘাত পান নাহিদ। আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন পথচারীরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়।

এদিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মোশাররফ হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই শিক্ষার্থীর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গতকাল রাতে তাঁকে দেখতে যান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে গিয়েও আহতদের খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি সবার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান।

ডিএমপির রমনা জোনের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সোমবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের অন্তত ২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রমনা জোনের অতিরিক্ত কমিশনার, নিউমার্কেট-ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার, নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শক আছেন।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা

এই সংঘর্ষের ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া ১২ জন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনকে দোকানমালিক, কর্মী ও হকাররা মারধর করেন। কেউ কেউ পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল ও দুই পক্ষের নিক্ষেপ করা ইটের আঘাতে আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন দীপ্ত টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আসিফ সুমিত ও ক্যামেরা পারসন ইমরান হোসেন, দ্য ডেইলি স্টার-এর ফটোসাংবাদিক প্রবীর দাস, ঢাকা পোস্টের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জসিম উদ্দিন, মাইটিভির প্রতিবেদক ড্যানি ড্রং প্রমুখ।

ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সমর্থনে বিক্ষোভ

ঢাকা কলেজের ছাত্রদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন একদল ছাত্র। তাঁদের নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা কামাল খান, শেখ স্বাধীন মো. শাহেদ, শামীম পারভেজ ও মোশকাত হোসেন। এরপর তাঁরা মিছিল নিয়ে নীলক্ষেত মোড়ে যান। সেখানে তাঁরা ঢাকা কলেজের ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে পুলিশের ওপর ক্ষোভ দেখান।

বেলা তিনটার দিকে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের পক্ষে বিক্ষোভ করেন ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রীরা। তাঁদের বিক্ষোভে দোকানমালিক ও কর্মীরা বাধা দেন। পরে ছাত্রীরা নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেন।

এ ছাড়া ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল কর্মসূচি পালন করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ

নিউমার্কেট এলাকায় এই সংঘর্ষ চলাকালে নানান বক্তব্য উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। কেউ কেউ অভিযোগ করছিলেন, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায়ই ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ হয়। এর কারণ চাঁদাবাজি। আবার কেউ কেউ বলেন, নিউমার্কেট এলাকার বিপণিবিতানের দোকানমালিক ও কর্মীরা পণ্যের উচ্চ দাম হাঁকান। দর-কষাকষি করতে গেলে তাঁরা কটূক্তি করেন। নারী ক্রেতাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।

দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারানো নাহিদকে নিয়ে শোক প্রকাশ করেন কেউ কেউ। আবু সালেহ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি ও ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নাহিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন