গত বছরের ডিসেম্বরে তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজের জন্য রাতে আট ঘণ্টা ফ্লাইট চলাচল বন্ধের ঘোষণার পর শাহজালাল বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা যায়। টার্মিনালের ভেতরে-বাইরে, এয়ারলাইনসের চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন থেকে বোর্ডিং ব্রিজ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রথম দিকে ছিল বিশৃঙ্খলা। অনেক ফ্লাইট দেরিতেও ছাড়ে। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু পুরোপুরি এখনো ঠিক হয়নি। বোর্ডিং ব্রিজ না পেয়ে বে-এরিয়াতে পার্ক করে অপেক্ষায় থাকতে হয় উড়োজাহাজগুলোকে। উড়োজাহাজ থেকে নেমে বিমানবন্দরের ভেতরে লাগেজ বেল্ট এলাকায় আসতে বাসস্বল্পতার কারণে যাত্রীদের বিলম্বের ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।

জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি এয়ারলাইনসের যাত্রীদের চেক-ইন কাউন্টার সামলানো, বোর্ডিং, উড়োজাহাজে মালামাল ওঠানো-নামানো, যাত্রীসেবা, প্রকৌশল সেবা ও জিএসই (গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট) সেবাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা বলে। এর দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ জন্য প্রতিটি এয়ারলাইনস নির্দিষ্ট হারে ফি দেয় বিমানকে। কিন্তু বিমানের পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি ছাড়াও যন্ত্রপাতি ও তদারকির অভাবে জিএসএ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ছয় মাস আগে রাতের ফ্লাইট দিনে ও সন্ধ্যায় নিয়ে আসায় চাপ বাড়লেও পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জনবল বাড়ানো হয়নি।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন ২৭টি এয়ারলাইনসের ১১০ থেকে ১১৫টি ফ্লাইট শাহজালাল বিমানবন্দরে ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটে প্রায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এই বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও এয়ারলাইনসকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য বিমানের পর্যাপ্তসংখ্যক জনবল ও সরঞ্জাম নেই।

বিমান বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কাজ করছেন। আর হাইলোডার, ট্রান্সপোর্টার, ডলি, ট্রলি, টোয়িং ট্রাক্টর, হুইলচেয়ারসহ ১৮ ধরনের দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি আছে। তবে তা দিয়ে বিমানবন্দরে বর্তমানের চাপ সামলানো কঠিন।

সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা যা বলছেন

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লাগেজ বেল্টে ব্যাগ পেতে এখন ২০ থেকে ৬০ মিনিট সময় লাগে। আরও দেরি হলে দুই ঘণ্টাও লাগে। সীমিত সামর্থ্য দিয়েই তাঁরা পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছেন। ২৪ ঘণ্টার ফ্লাইট ১৬ ঘণ্টায় আসায় একই জনবল দিয়ে চাপ সামলানো চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এ পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। সব কটি সংস্থা মিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের যন্ত্রপাতির স্বল্পতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশের মহাব্যবস্থাপক (এয়ারপোর্ট সার্ভিস) আজিজুল ইসলামের দাবি, এই সেবার জন্যই তাঁদের যথেষ্ট যন্ত্রপাতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফ্লাইট সূচি পুনর্বিন্যাস হওয়ায় ফ্লাইটের চাপ বেড়েছে। সে কারণে সময় কম পাওয়া যাচ্ছে। তাতে এই সমস্যা হচ্ছে। আর জনবল হচ্ছে রুটিন প্রক্রিয়া। অনেকে অবসরে যাচ্ছেন, নতুন জনবল নেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দরে আমরা সব সংস্থা একসঙ্গে চেষ্টা করছি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি। এই সমস্যা আর থাকবে না।’

default-image

যাত্রী ভোগান্তির জন্য শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতার ঘাটতির কথা বললেন বিমানের মহাব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, বিমানবন্দরের যে সক্ষমতা, তা দিয়ে যাত্রী সামলানো কঠিন। এখন প্রতি দুই ঘণ্টায় কখনো ১১টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। অর্থাৎ ২২টি ফ্লাইট। উড়োজাহাজগুলোকে প্রস্তুত করে যাত্রী ও মালামাল দিয়ে পাঠাতে হয়। এ সময় তাঁদের হিমশিম খেতে হয়।

যাত্রীদের ভোগান্তি

১০ ও ১১ মে বিমানবন্দর ঘুরে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আগমনী টার্মিনালে যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। এ সময় বোর্ডিং ব্রিজ এলাকা ও কাস্টমসে যাত্রীর চাপ পড়ে। আর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বহির্গমনে যাত্রীর চাপ থাকে। এ সময় চেক-ইন কাউন্টার ও ইমিগ্রেশনে চাপ বেশি থাকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিমানবন্দরে একসঙ্গে এক ঘণ্টায় কখনো ৮ থেকে ১০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা করে। বিমানবন্দরে বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা আট। একসঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এসে নামলে যাত্রীসেবা এলোমেলো হয়ে পড়ে। বোর্ডিং ব্রিজে জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট থাকায় কখনো কখনো উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামাতে অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে বেল্টে মালামাল আসতে বেশি সময় লেগে যায়। কখনো তা দুই ঘণ্টাও ছাড়ায়।

৯ মে জার্মানি থেকে দেশে ফেরেন কাজী ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, ‘সকাল নয়টায় আমার ফ্লাইট নামে। লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা করি। অনেকের ব্যাগ আসে। আমারসহ কয়েকজনের আসে না। পরে দেখি বেল্টের একপাশে কয়েকটি ব্যাগ পড়ে আছে। দুই ঘণ্টা পর লাগেজ পাই। আমার ব্যাগ ফয়েল পেপার দিয়ে মোড়ানো ছিল। সেটা দেখলাম নেই। বাসায় এসে ব্যাগ চেক করে দেখি, কিছু খোয়া যায়নি। ১৪ ঘণ্টার ভ্রমণ করে দেশের বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা কার ভালো লাগে?’

ছয় মাসেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে উন্নতি নেই

গত ১০ নভেম্বর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের হাইস্পিড কানেকটিং ট্যাক্সিওয়ে, লাইটিং সেক্টরের নির্মাণকাজের জন্য ১০ ডিসেম্বর থেকে ১০ জুন পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরে রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকার ঘোষণা দেয়। তবে নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হওয়ায় ১ মে থেকে আগের মতো ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

এয়ারলাইনস ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতে ফ্লাইট চলাচলের ঘোষণা এলেও সেটা পুরোপুরি শুরু হয়নি। কারণ, রাতে ফ্লাইট বন্ধ থাকার বিষয়টি ভেবে বেশির ভাগ এয়ারলাইনস জুন পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করেছে। আর এ কারণে রাতে পুরোদমে ফ্লাইট শুরু করতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় গত ১৩ ডিসেম্বর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) এক চিঠিতে বলে, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনায় লোকবল ও সরঞ্জামের (ইকুইপমেন্ট) সংকট চলছে। এর কার্যক্রম তদারকি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবও দেখা গেছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা স্থবির হয়ে পড়েছে। এ চিঠির পর চলতি বছরের প্রথম দিকে বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়। তবে গত দুই সপ্তাহে আবার এ অব্যবস্থাপনা বেড়েছে।

এ অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান (সালমান এফ রহমান)। ৯ মে বিকেলে শাহজালাল বিমানবন্দর পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে যাত্রীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি ওভার অল স্যাটিসফাইড নই। মাঠপর্যায়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের মনমানসিকতা বদলাতে হবে।’

এ সময় সালমান এফ রহমান জানান, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষকে দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।

বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর অসন্তোষ

এদিকে বাংলাদেশে চলাচলকারী ২৭টি উড়োজাহাজ সংস্থার সংগঠন এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) সূত্র বলছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে সামাল দিতে পারছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। জনবল কম থাকায় বিমান সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ এ ব্যবস্থাপনার জন্য এয়ারলাইনসগুলোকে প্রতি ফ্লাইটে সেবাভেদে ২ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিমানকে দিতে হয়।

এওসির সদস্য ও একটি বিদেশি উড়োজাহাজ সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দেরির কারণে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো দেরি হয়। এমনকি বিমানবন্দরের বে–এরিয়াতে উড়োজাহাজ অপেক্ষা করতে হয়। কখনো তা এক থেকে দুই ঘণ্টা ছাড়ায়। অথচ সময়মতো এগুলো করতে বিমান বাংলাদেশকে এয়ারলাইনসগুলো ফি দিয়ে থাকে।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রায়ই সময় ট্যাক্সিতে উড়োজাহাজ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেটি দেড় ঘণ্টাও ছাড়ায়। যেমন ৮ মে রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৌদি এয়ারলাইনসের বড় পরিসরের (ওয়াইড বডি) একটি ফ্লাইট দেশে আসে। সেটি থেকে ব্যাগেজ নামানোর জন্য দুটি হাইলোডার যন্ত্র দরকার। কিন্তু বিমানের পক্ষ থেকে একটি হাইলোডার দেওয়া হয়। সেটা দেওয়া হয় ৪৪ মিনিট দেরির পর। ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের ব্যাগ বুঝে পেতে দুই ঘণ্টা লেগে যায়।

আরেক বিদেশি এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ৯ মে রাত ৯টা ২৫ মিনিটে একটি ফ্লাইট এবং রাত ১১টা ১০ মিনিটে আরেকটি ফ্লাইট ছিল। দুই ফ্লাইটে ৭০০ যাত্রীর জন্য ৪টি কাউন্টার দেওয়া হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ওই দুই ফ্লাইটের যাত্রীদের সময়মতো চেক-ইন, ইমিগ্রেশনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে গিয়ে দুই ঘণ্টা দেরি হয়।

বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো পুরোনো বলে জানান হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাবেক পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এম কে জাকির হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ব্যবস্থাপনার পুরো দায়িত্ব বিমানের। পরিস্থিতি উন্নতি ঘটাতে আপাতত উপযুক্ত লোকবল দিয়ে এ সেবা মনিটরিং করা, বিমানের বড়কর্তাদের ঝটিকা সফর দিয়ে পরিস্থিতি দেখতে হবে। পাশাপাশি যাঁরা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজে গাফিলতি করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের আগপর্যন্ত এভাবেই পরিস্থিতি সামলাতে হবে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আরও উদ্যোগ ও সদিচ্ছা দরকার।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন